a
ফাইল ছবি
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে চলতি বছরের ৯ জুলাই সৌদি আরবে হজ অনুষ্ঠিত হতে পারে। বাংলাদেশ থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হওয়ার কথা রয়েছে ৩১ মে। এবার হজ করতে যেতে আগ্রহীদের পাসপোর্টের মেয়াদ থাকতে হবে ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত।
সম্প্রতি হজযাত্রীদের পাসপোর্ট সংক্রান্ত নিয়মে এমন পরিবর্তন এনে জরুরি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এ নির্দেশনায় যেসব হজযাত্রীর পাসপোর্ট নেই বা মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাদের জরুরিভিত্তিতে পাসপোর্ট করতে বলা হয়েছে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, চলতি বছরের হজ মৌসুমে হজযাত্রীদের নিবন্ধন নিশ্চিত করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় ব্যবস্থাপনায় হজে যেতে ইচ্ছুকদের পাসপোর্টের মেয়াদ যাচাই করে কমপক্ষে ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মেয়াদযুক্ত পাসপোর্ট প্রস্তুত রাখতে হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নিবন্ধিতরা যারা এ বছর হজে যাবার সুযোগ পাবেন তাদের জন্ম হতে হবে ১ জুলাই ১৯৫৭ এবং এর পরে।
পাশাপাশি সৌদি আরবের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দ্বারা অনুমোদিত কোভিড টিকার দুই ডোজ এবং ভ্যাকসিনের বুস্টার ডোজ গ্রহণের সনদ হজের পুরো সফরে ব্যবহারের লক্ষ্যে একাধিক কপি বা আইডি কার্ড আকারে লেমিনেট কপি হজযাত্রীকে প্রস্তুত রাখতে হবে।
নিবন্ধন ব্যতিত কোডিড টিকা নিয়ে থাকলে অথবা সুরক্ষা অ্যাপে টিকা নেওয়ার তথ্য আপডেট নেই এমন হজযাত্রীকে টিকা গ্রহণের তথ্য সুরক্ষা অ্যাপে অন্তর্ভুক্তি করে টিকার সনদ গ্রহণ করতে হবে।
উল্লেখ্য, এ বছর বাংলাদেশ থেকে ৫৭ হাজার ৮৫৬ জন হজে যেতে পারবেন বলে এরই মধ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে। সূত্র: ইত্তেফাক
সংগৃহীত ছবি
দুনিয়া হচ্ছে আখেরাতের কর্মক্ষেত্র। এই কর্ম যাতে সুষ্ঠু ও সুচারুরূপে আঞ্জাম দেওয়া যায়, সেজন্য মানুষকে প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ, শক্তি-সামর্থ্য ও দিকনির্দেশনা দান করা হয়েছে। এসব কাজে লাগিয়ে একজন মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি-ধন্য হতে পারে। দুনিয়া-আখেরাত উভয় জাহানকে জ্যোতির্ময় করতে পারে। গড়ে তুলতে পারে নেক ও সওয়াবের প্রভূত সঞ্চয়।
প্রচেষ্টার সর্বশেষ সীমা হল মৃত্যু। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের সমাপ্তি ঘটে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সকল সম্পর্ক। নিঃশেষ হয়ে যায় যাবতীয় কর্মক্ষমতা। না ভালো কাজের শক্তি থাকে, না মন্দ কাজের। না সওয়াব উপার্জনের সক্ষমতা থাকে, না গোনাহ কামানোর।
মৃত্যুর পর শুরু হওয়া জীবনের প্রথম মনযিল হল কবর। কবরের জীবনের পর সকলকে আল্লাহ তাআলার কাছে সমবেত হতে হবে। তিনি পার্থিব জীবনের হিসাব-নিকাশ নিবেন এবং ভালো-মন্দ যাবতীয় কর্মের প্রতিদান দিবেন। তখন কারো ঠিকানা হবে জান্নাত, কারো জাহান্নাম।
সেদিন নেককার ও গোনাহগার উভয়েরই নিজ নিজ কৃতকর্ম স্মরণ হবে। নেককার আফসোস করবে কেন আরো বেশি নেক অর্জন করেনি। আর গোনাহগারের অনুতাপ তো হবে অন্তহীন- কেন গোনাহ থেকে বেঁচে থাকেনি। কেউ কেউ তাদেরকে আবার দুনিয়াতে পাঠানোর আবেদন করবে। কিন্তু এ কি সম্ভব?
বুদ্ধিমানের কর্তব্য গোনাহ থেকে যথাসম্ভব বেঁচে থাকা। আখেরাতের চিরস্থায়ী সুখ ও শান্তির পথে অগ্রগামী হওয়া এবং মৃত্যুর আগেই মৃত্যু ও তার পরের জীবনের যথোচিত প্রস্তুতি নেওয়া।
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে তাঁর প্রিয় মুমিনদেরকে এ কথাই স্মরণ করিয়েছেন-
وَ اَنْفِقُوْا مِنْ مَّا رَزَقْنٰكُمْ مِّنْ قَبْلِ اَنْ یَّاْتِیَ اَحَدَكُمُ الْمَوْتُ فَیَقُوْلَ رَبِّ لَوْ لَاۤ اَخَّرْتَنِیْۤ اِلٰۤی اَجَلٍ قَرِیْبٍ فَاَصَّدَّقَ وَ اَكُنْ مِّنَ الصّٰلِحِیْنَ وَ لَنْ یُّؤَخِّرَ اللهُ نَفْسًا اِذَا جَآءَ اَجَلُهَا وَ اللهُ خَبِیْرٌۢ بِمَا تَعْمَلُوْنَ .
