a
ফাইল ছবি
বর্তমান সংকটে সরকারের উদ্যোগগুলো সঠিক, কিন্তু পর্যাপ্ত নয় বলে উল্লেখ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সমস্যা মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি হলেও সংকট সমাধানে সরকার স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নিচ্ছে। বর্তমানে জ্বালানি সংকট, বিদ্যুত্ সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট পরবর্তীকালে আরো অন্যান্য খাতেও দেখা দিতে পারে। এর প্রভাবে দেশে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
‘বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আভাস এবং বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ উত্তরণ কোন পথে?’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ কথা বলা হয়। ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত এই ব্রিফিংয়ে মূল উপস্থাপনা তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, জ্যেষ্ঠ গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে দুর্ভিক্ষের কথা বলছেন, সেটি যৌক্তিক কথা। কারণ বিশ্ববাজারে খাদ্য একটি রাজনৈতিক পণ্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে খাদ্যপণ্য কেনায় সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। কারণ, নিজের মজুত নিশ্চিত না করে কোনো দেশ পণ্য রপ্তানি করতে চাইবে না। তাই ভবিষ্যতে ডলার থাকলেও বিশ্ববাজারে পর্যাপ্ত খাদ্যপণ্য না-ও থাকতে পারে।
বাংলাদেশের মতো যারা খাদ্য আমদানি নির্ভর দেশ, মূলত তারাই খাদ্যের ঝুঁকিতে রয়েছে। খুব দ্রুত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—সরকারের এই মোহ ভঙ্গ হওয়া প্রয়োজন।
খাদ্যসংকট, জ্বালানিসংকট, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আগামী দিনে প্রলম্বিত হবে কর্মসংস্থানে। এর ফলে দারিদ্র্য বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে, বেকারত্বের আশঙ্কাও রয়েছে। যদি সেটি হয়. তাহলে রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হবে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে সরকারের উদ্যোগগুলো ঢেলে সাজাতে হবে।
মূল উপস্থাপনায় ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকায় চার সদস্যের একটি পরিবারের অত্যাবশ্যকীয় সব খাদ্যপণ্যসহ সার্বিক খরচ ছিল ১৭ হাজার ৫৩০ টাকা। জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে রাজধানীতে বসবাসরত চার সদস্যের একটি পরিবারের মাসে খাদ্য খাতে ব্যয় করতে হচ্ছে গড়ে ২২ হাজার ৪২১ টাকা। মাছ-মাংস বাদ দিলেও খাদ্যের পেছনে ব্যয় হবে ৯ হাজার ৫৯ টাকা। এটা ‘কম্প্রোমাইজড ডায়েট’ বা আপসের খাদ্য তালিকা। মূল্যস্ফীতির লাগামহীন অবস্থা। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শুধু আমদানি পণ্য নয়, দেশে উত্পাদিত পণ্যের মূল্যও বেশি। এটা কমার কোনো লক্ষণ নেই। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কাছাকাছি অবস্থান করছে। তবে বাজারের চিত্রে দেখা যায় পণ্যমূল্য প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। এজন্য প্রকৃত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যস্ফীতি নির্ধারণ করা উচিত।
তিনি বলেন, ২৯টি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে কর হার অনেক বেশি। এজন্য এটার প্রভাব পড়ছে মূল্যস্ফীতির ওপর। এটা কমানো গেলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমত। মূল্যস্ফীতির সমাধানে সব শিল্পে ন্যূনতম বেতন বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই। এছাড়া ব্যক্তি খাতেও যারা কাজ করছেন, তাদের জীবনমানে এত ধস নেমেছে যে, এ আয় দিয়ে তারা চলতে পারছেন না। তাদের বেতনও পুনর্বিবেচনা করতে হবে। সরকার ওএমএসসহ যেসব পণ্য দিয়েছে, তা সারা দেশে সহজলভ্য করতে হবে। এখানে দুর্নীতি যেন না হয়, সেটাও দেখতে হবে। তিনি আরো বলেন, একেবারেই দরিদ্রদের আর্থিক সহায়তার পরিমাণ কমপক্ষে ১ হাজার টাকা করতে হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
