রবিবার ২৪ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
রাজনীতি

সহনশীল রাজনীতি, না মব সংস্কৃতি! বাংলাদেশ হাঁটবে কোন পথে?

সহনশীল রাজনীতি, না মব সংস্কৃতি! বাংলাদেশ হাঁটবে কোন পথে?

মোহা: খোরশেদ আলমঃ বাংলাদেশের রাজনীতিতে মতপার্থক্য নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক উত্তেজনা, সংঘাত, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়গুলোতে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে, তা হলোমব সংস্কৃতিএবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার ক্রমবর্ধমান বিস্তার

সম্প্রতি একটি ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নাসিরউদ্দীন পাটোয়ারি, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন, তাকেই পরবর্তীতে কক্সকাজার থেকে পুলিশ প্রশাসনের বিশেষ নিরাপত্তার মাধ্যমে উত্তেজিত পরিস্থিতি থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাটি অনেকের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করেরাষ্ট্র যদি প্রতিশোধের বদলে সহনশীলতা দেখায়, সেটি গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে, যেখানে দূর্বলতা প্রকাশ পায়না

বাংলাদেশের মানুষ মূলত এমন একটি সুস্থধারা রাজনৈতিক পরিবেশ প্রত্যাশা করে, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, সমালোচনা থাকবে, কিন্তু তা হবে শালীনতা গণতান্ত্রিক আচরণের সীমার মধ্যে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত কয়েক বছরে স্বৈরাচারদের সুস্থধারার রাজনীতি পিষ্ঠ হয়ে বর্তমান সমাজে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভাষার ব্যবহার ক্রমেই আক্রমণাত্মক অশ্রাব্য হয়ে উঠেছে। প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধেও এসব নাসিরউদ্দীন পাটোয়ারির মতো ব্যক্তিবর্গ, ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি অসম্মানজনক বক্তব্য জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে

একটি সুস্থ গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে হয়। সেখানে যুক্তি দিয়ে জবাব দেওয়া হয়, গালিগালাজ বা উসকানিমূলক আচরণ দিয়ে নয়। কিন্তু যখন রাজনৈতিক বক্তব্যের জায়গা দখল করে নেয় বিদ্বেষ, তখন সমাজেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তরুণ প্রজন্ম ভুল বার্তা পায় যে, উচ্চস্বরে আক্রমণ করাই যেন রাজনীতির প্রধান শক্তি

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোআইনের শাসনের পরিবর্তেমব জাস্টিসবা জনতার বিচারের প্রবণতা। কোনো অপরাধ ঘটলে তার বিচার আদালতের মাধ্যমে হওয়া উচিত। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উত্তেজনা তৈরি করে কিংবা জনমতকে উসকে দিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার দাবি করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য শুভ নয়। এতে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায় এবং সমাজে অস্থিতিশীলতা বাড়ে

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘাত, দলীয় উত্তেজনা বিশৃঙ্খলার প্রবণতা উদ্বেগজনক। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলো হওয়া উচিত জ্ঞানচর্চা, বিতর্ক নেতৃত্ব তৈরি ও নব নাব গবেষণার জায়গা। সেখানে যদি ক্রমাগত উত্তেজনা সহিংসতার পরিবেশ তৈরি হয়, তবে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অশনি সংকেত

অন্যদিকে সরকার যদি উন্নয়নমূলক কর্মসূচিযেমন কৃষক সহায়তা কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন বা জনকল্যাণমূলক প্রকল্পবাস্তবায়নে মনোযোগ দেয়, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব হবে উক্ত কাজে সহযোগিতা করা, প্রয়োজনে ভুল ত্রুটি হলে গঠনমূলক সমালোচনা করা। বিরোধিতা অবশ্যই থাকবে, কিন্তু তা যেন রাষ্ট্র সমাজকে অস্থিতিশীল করার কৌশলে পরিণত না হয়

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন মূলত শান্তি, স্থিতিশীলতা সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখতে চায়। মানুষ চায় এমন এক পরিবেশ, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশ করা যাবে ভয় ছাড়াই, আবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও সম্মান করা হবে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেইএটি প্রতিশোধ নয়, সহনশীলতার শিক্ষা দেয়

আজ সময় এসেছে সব রাজনৈতিক দল, নেতা এবং কর্মীদের আত্মসমালোচনার। রাজনীতিকে যদি সত্যিই জনসেবার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে ভাষায় শালীনতা, আচরণে সহনশীলতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ফিরিয়ে আনতেই হবে। কারণ সহিংসতা ঘৃণা কখনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না; টেকসই সমাধান আসে সংলাপ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং পারস্পরিক সম্মানবোধ থেকে

 

লেখক: মোহাঃ খোরশেদ আলম, সম্পাদক ও প্রকাশক, মুক্তসংবাদ প্রতিদিন

নির্বাহী সম্পাদক, হিউম্যান রাইটস এন্ড এনভায়রমেন্ট ডেভোলপমেন্ট সোসাইটি(হিডস)