আমি তোমাদের যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় কর, এর আগে যে, তোমাদের কারো মৃত্যু এসে যাবে আর তখন সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে কিছু কালের জন্য সুযোগ দিলে না কেন, তাহলে আমি দান-সদকা করতাম এবং নেক লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম। যখন কারো নির্ধারিত কাল এসে যাবে তখন আল্লাহ তাকে কিছুতেই অবকাশ দিবেন না। আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবহিত
সূরা মুনাফিকূন (৬৩) : ১০-১১
হাদীসে বুদ্ধিমানের পরিচয় এভাবে ব্যক্ত হয়েছে-
الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ، وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا، وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ.
বুদ্ধিমান সে-ই যে নিজের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করে। আর অক্ষম সে-ই যে নিজের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী চলে এবং আল্লাহর কাছে (বৃথা) আশা পোষণ করে। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৪৫৯
চতুর্থ খলীফা আলী ইবনে আবী তালিব রা.-এর একটি বক্তব্যে দুনিয়া-আখেরাতের স্বরূপ ও আমাদের করণীয় এভাবে বর্ণিত হয়েছে-
إِنَّ الدُّنْيَا قَدْ تَرَحَّلَتْ مُدْبِرَةً، وَإِنَّ الْآخِرَةَ مُقْبِلَةٌ وَلِكُلِّ وَاحِدَةٍ مِنْهُمَا بَنُونَ، فَكُونُوا مِنْ أَبْنَاءِ الْآخِرَةِ، فَإِنَّ الْيَوْمَ عَمَلٌ وَلَا حِسَابَ، وَغَدًا حِسَابٌ وَلَا عَمَل
দুনিয়া ফিরে যাচ্ছে আর আখেরাত এগিয়ে আসছে। আর এ দুটির প্রত্যেকটিরই আছে সন্তানাদি। তোমরা আখেরাতের সন্তান হও। কারণ আজ শুধু আমল, হিসাব নেই। আর আগামীকাল শুধু হিসাব, আমল নেই। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৬৩৬
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এক বিশেষ নিআমত হল, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমলের ধারা বন্ধ হয়ে গেলেও জীবদ্দশায় নির্দিষ্ট কিছু আমল করে গেলে মৃত্যুর পরও সওয়াব জারি থাকে। অর্থাৎ
অর্থাৎ মানুষ নিজেই নিজের জন্য সওয়াব পৌঁছার ব্যবস্থা করে যেতে পারে এবং চাইলে অন্য কেউও তাকে সওয়াব পৌঁছাতে পারে। এ উভয় পদ্ধতিই আল্লাহ তাআলার একান্তই দয়া ও অনুগ্রহ। নতুবা বান্দার কি সাধ্য ছিল কর্মক্ষমতা হারানোর পরও প্রতিদান লাভের? প্রথম পদ্ধতিটির নির্দিষ্ট কোনো নাম নেই। আলোচনার সহজতার জন্য একে ‘সওয়াব লাভের উপায়’ বলা যেতে পারে। আর দ্বিতীয় পদ্ধতিটি ‘ঈসালে সওয়াব’ নামে অধিক পরিচিত। এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে প্রথম পদ্ধতিটি (সওয়াব লাভের উপায়) সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা উপকারী বলে মনে হচ্ছে।
সওয়াব লাভের উপায়
সঠিক পদ্ধতি ও সহীহ নিয়তে করা মুমিনের কোনো নেক আমলই বৃথা যায় না। আল্লাহ তাআলার কাছে এর বিনিময় সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু মৃত্যুর পর যেহেতু কোনো আমল করা সম্ভব নয় তাই সওয়াব ‘কামাই করা’ও অসম্ভব। তবে এমন কিছু আমল আছে, যা জীবদ্দশায় করে গেলে মৃত্যুর পরও সওয়াব ও উপকারিতার ধারা অব্যাহত থাকে । যথা-
সদকায়ে জারিয়া
সদকামাত্রই উপকারী ও বিরাট সওয়াবের কাজ। এর বহু প্রকার ও ধরন রয়েছে। কিছু সদকা আছে অস্থায়ী। যেমন কাউকে খাদ্যদ্রব্য দান করা। আর কিছু সদকা আছে স্থায়ী। যেমন মসজিদ নির্মাণ করা। এই প্রকার সদকাকে ‘সদকায়ে জারিয়া’ বলা হয়। সদকায়ে জারিয়া করলে মৃত্যুর পরও দানকারীর ‘সওয়াব-সঞ্চয়’ সমৃদ্ধ হতে থাকবে। এর ¯্রােতধারা তার ‘পুণ্য-তরি’কে চলমান রাখবে।
এখানে সদকায়ে জারিয়ার কিছু উদাহরণ উল্লেখ করছি :
১. মসজিদ নির্মাণ।
২. মকতব-মাদরাসা প্রতিষ্ঠা।
৩. দ্বীনী পাঠাগার ও দ্বীনী কিতাবের ব্যবস্থা করা।
৪. ঈদগাহ বানানো।
৫. কবরস্থান করা।
. যে কোনো দ্বীনী কাজের জন্য জমি ওয়াফ্ক করা।
৭. এতীম ও অসহায় লোকদের বাসস্থান ও উপার্জনের ব্যবস্থা করা।
৮. রাস্তা ও পুল নির্মাণ করা।
৯. পানির ব্যবস্থা করা।
১০. ফলদার বৃক্ষ রোপণ করা।
১১. সরাইখানা তৈরি করা।
১২. সীমান্ত পাহারা দেওয়া ইত্যাদি।
দুই. উপকারী ইলম
উপকারী ইলম অর্জনের গুরুত্ব ও ফযীলত অপরিসীম। এর উপকারিতা হাসিল করতে পারে প্রথমত ব্যক্তি নিজেই। সেই সাথে যদি এর প্রচার-প্রসার করা হয়, মানুষকে শিক্ষা-দীক্ষা দেওয়া হয়, যা দ্বারা তারা যুগ-যুগ ধরে উপকৃত হতে থাকবে, কল্যাণ ও শান্তির পথে এগুতে থাকবে এবং যার ধারাবাহিকতা ব্যক্তির মৃত্যুর পরও চলমান থাকবে, তবে তা আরো বেশি মহিমময়। যতদিন এই ইলম দুনিয়াতে আলো ছড়াতে থাকবে ততদিন তার সওয়াবের ভুবনও আলোকিত হতে থাকবে।তিন. নেক সন্তান