জ্বালানি সংকট সমাধানে সিপিডি বিভিন্ন কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলনে মনোযোগী হওয়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সুপারিশ করেছে। ফাহমিদা খাতুন বলেন, সাধারণত ৬০ দিনের জ্বালানি মজুতকে আদর্শ ধরা হয়। কিন্তু আমাদের ডিজেল ৬১ দিন, অকটেন ১৯ দশমিক ৬ দিন, পেট্রোল ৩৮ দশমিক ৪ দিন, ফার্নেস ওয়েল ২৭ দশমিক ৯ দিনের মজুত আছে। বিপিসির হাতে ২৩ হাজার কোটি টাকা আছে। টাকা একদম নেই বিষয়টা তেমন নয়। এ জন্য জ্বালানি তেলের দর পুনর্বিবেচনার দাবি জানান তারা। জ্বালানি তেলের ঘাটতি মেটাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘খাদ্যসংকটের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা বলছে, ভবিষ্যতে বিশ্বের ৪২টি দেশে খাদ্যসংকট হতে পারে। এই তালিকায় বাংলাদেশও আছে। এই আশঙ্কা শুধু আমাদের নয়, আন্তর্জাতিক সংস্থারও। এজন্য মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আমাদের অর্থনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এক বছরের মধ্যে পরিত্রাণ পাব এটা আশা করা যায় না।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিদ্যুতে ভর্তুকি বেশি। এর বড় কারণ হলো বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ। সরকারকে এই ক্যাপাসিটি চার্জভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র থেকে সরে আসতে হবে। আইএমএফের যে শর্ত, তাতে বিদ্যুতের ভর্তুকি কমানোর কথা বলা হয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জভিত্তিক বিদ্যুত্ থেকে নো ইলেক্ট্রিসিটি নো চার্জ—এই ব্যবস্থায় আসতে হবে। সূত্র: ইত্তেফাক
ছবি সংগৃহীত: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান
নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশ থেকে স্বৈরাচার পালিয়ে গেলেও একটি ‘অদৃশ্য শক্তি’ ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
শনিবার কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন।
তারেক রহমান বলেন, আপনাদের নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে, স্বৈরাচার পালিয়ে যাওয়ার কয়েকদিন পরেই আমি জেলা-থানাসহ বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের সাথে ভাগেভাগে বসেছিলাম। আপনাদের অনেকেই সেদিন সেই মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। সেই মিটিংয়ে আমি একটি কথা বলেছিলাম, যে স্বৈরাচার তো বিদায় হয়ে গিয়েছে, পালিয়ে গিয়েছে। কিন্তু অদৃশ্য শক্তি কিন্তু ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। মনে আছে আপনাদের এই কথাটি? আমি বিভিন্ন সময় বলেছি। আজকে থেকে প্রায় এক বছর আগে। আপনারা বহু মানুষ সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেন, স্বৈরাচার পালিয়ে গেলেও অদৃশ অপশক্তি মাথা তুলছে মাঝে মাঝে। তা ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। কিন্তু আমরা উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি করি। শহীদ জিয়া ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার আদর্শ লালন করি। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের আর বসে থাকার সুযোগ নেই। আমরা যদি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ইস্পাতের মতো ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি, জনগণের কাছে যেতে পারি তাহলেই নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে সফল জনরায় আনতে পারব।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, স্বৈরাচার বিদায় হয়েছে। বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনা করছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিছু সংস্কারের প্রস্তাবনা দিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন যেই সংস্কারগুলোর প্রস্তাব দিয়েছে, এই প্রস্তাবগুলো প্রায় ৯৫ শতাংশ প্রস্তাবনা বিএনপি আরও আড়াই বছর আগে দেশের সামনে, দেশের মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছে। হ্যাঁ, বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিভিন্ন বিষয়ে মতামত উপস্থাপন করেছে। বিএনপি তার মতামত দিয়েছে। হ্যাঁ, কোনো কোনো বিষয়ে হয়তো অন্যান্য কারো সাথে আমাদের মতপার্থক্য আছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, ভোটের অধিকার এবং বাংলাদেশের মানুষের নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের প্রশ্নে বিএনপির কারো সাথে কোনো আপত্তি নেই, দ্বিমত নেই। অর্থাৎ বিএনপি এই কাজগুলো করতে চায়।