সন্তান-সন্ততি আল্লাহ তাআলার এক মহা মূল্যবান নিআমত। এ শুধু পার্থিব অবলম্বনই নয়; আখেরাতের সম্বলও বটে। নিজের দুনিয়া ও আখেরাতকে সুন্দর করার পক্ষে বড় সহায়ক। সততা-যোগ্যতা ও তাকওয়া-তহারাতের উপর তাকে প্রতিষ্ঠিত করলে মা-বাবা দুনিয়া-আখেরাত সবখানে উপকৃত হবেন এবং মৃত্যুর পরও এই বৃক্ষের সুফল ভোগ করতে থাকবেন।
উপরোক্ত তিনটি বিষয় হাদীসে এভাবে ব্যক্ত হয়েছে-
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ.
মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন
তার তিনটি আমল ছাড়া সমস্ত আমল তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমল তিনটি হচ্ছে- সদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম, যা থেকে উপকৃত হওয়া যায় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দুআ করে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৩১০
আরেকটি হাদীসে এসেছে, ‘মানুষ যা কিছু রেখে যায় তার মধ্যে তিনটি জিনিস উত্তম- নেক সন্তান, যে তার জন্য দুআ করে। এমন সদকা যা অব্যাহত থাকে। এর সওয়াব সে লাভ করে। এবং এমন ইলম, যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়।’ -সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৯৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ২৪১; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস ২৪৯৫
এ তিনটি কাজ পৃথক পৃথকভাবেও বর্ণিত হয়েছে। উপকারী ইলম সম্পর্কে ‘সুনানে ইবনে মাজাহ’র (২৪০) একটি বর্ণনা এ রকম- الْعَامِلِ.
যে কাউকে ইলম শিক্ষা দেয়, সে এ অনুযায়ী আমলকারীর অনুরূপ সওয়াব লাভ করবে। আমলকারীর সওয়াব থেকে কমানো হবে না।
অন্য এক হাদীসে এসেছে-
أَفْضَلُ الصَّدَقَةِ أَنْ يَتَعَلَّمَ الْمَرْءُ الْمُسْلِمُ عِلْمًا ثُمَّ يُعَلِّمَهُ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ.
উত্তম সদকা হল নিজে ইলম শিক্ষা করা এবং অপর মুসলিম ভাইকে তা শিক্ষা দেওয়া। -সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ২৪৩
নেক সন্তান সম্বন্ধে এক হাদীসের ইরশাদ-
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لَيَرْفَعُ الدَّرَجَةَ لِلْعَبْدِ الصَّالِحِ فِي الْجَنَّةِ، فَيَقُولُ: يَا رَبِّ، أَنَّى لِي هَذِهِ؟ فَيَقُولُ: بِاسْتِغْفَارِ وَلَدِكَ لَكَ.
আল্লাহ তাআলা জান্নাতে নেককারের মর্যাদা উঁচু করলে সে জিজ্ঞেস করবে, হে আমার প্রতিপালক! এটা আমার জন্য কোথা থেকে এল? তিনি বলবেন, তোমার জন্য তোমার সন্তানের ইস্তিগফারের কারণে। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১০৬১০
চার. নেক কাজের সূচনা
নেক কাজের সূচনা করা যথেষ্ট কঠিন। সূচনাকারীকে কত বাধা-বিপত্তি পাড়ি দিতে হয়! কত ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করতে হয়! এসব কিছু পেছনে ফেলে একটি নেক কাজের ভিত্তি স্থাপন করলে পরবর্তী সময়ে যারা ঐ কাজ করবে তাদের সকলের সমপরিমাণ সওয়াব সে পাবে।
জারীর ইবনে আবদুল্লাহ আলবাজালী রা. থেকে বর্ণিত, একবার কিছু বেদুঈন কম্বল পরিহিত অবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এল। তিনি তাদের দুরবস্থা দেখলেন। তারা ভীষণ অভাবগ্রস্ত ছিল। উপস্থিত লোকদেরকে তিনি তাদের জন্য দান করার প্রতি উৎসাহিত করলেন। কিন্তু এ কাজে তারা কিছুটা দেরি করল। এতে নবীজীর চেহারায় অসন্তুষ্টির ছাপ ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ পর এক আনসারী একটি রূপার থলি নিয়ে এল। কিছুক্ষণ পর আরেকজন এল। এভাবে একে একে সকলেই দান করলেন। তখন নবীজীর চেহারায় প্রসন্নতা ফুটে উঠল। তিনি ইরশাদ করলেন-
চেহারায় প্রসন্নতা ফুটে উঠল। তিনি ইরশাদ করলেন-
مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً حَسَنَةً، فَعُمِلَ بِهَا بَعْدَهُ، كُتِبَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِ مَنْ عَمِلَ بِهَا، وَلَا يَنْقُصُ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ، وَمَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً سَيِّئَةً، فَعُمِلَ بِهَا بَعْدَهُ، كُتِبَ عَلَيْهِ مِثْلُ وِزْرِ مَنْ عَمِلَ بِهَا، وَلَا يَنْقُصُ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَيْءٌ.
যে ইসলামে কোনো উত্তম নিয়ম চালু করে, যে অনুযায়ী পরবর্তীতে আমল করা হয়, তার জন্য আমলকারীদের অনুরূপ সওয়াব লেখা হবে। তাদের সওয়াব সামান্য পরিমাণও কমানো হবে না। আর যে ইসলামে কোনো মন্দ নিয়ম চালু করে, যে অনুযায়ী পরবর্তীতে আমল করা হয়, তার জন্য আমলকারীদের অনুরূপ গোনাহ লেখা হবে। তাদের গোনাহ কিছুমাত্রও কমানো হবে না। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০১৭
পাঁচ. মৃত সুন্নাহ জীবিত করা
যে কোনো সুন্নাহ মানুষের কর্ম থেকে বিলুপ্ত হতে থাকলে তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আর চিন্তা ও বিশ্বাস থেকে হারাতে শুরু করলে তো কথাই নেই। আরো কঠিন হয় যখন সেটার জায়গায় কোনো বিদআত এসে ঢুকে পড়ে। এ জাতীয় মৃত সুন্নাহ পুনরুজ্জীবিত করলে পরবর্তীতে যারা ঐ সুন্নাহর অনুসরণ করবে তাদের সকলের অনুরূপ সওয়াব তার আমলনামায় জমা হবে।
নবীজীর ইরশাদ-
مَنْ أَحْيَا سُنَّةً مِنْ سُنَّتِي قَدْ أُمِيتَتْ بَعْدِي، فَإِنَّ لَهُ مِنَ الأَجْرِ مِثْلَ مَنْ عَمِلَ بِهَا...
আমার পরে একটি মৃত সুন্নাহ জীবিত করবে সে পরবর্তীতে যারা এ অনুযায়ী আমল করে, তাদের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে। তাদের সওয়াব সামান্য পরিমাণও কমবে না। আর যে এমন কোনো নবআবিষ্কৃত বিষয় উদ্ভাবন করবে, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পছন্দ নয়, পরবর্তীতে যারা এ অনুযায়ী আমল করে, তাদের সমপরিমাণ গোনাহ তার উপর বর্তাবে। তবে তাদের গোনাহ বিন্দুপরিমাণও কমবে না। -জামে তিরমিযী, হাদীস ছয়. হেদায়েতের দিকে ডাকা
ইসলামে ব্যক্তিগত সংশোধনে আত্মতৃপ্তি পছন্দনীয় নয়; আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী ও অন্যান্যদের হেদায়েতের ব্যাপারেও আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। নিজের দ্বীনের সহীহ বুঝ ও সমঝ অর্জন এবং নিজের জীবনে তা বাস্তবায়নের পাশাপাশি মুসলিমের এক দায়িত্ব হল অপরকে এর দিকে ডাকা, তার কাছে ইসলামের কল্যাণকর শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া। বস্তুত দাওয়াত হচ্ছে হেদায়েতের নূর সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার এক মূল্যবান উপায়। যারা এই দাওয়াতে সাড়া দেবে তাদের অনুরূপ সওয়াব আহ্বানকারীর সংগৃহীত হবে। তাদের আমলের ধারা যদি তার মৃত্যুর পর পর্যন্ত বহাল থাকে, তাহলে ততদিন পর্যন্তই সে এর সওয়াব পেতে থাকবে।
হাদীসে ইরশাদ হয়েছে-
مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى، كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ
যে মানুষকে হেদায়েতের … Read more
যে মানুষকে হেদায়েতের দিকে ডাকে পরবর্তীতে যারা তা অনুসরণ করে তাদের অনুরূপ সওয়াব তাকে দান করা হবে। তবে ওদের সওয়াব বিন্দুপরিমাণও কমবে না। আর যে গোমরাহীর দিকে ডাকে পরবর্তীতে যারা তা অনুসরণ করে তাদের সমপরিমাণ গোনাহ তাকে বহন করতে হবে। এতে ওদের গোনাহ সামান্য পরিমাণও কমবে না। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৭৪
সারকথা হল, এ ছয়টি কাজ (সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম, নেক সন্তান, নেক কাজের সূচনা, মৃত সুন্নাহের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও হেদায়েতের দিকে ডাকা) করে গেলে মৃত্যুর পরও সওয়াব লাভ করা যাবে।
এখানে প্রসঙ্গক্রমে দুটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন মনে হচ্ছে-
(ক) উপরোক্ত ছয়টি কাজ মৌলিক শিরোনাম মাত্র। প্রত্যেকটির বিস্তর শাখা-প্রশাখা রয়েছে। এক সদকায়ে জারিয়ারই তো কত প্রকার! উপকারী ইলমের কত অঙ্গন ও অনুষঙ্গ! নেক কাজ ও সুন্নাহ্র কত বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতি এবং হেদায়েতের দিকে ডাকার কত পথ ও পন্থা!