তিনি বলেন, আমাদের সকলকে সচেতন থাকতে হবে। আমাদের প্রত্যেকটি মানুষ শহীদ জিয়া এবং দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার প্রত্যেকটি সৈনিকই অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে। কেউ যেন আমাদের নাম ব্যবহার করে, এই দলের নাম ব্যবহার করে, বিএনপির নাম ব্যবহার করে তাদের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করতে না পারে। কেউ যেন আমাদের নাম ব্যবহার করে জনগণের মধ্যে আমাদের সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়াতে না পারে। এই ব্যাপারে আপনাদের প্রত্যেককে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। প্রত্যেককে কর্তব্য পালন করতে হবে। যাতে করে দলের সম্পর্কে জনগণের মাঝে কেউ কোনো বিভ্রান্তি ছড়াতে না পারে।
তারেক রহমান বলেন, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কাছে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই বাংলাদেশের জনগণ, জনগণ এবং জনগণ। এই জনগণের সাথে আমাদেরকে থাকতে হবে, জনগণের পাশে আমাদেরকে থাকতে হবে, জনগণকে আমাদের পাশে রাখতে হবে। যে কোনো মূল্যে আপনাদেরকে এটি নিশ্চিত করতে হবে। সূত্র: বিডি প্রতিদিন
ফাইল ছবি
‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। ১৯২১ সালের এই দিনে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল এই প্রতিষ্ঠানের। তৎকালীন ব্রিটিশশাসিত বাংলায় এটিই ছিল একমাত্র উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পরাধীন দেশে এবং রাজকীয় ক্ষতিপূরণ হিসেবে পশ্চাৎপদ এ অঞ্চলের মানুষকে শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে নিতে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।
কোভিড-১৯ মহামারির কারণে ১৬ মাস ধরে বন্ধ আছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ কারণে এমন দিনেও আজ জাঁকজমকপূর্ণ কোনো কর্মসূচি আয়োজন করেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সীমিত পরিসরে প্রতীকী কর্মসূচির মাধ্যমে শতবর্ষ পূর্তির মূল অনুষ্ঠান শুরু হবে। এর নাম দেওয়া হয়েছে অগ্রবর্তী অনুষ্ঠান।
আগামী নভেম্বর মাসে শতবর্ষের আনুষ্ঠানিকতা উদযাপনের সিদ্ধান্ত আছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান। ওইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে শতবর্ষের মূল অনুষ্ঠান বর্ণাঢ্য ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজনের পরিকল্পনা আছে। রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মো. আবদুল হামিদ এতে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপনলগ্নে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান। পাশাপাশি অভিনন্দন জানিয়েছেন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সবাইকে। তিনি বলেন, জ্ঞান আহরণ ও বিতরণের গৌরবগাথা নিয়ে শতবর্ষ পাড়ি দিয়েছে প্রাণপ্রিয় এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, চিরগৌরবময় মুক্তিযুদ্ধসহ গণমানুষের সব লড়াইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সর্বদা নেতৃত্ব দিয়েছে। জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং দেশ সেবায় রেখেছে অনন্য অবদান।
দেশের প্রতি আমাদের মমত্ববোধ ও চিরকৃতজ্ঞ চিত্তই এগিয়ে চলার পাথেয়। তাই শতবর্ষে মাতৃভূমি ও গণমানুষের প্রতি আমাদের অনিঃশেষ কৃতজ্ঞতা। শতবর্ষ উদ্্যাপনের বিরল সৌভাগ্য-প্রাপ্তির ক্ষণে আমরা দেশের শিক্ষা ও গবেষণার মানকে আরও উন্নত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি। পাশাপাশি চলমান মহামারি পরিস্থিতি উত্তরণ হলে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, সর্বোপরি ক্যাম্পাস আগের মতো প্রাণবন্ত ও মুখরিত হবে সেই প্রার্থনা করি।
দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা জানান, প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত মান বজায় রাখার কারণেই প্রতিষ্ঠানটি অভিধা পেয়েছে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে। পাশাপাশি এটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দায়িত্বও পালন করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি চালুর ২৬ বছরের মধ্যে ব্রিটিশদের কবল থেকে উপমহাদেশ মুক্ত হয়। সৃষ্টি হয় পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি রাষ্ট্র। সেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র ২৪ বছরের মধ্যে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। পাকিস্তান সৃষ্টির পরের বছর থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয় স্বতন্ত্র জাতিসত্তা সৃষ্টির আন্দোলনে নিবেদিত হয়। এক কথায় বলতে গেলে, দেশ স্বাধীন এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ গঠন ও পরিচালনায় যারা ভূমিকা রেখেছেন তাদের ৫০ বছর ধরে তৈরি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালে শিক্ষাক্ষেত্রে গৃহীত পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির প্রতিবাদ, বাঙালির মুক্তির সনদখ্যাত ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি আদায়, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সরাসরি ভূমিকা ছিল।
বঙ্গবন্ধুর শাহাদতবরণের পর আশির দশকে জেনারেল জিয়াউর রহমান ও পরে এরশাদবিরোধী আন্দোলন সূচিত হয় এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। গণতান্ত্রিক সরকারগুলোকে সঠিকপথে রাখতে ছোটখাটো আন্দোলন আর একাডেমিক সমালোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। সর্বশেষ ২০০৭ সালে গণতন্ত্র মুক্তির আন্দোলনের অগ্নিস্ফুলিঙ্গও বিচ্ছুরিত হয় এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এসব কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষায় অবদানের পাশাপাশি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা নিয়েও সমান আলোচনা হয়ে থাকে।
ইতিহাসের পাতার দিকে তাকালে দেখা যায়, বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ১৯০৫ সালে পূর্ববাংলা ও আসামকে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ গঠন করেছিল ব্রিটিশরাজ। হিন্দু জমিদারসহ প্রভাবশালীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পরে সেই বঙ্গভঙ্গ রদ করতে হয়েছিল। তবে বঙ্গভঙ্গ বাতিলের রাজকীয় ক্ষতিপূরণ হিসাবে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। ইতিহাসে আরও দেখা যায়, প্রভাবশালীরা তখন এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বাধা দিয়েছিল।
কিন্তু ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ, ধনবাড়ীর নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হকসহ তৎকালীন মুসলিম নেতারা ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে এ নিয়ে দেনদরবার করেন। এ লক্ষ্যে তখনকার ভাইস রয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে বিশিষ্ট নেতারা ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি সাক্ষাৎ করেন। এর তিন দিন পর ২ ফেব্রুয়ারি ভাইস রয়ের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা আকারে প্রকাশ পায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ওই বছরই ২৭ মে নাথান কমিশন গঠন করা হয়।
এ অবস্থায় প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কার্যক্রম থমকে যায়। যুদ্ধ শেষে ফের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তাগিদ দেন এ অঞ্চলের মুসলিম নেতারা। এ অবস্থায় ১৯১৭ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশ সরকার ‘স্যাডলার কমিশন’ গঠন করে। দুই বছর পর ১৯১৯ সালের মার্চে স্যাডলার কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ পায়। এরপর ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ দি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট নামে ভারতীয় আইনসভায় পাশ হয়। সেই আইন অনুযায়ী ১৯২১ সালের ১ জুলাই ছাত্রছাত্রীদের জন্য দ্বারোন্মোচন হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের।