এ ছয়টি কাজের মধ্যে শেষ তিনটি মূলত উপকারী ইলমেরই শাখা। আরও খুলে বললে কুরআন-সুন্নাহ্য় ‘সদকা’ শব্দ যে ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, সেই হিসেবে নেক সন্তান ও উপকারী
ইলমকেও ‘সদকায়ে জারিয়া’ বলা যায়। ‘সহীহ ইবনে খুযায়মা’ গ্রন্থে নি¤েœাক্ত শব্দে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে-
إِنَّ مِمَّا يَلْحَقُ الْمُؤْمِن مِنْ عَمَلِه وَحَسَنَاتِه بَعْدَ مَوْتِهِ عِلْمًا عَلِمَهُ وَنَشَرَهُ، أَوْ وَلَدًا صَالِحًا تَرَكَهُ، أَوْ مَسْجِدًا بَنَاهُ، أَوْ بَيْتًا لِابْنِ السَّبِيلِ بَنَاهُ، أَوْ نَهَرًا كَرَاهُ، أَوْ صَدَقَةً أَخْرَجَهَا مِنْ مَالِهِ فِي صِحَّتِهِ وَحَيَاتِهِ، تَلْحَقُهُ مِنْ بَعْدِ مَوْتِهِ.
মুমিনের মৃত্যুর পর তার যেসব আমল তার
তার সাথে যুক্ত হয় তা হল- তার শেখানো ও প্রচারিত ইলম। তার রেখে যাওয়া নেক সন্তান। মসজিদ নির্মাণ করা। সরাইখানা তৈরি করা। পানির নহর খনন করা। জীবদ্দশায় সুস্থ অবস্থায় দান-খায়রাত করা। এগুলোর সওয়াব সে মৃত্যুর পরও পায়। -সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস ২৪৯০; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ২৪২
ইমাম বায়হাকী রাহ. (৪৫৮হি.) এ হাদীসটির সাথে এধরনের আরেকটি হাদীস বর্ণনা করে বলেন-
দুটি বর্ণনার সহীহ হাদীসের (যাতে আছে যে, তিনটি ছাড়া সমস্ত আমল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়) সাথে বিরোধ নেই। কারণ এতে ‘সদকায়ে জারিয়া’ বলা হয়েছে, যা এখানের অতিরিক্ত আমলগুলোকে শামিল করে।’ -শুআবুল ঈমান, বায়হাকী ৩/২৪৮
(খ) এগুলো শুধু সওয়াবের জন্য বিশেষ নয়; গোনাহের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ কেউ যদি গোনাহের কাজে ‘গোনাহে জারিয়া’র সূচনা করে, ক্ষতিকর জ্ঞানের প্রচার-প্রসার করে, ছেলে-মেয়েকে অসৎরূপে গড়ে তুলে, খারাপ কাজের সূচনা বা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে, মানুষকে গোমরাহীর দিকে ডাকে, তাহলে যতদিন তা বাকি থাকবে ততদিন তার গোনাহের বোঝা ভারি হতে থাকবে। এই অন্ধকার ছড়ানোর ধারা তার মৃত্যুর পরও চলমান থাকলে মৃত্যুর পরও তার আমলনামা অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে থাকবে।
করেছেন। নিম্নে আরও কিছু আয়াত ও হাদীস পেশ করছি।
কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
لِیَحْمِلُوْۤا اَوْزَارَهُمْ كَامِلَةً یَّوْمَ الْقِیٰمَةِ وَ مِنْ اَوْزَارِ الَّذِیْنَ یُضِلُّوْنَهُمْ بِغَیْرِ عِلْمٍ اَلَا سَآءَ مَا یَزِرُوْنَ.
কিয়ামতের দিন তারা নিজেদের (কৃত গোনাহের) পরিপূর্ণ ভারও বহন করবে এবং তাদেরও ভারের একটা অংশ, যাদেরকে তারা অজ্ঞতার কারণে বিপথগামী করছে। -সূরা নাহল (১৬) : ২৫
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে-
وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمْ وَأَثْقَالًا مَعَ أَثْقَالِهِمْ.
তারা নিজেদের গোনাহের বোঝা বহন করবে এবং নিজেদের বোঝার সাথে আরো কিছু বোঝা। -সূরা আনকাবুত (২৯) : ১৩
নবীজীর ইরশাদ-
لاَ تُقْتَلُ نَفْسٌ ظُلْمًا، إِلَّا كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الأَوَّلِ كِفْلٌ مِنْ دَمِهَا، لِأَنَّهُ أَوَّلُ مَنْ سَنَّ القَتْلَ.
যে কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হবে এর গোনাহের একটা অংশ প্রথম আদম সন্তানের উপর বর্তাবে। কারণ সেই প্রথম হত্যার প্রবর্তন করেছে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৩৩৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৬৭৭
আর এগুলো গোনাহের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া শরীয়তের বিধান ‘একজনের গোনাহের বোঝা আরেকজনের উপর বর্তাবে না’- এর সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কারণ, একজনের গোনাহের ভার আরেকজনের উপর বর্তাবে না; যদি এর সাথে তার কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা না থাকে। অন্যথায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা থাকলে তার উপরও এর একাংশ গোনাহ বর্তাবে। বলাই বাহুল্য, এটা অন্যের বোঝা নয়, নিজেরই সংশ্লিষ্টতার বোঝা।
সূরা নাহলের ২৫ নং আয়াতের তাফসীরে শাইখুল ইসলাম যাকারিয়া আনসারী রাহ. (৯২৬ হি.) বলেন,
তারা নিজেদের কুফ্র অবলম্বনের বোঝা বহন করবে। সেই সাথে তাদের কারণে যারা বিপথগামী হয়েছে তাদেরও পুরোপুরি বা আংশিক গোনাহ। আর আল্লাহর ইরশাদ- وَ لَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزْرَ اُخْرٰی
এর অর্থ হল, যেখানে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই- না কারণগত না অন্য কোনোভাবে। -ফাতহুর রহমান পৃ. ৩০৪
খলীল আহমদ সাহারানপুরী রাহ. (১৩৪৬হি.) من دعا إلى هدى হাদীসটির ব্যাখ্যায় বলেছেন,
‘তুমি যদি প্রশ্ন কর, এ তো বাহ্যিকভাবে আল্লাহর ইরশাদ, وَ لَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزْرَ اُخْرٰی -এর সাথে সাংঘর্ষিক?
আমি বলব, উভয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। কারণ গোমরাহীর দিকে আহ্বানকারী অনুসরণকারীদের গোনাহ বহন করেনি; বরং তারা যে তার কারণে পথভ্রষ্ট হয়েছে সেটার গোনাহ বহন করেছে।’ -বাযলুল মাজহুদ ১৩/৩৭
এজন্য গোনাহের ধারা চলমান থাকে এমন কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি।
ফাইল ছবি: সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির প্রধান ভূমিকায় ছিলেন সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। তার নির্দেশনায় হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ১০১ মিলিয়ন ডলার লুটের ঘটনা ঘটে। ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার ‘মাস্টারমাইন্ড’ রিজার্ভ থেকে ওই অর্থ সরানোর পর এ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ডাটা ও তথ্য মুছে ফেলার সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। রিজার্ভ লুটের স্পর্শকাতর বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জেনে গেলে বোর্ডরুমে সবাইকে ডেকে সভা করে তাদের মুখ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন স্বয়ং ড. আতিউর।
রিজার্ভ থেকে অন্তত ২ বিলিয়ন ডলার লুট করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সুইফটের সঙ্গে হঠাৎ করেই আরটিজিএস (রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট) কানেকশন স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন ডেপুটি গভর্নর শুভংকর সাহার মধ্যস্থতায় হ্যাকিংয়ের প্রথম অধ্যায়ে আরটিজিএস প্রকল্প আনা হয়। হ্যাকারদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সুইফটের এক্সেস।
পরিকল্পনামতো আরটিজিএস সংযোগ স্থাপনের জন্য ভারতীয় নাগরিক নীলা ভান্নানকে ভাড়া করে বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়ে আসেন ড. আতিউর। তাকে এ কাজে সহায়তা করেন বেসরকারি দুটি ব্যাংকের এমডি। আরটিজিএস স্থাপনের পর নীলা ভান্নান বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টারনেটের সঙ্গে সুইফটের সংযোগ স্থাপন করে দেন। এরপর ধাপে ধাপে শুরু হয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর্ব। হ্যাকিংয়ের ঘটনার পরপর আতিউর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট সার্ভার রুমে এসে কর্মকর্তাদের শাসিয়ে বলেন, ‘যদি তোমরা কেউ বলো যে হ্যাক হয়েছে, তোমাদের কারও চাকরি থাকবে না। সবাইকে বরখাস্ত করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এবিডি শাখার (অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড বাজেটিং) কর্মকর্তা বদরুল হককে হুমকি দিয়ে আতিউর বলেন, এই ঘটনা চেপে যেতে হবে। তিনি চাকরি রক্ষায় চুপ হয়ে যান। তিনি হ্যাকিং ঘটনার পরবর্তী পর্বে আতিউরের অপরাধনামার একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। আরেকজন সাক্ষী হলেন-তৎকালীন ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম। তিনি সুইফটের মাধ্যমে আরটিজিএস সংযোগ প্রদানের বিরোধিতা করেছিলেন। যে কারণে আরটিজিএস-এর ফাইল তার মাধ্যমে কানেকটিভিটিসংক্রান্ত অনুমোদন হওয়ার কথা থাকলেও গভর্নর আতিউর ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সেই ফাইলে নিজেই সই করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। অথচ ড. আতিউর এতদিন একজন সজ্জন ও সুশীল হিসাবে দেশের সবার কাছে সুপরিচিত ছিলেন-এমন মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।
অপরাধ তদন্ত সংস্থা, অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতভর বাংলাদেশ ব্যাংকের ফেডারেল রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ১৬২৩ মার্কিন ডলার (১০১ মিলিয়ন) হ্যাক করে সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে আতিউরের পক্ষে কাজ করেন তার বিশ্বস্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিভাগের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা।
হ্যাকিংয়ের ক্ষেত্র তৈরির প্রথম ধাপে গভর্নর আতিউরের পিএস আসাদুজ্জামান একটি মেইল আদান-প্রদানের সূত্রপাত করেন। সেটি সেন্ড ও রিসিভ করার পর তিনি হ্যাকারদের রিপ্লাই দেন। আর এর মধ্য দিয়েই পরিকল্পনার প্রথম ধাপের কাজটি সম্পন্ন হয়।
হ্যাকিংয়ের পর এ সংক্রান্ত আলামত ধ্বংস ও অপরাধ ধামাচাপা দিতে রাকেশ আস্তানা নামে ভারতীয় আরেক নাগরিককে ক্রাইম সিনের (সার্ভার কক্ষ) এক্সেস হাতে তুলে দেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, রাকেশ আস্তানাকে দিয়ে ৩৯ দিন পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে প্রকারান্তরে সব আলামত ডিলেট করান আতিউর। নিয়ম হচ্ছে, সরকারি প্রতিষ্ঠান যদি কাউকে এ ধরনের (মুছে ফেলা তথ্য পুনরুদ্ধার) কাজ দিতে চায় তাহলে টেন্ডার করে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে। তথ্য গোপনের অসৎ উদ্দেশ্যে এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। ঘটনার পর মামলা কিংবা জিডি করতে দেননি আতিউর। জরুরি ভিত্তিতে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশের সহায়তা নেওয়া হয়নি বা তাদের অবহিত করা হয়নি। এমনকি সাবেক অর্থমন্ত্রীকেও কিছু জানানো হয়নি। এ অবস্থায় ‘আন-অথরাইজড’ ব্যক্তিকে সার্ভারের কর্তৃত্ব হাতে তুলে দেন আতাউর। যা বড় ধরনের জাল জালিয়াতি। গভর্নর ও তার ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের সহায়তায় হ্যাকিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট করে বেরিয়ে যান রাকেশ আস্তানা।