ঢাকায় ওই সময়ের সবচেয়ে অভিজাত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকা ছিল রমনা। ওই এলাকায় প্রায় ৬০০ একর জমির ওপর পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছিল এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাকালে তিনটি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ ছিল। একটি পরিপূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। আবাসিক হলগুলো হচ্ছে- সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা হল-যা এখন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল ও জগন্নাথ হল। প্রথম শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন বিভাগে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৮৭৭ জন এবং শিক্ষক সংখ্যা ছিল মাত্র ৬০ জন।
আর শতবর্ষ পরে আজকে এই বিশ্ববিদ্যালয় মহীরুহে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে অনুষদ ১৩টি, বিভাগ ৮৪টি, ইনস্টিটিউট ১৩টি, গবেষণা ব্যুরো ও কেন্দ্র ৬১টি। আবাসিক হল ১৯ এবং হোস্টেল ৪টি। আর শিক্ষার্থী ৪৬ হাজার ১৫০ জন ও শিক্ষক ২০০৮ জন। কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন ৪ হাজার ৪৫৫ জন। এমফিল গবেষক ১১৬১ ও ও পিএইচডি গবেষক আছেন ১০৪৩ জন। এখন পর্যন্ত এমফিল ডিগ্রি পেয়েছেন ১৭০৮ ও ও পিএইচডি ১৫৮৮ জন পেয়েছেন।
সম্প্রতি ডিবিএ (ডক্টর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) ডিগ্রিও প্রদান করা হচ্ছে। ৬০০ একরে ক্যাম্পাস যাত্রা করলেও বর্তমানে এর পরিধি ২৭৫ দশমিক ৮৩ একর। সম্প্রতি সরকার পূর্বাচলে ৫১.৯৯ একর জমি এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বরাদ্দ দিয়েছে। কৃতী শিক্ষার্থীদের মেডেল, বৃত্তি ও সম্মাননা দিতে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে ট্রাস্ট ফান্ড আছে ৩৪৭টি।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুরু থেকেই দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে। কখনো আর্থিকভাবে আবার কখনো সামরিক-সরকারি অভিযানের মুখে পড়েছে। সবমিলে দমনে মরিয়া ছিল সরকারগুলো। যে কারণে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সময়ে আর্থিক সংকটে পড়েছে। বর্তমানেও অপ্রতুল বাজেটের বিপরীতে সক্ষমতার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তিসহ নানান সংকট নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
পাশাপাশি একাডেমিক দিক থেকেও পিছিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা আবাসন সংকট নিয়েই দিন কাটাচ্ছে। মান্ধাতা আমলের শ্রেণিকক্ষে চলছে ক্লাস। গবেষণাগারেরও তথৈবচ অবস্থা। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের সেবাও আধুনিক নয়। উপরন্তু আবাসিক হলে ও ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে শিক্ষার্থীরা শারীরিক-মানসিক সংকটে পড়ছে। ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে চলছে ভাটা। শিক্ষকদের একটি অংশের নিয়মিত ক্লাস না নেওয়া এবং একাডেমিক কার্যক্রমের পরিবর্তে রাজনৈতিক ও ভিন্নদিকে মনোনিবেশ বেশি থাকার অভিযোগও আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিককালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান দুটি চাপ মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছে। এগুলো হচ্ছে, শিক্ষার্থী ভর্তি ও বাজেটের অপ্রতুলতা। আমাদের বাজেটের অপ্রতুলতার কারণ হচ্ছে, আমাদের জাতীয় বাজেটই শিক্ষাবান্ধব নয়। তিনি বলেন, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পরিমাণ সুবিধা আছে, তার সদ্ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের নিজেদের গড়ে তুলতে হবে।
আজকের কর্মসূচি : আজকের প্রতীকী কর্মসূচির মধ্যে আছে-সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের সামনে জাতীয় পতাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন। অনুষ্ঠানটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইপি টেলিভিশনে সম্প্রচার এবং ওয়েবসাইট ও ফেসবুক লাইভে সম্প্রচার করা হবে। বিকাল ৪টায় প্রশাসনিক ভবনে অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে আলোচনা সভা হবে। এতে ভাষাসৈনিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সংযুক্ত হয়ে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। সভাপতিত্ব করবেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। সূত্র: যুগান্তর