আরও জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হ্যাকিংয়ের পর তা চাপা দেওয়াসহ পুরো বিষয়টি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করতে হুকুম জারি করেন আতিউর। অপরাধে জড়িতদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন তিনি। হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ লুটের পর তিনি ঘটনাটি আড়াল করতে কোনো দপ্তর যেমন-গোয়েন্দা সংস্থা, আইসিটি মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা রিজার্ভ হ্যাকিংয়ের বিষয়ে অপরাধীদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সহায়তাকারী কোনো ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানেরও সহায়তা নেননি। ফিলিপিনসের একটি পত্রিকার মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হ্যাকিংয়ের বিষয়টি সামনে আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের এবিডি শাখার সার্ভারে আরটিজিএস প্রকল্প আনার পর অনুমোদিত লোকজনকে দিয়ে মেলওয়্যার বা ভাইরাস ঢোকানো হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রিজার্ভ থেকে ২ মিলিয়ন অর্থ সরিয়ে অন্য কাউকে লাভবান করা কিংবা নিজেরা ভিন্ন কৌশলে লাভবান হওয়া। দক্ষিণ কুরিয়ার এক হ্যাকারের মাধ্যমে ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে ফিলিপিনসের আরসিবি ব্যাংকের একটি শাখার ৪টি ভুয়া অ্যাকাউন্টে টার্গেটকৃত ২ বিলিয়নের মধ্যে ১০১ মিলিয়ন ডলার সরানো হয়। হ্যাকারের ভুলে বাকি আরও প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি আর ট্রান্সফার করা সম্ভব হয়নি। যদি ওই সময় হ্যাকাররা ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তাদের সহযোগীদের হিসাবে ট্রান্সফার করে ফেলত, সেই অর্থ পরিকল্পনায় যুক্ত সবার মাঝে ভাগবাঁটোয়ারা হতো। আর বাংলাদেশ বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে পড়ত। যদিও রিজার্ভ থেকে ওই অর্থ লুটের পর থেকে তা ধীরে ধীরে নিম্নমুখী হতে থাকে। এখনো রিজার্ভ অনেকটাই নিম্নমুখী। আতিউর ও তার সিন্ডিকেটের কারণে বাংলাদেশের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চরম আঘাত আসে।
ঘটনার পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই আংশিক (ছায়া) তদন্ত করেছিল। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা তখন জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এত বড় হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। এফবিআইয়ের তদন্ত সম্পর্কিত তথ্যের সত্যতা মেলে ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৮ বছরে তৎকালীন গভর্নর আতিউরসহ তার দোসরদের রক্ষার আলামত ও কর্মকাণ্ড থেকে। আওয়ামী সরকারের অন্তত দুজন সাবেক মন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্র সচিব কামাল, অর্থ বিভাগের সচিব আসাদ ও সিআইডি প্রধান মোহাম্মদ আলীসহ গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর বরাতে আতিউর ও তার সহযোগী বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের রক্ষায় সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হয়। এমনকি রিজার্ভ হ্যাকিংয়ের ঘটনা তদন্তে রাষ্ট্র কর্তৃক গঠিত ফরাসউদ্দিন তদন্ত কমিটির রিপোর্টও আলোর মুখ দেখতে দেওয়া হয়নি। তার দাপটে রিজার্ভ হ্যাকিংয়ের সঙ্গে জড়িতদের সবাইকে শনাক্ত করা গেলেও আদালতে তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিতে পারেনি সিআইডি। আতিউর ও তার পক্ষ নিয়ে প্রভাবশালীরা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন এডিশানাল এসপি (বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি) রায়হান উদ্দিন খানকে চাপ দেন, যাতে আতিউর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাউকে আসামি করা না হয়। তাদের বাদ দিয়ে শুধু হ্যাকার ও বিদেশি কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দিতে চাপ প্রয়োগসহ নানাভাবে প্লট তৈরি করেন আতিউর। এক্ষেত্রে তিনি আরেকটি কূটকৌশলের আশ্রয় নেন, তা হলো- তদন্ত কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে সিআইডির প্রধান মোহাম্মদ আলীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন পরিদর্শককে দিয়ে চার্জশিট তৈরি করে তা আদালতে দাখিল করান। যাতে আতিউর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের জড়িত কেউ আসামি থাকবে না। সেটি পরে বাস্তবায়ন হয়নি ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও হাসিনা সরকারের পতনের কারণে।
সূত্রমতে, হ্যাক করে রিজার্ভ থেকে ১০১ মিলিয়ন ডলার লুটের ঘটনাটি প্রমাণের জন্য বিশেষ করে হ্যাক হয়েছিল কিনা বা এর জন্য হ্যাকাররা কোন ডিভাইস ব্যবহার করে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন সার্ভার ও পিসির এক্সেস নেয় চক্রটি-সেটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য সিআইডি সাড়ে আট বছর আগে ফরেনসিক ল্যাবে আলামত টেস্টের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু আতিউরের হস্তক্ষেপে সেটিও সময়মতো করতে পারেনি সিআইডি। গত বছর ফরেনসিক পরীক্ষা করে সংস্থাটি। এতে হ্যাকিং প্রমাণিত মর্মে ৬৩৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দেয় ফরেনসিক বিভাগ। সেটি হাতে পাওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তা আতিউর রহমানসহ তার দোসর হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর ১২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের উদ্যোগ নিলে তাকে সিআইডি থেকে জয়পুরহাটে অসম্মানজনক বদলি করা হয়। এই বদলির আদেশ কার্যকর হয় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে।
হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে রিজার্ভ লুটের ঘটনাটি সাবেক গভর্নর ও তার সহযোগীদের সহায়তায় ঘটলেও কারও নাম উল্লেখ না করে ঘটনার ৩৯ দিন পর ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় মামলা করে এবিডি শাখার যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা। ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১৭৯ (চুরির অপরাধ) ধারাসহ ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং আইনের ৪ ধারা এবং ২০০৬ সালের আইসিটি আইনের ৫৪ ধারায় মামলাটি করা হয়। যা ছিল হ্যাকিং ও রিজার্ভ লুটের ঘটনায় বড় ধরনের ঘাটতি। সংশ্লিষ্টরা জানান, গভর্নর আতিউর ও তার সহযোগীদের রক্ষায় মামলায়ও ছলচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হয়। তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি মামলার ত্রুটি-বিচ্যুতি লক্ষ করে। তারা দেখতে পান, আর্থিকভাবে সুবিধা পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট সুইফটের সঙ্গে আরটিজিএস-এর সংযোগ স্থাপনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক দুর্বৃত্ত ও হ্যাকারদের সঙ্গে অনেক দিন ধরে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। এসব অপরাধ দুদকের তফশিলভুক্ত অপরাধ। ফলে দুদকের পক্ষ থেকে সম্প্রতি সিআইডির কাছে পুরো মামলার ‘কেস-ডকেট’ (ফাইল) চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, দণ্ডবিধির ২১ ধারা, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা ও ব্যাংক কোম্পানি আইনের ‘প্রযোজ্য’ ধারায় সরকারি কর্মকর্তা (পাবলিক সার্ভেন্ট) হিসাবে দুদকের তফশিলভুক্ত অপরাধ হিসাবে তদন্ত করার বিষয়ে সিআইডির সহায়তা প্রয়োজন। মামলার নথি দুদকের কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ করে দুদক।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, তারা দুদকের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে মামলার নথি সরবরাহ করতে চান। কারণ এ মামলায় জড়িতদের অপরাধ দুদকের নিজস্ব আইনে তদন্তযোগ্য। দুদক যদি মনে করে সিআইডির কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে যারা এর তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদেরও সম্পৃক্ত করতে পারে। এ ছাড়া আইসিটি আইনের ধারা ও মানি লন্ডারিং আইনের ধারার অপরাধ যদি দুদকের তফশিলে তদন্তের ক্ষেত্রে সমস্যা হয়, সেই অংশটুকু সিআইডি তদন্ত করতে পারে। এরই মধ্যে সিআইডি রিজার্ভ লুটে জড়িত দেশি-বিদেশি চক্রটিকে শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে আতিউর রহমানসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছেন কমপক্ষে ১২-১৩ জন। দুজন ভারতীয় নাগরিক-নীলা ভান্নান ও রাকেশ আস্তানা, বেসরকারি দুটি ব্যাংকের দুজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। দুদক তদন্ত করলে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানা গেছে। সেক্ষেত্রে, যেসব মন্ত্রী-সচিব এবং পুলিশ ও সিআইডির পদস্থ কর্মকর্তা আতিউরসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের জড়িত কর্মকর্তাদের রক্ষায় সব ধরনের প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন তাদেরও তদন্তের আওতায় আনা হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। দুদক চেয়ারম্যান ড. এমএ মোমেন জানান, তারা এ মামলাটি পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখতে চান। রাষ্ট্রের এত বড় আর্থিক দুর্নীতির ঘটনায় কারা জড়িত-আইনানুগভাবে সেটিও দেখা দরকার।
সিআইডির বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা ইয়াসিনের কাছে আতিউর রহমানসহ জড়িত অপরাধীদের বিষয়ে তদন্তে বাধা প্রদানসহ সর্বশেষ অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমি আমার কাজটুকু করার চেষ্টা করেছি। এর বেশি কিছু বলতে চাননি তিনি।
রিজার্ভ লুটের নীলনকশার বিষয়ে জানার জন্য সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল তিনি ৫ আগস্টের পরই দেশ ত্যাগ করে চলে যান। এখন তিনি কোন দেশে আছেন তা নিশ্চিত হতে খোঁজখবর নিচ্ছে তদন্ত সংস্থা। সূত্র: যুগান্তর