a
ফাইল ছবি
দেশি-বিদেশি অনেক ষড়যন্ত্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অবশেষে ২৫ জুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত দিয়ে উদ্ভোধন হলো আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির মহাকাব্যিক গেম চেঞ্জার পদ্মা সেতু।পদ্মা সেতু কেবল একটি ইট - পাথরের অবকাঠামো নয়, এটি বাঙালির বিজয়, আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা, অহংকার, গর্ব ও সক্ষমতার প্রতীক। ষড়যন্ত্র পদদলিত করে বিশ্বের বুকে মাথা উচুঁ করে দাঁড়ানোর স্তম্ভ । সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায় - জলে পুড়ে মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়। জাতির পিতার ৭ই মার্চের ভাষণে বলেছিলেন 'আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না' । মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু উদ্ভোধনের মধ্যদিয়ে জাতির পিতা আর সুকান্তের কথার আবারও প্রমাণ দিয়ে উচ্চারণ করলেন "যতবারই হত্যা করো জন্মাবো আবার, দারুণ সূর্য হবো লিখবো নতুন ইতিহাস "।
আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির ট্রাম্প কার্ড স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্ভোধনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতেও পদ্মা সেতু নতুন গেম চেঞ্জার হবে।
পদ্মা সেতু নির্মাণে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের সে বাধার সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল এডিবি, আইডিবি ও জাপানের জাইকা। অথচ পদ্মা সেতু উদ্বোধনে সেই তারা ও বিশিষ্টজনেরা কী বলে একটু দেখে নিই :
ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস থেকে বিবৃতি হলো " পদ্মা সেতুর নির্মাণসাফল্য দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক যোগাযোগের উন্নয়নে বাংলাদেশের নেতৃত্বের ‘উদাহরণ’ "।
অন্যদিকে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প সঠিকভাবে সম্পন্ন করায় বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি মিয়াং টেম্বন।
শুধু তাই না জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বলেন, " পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে নিজস্ব উদ্যোগ ও অর্থায়নে। এটা স্পষ্টভাবে বলে দেয় যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জাতীয় স্থিতির মাধ্যমে বাংলাদেশ অনেক কিছুই করতে পারে এবং পদ্মা সেতু সেই সক্ষমতার জানান দিয়েছে "।
ভিডিও বার্তায় চীনা রাষ্ট্রদূত নিজস্ব অর্থে বাংলাদেশের পদ্মা সেতু নির্মাণে সাহসিকতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘সেতুটি আমার কাছে সাহসের একটি প্রতীক। স্বল্পোন্নত দেশ বাংলাদেশ এমন সেতু নির্মাণ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় ছিল। তারপরও বাংলাদেশের মানুষ তাদের স্বপ্ন অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। আজ সেতুটি শুধু বাস্তবায়নই হয়নি, বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে এর শতভাগ নির্মিত হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে যদি সাহসের কোনো সীমা না থাকে, তবে আকাশ তার সীমা।’
অপরদিকে বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের বাংলাদেশে নিযুক্ত হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী বলেন 'বাংলাদেশের গর্ব ও মর্যাদার প্রতীক পদ্মা সেতু দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ '।
ড. মোহাম্মদ ইউনুস বলেন " পদ্মা সেতু দক্ষিণ অঞ্চলে মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিলো আর সেটার সফল বাস্তবায়নের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ "
পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্বের প্রতিফলন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন। এই সেতু আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় ও সুসংহত করবে।’
পদ্মা সেতু উদ্বোধন ভোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে খানিকটা এগিয়ে নিল কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে কাদের সিদ্দিকী বলেন, নিশ্চয়ই নেবে। কেউ কাজ করলে সে অগ্রসর হবে না কেন।
বর্তমানে আওয়ামীলীগের কট্টর সমালোচক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আজকে জাতির এই সাহসী উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। অত্যন্ত আনন্দঘন অনুভূতি এটা। একাত্তরেও মুক্তিযুদ্ধ করতে পেরেছি। আজকে পদ্মা সেতু নিজের চোখে দেখতে পেরেছি। এটি আমার জীবনের বড় একটি আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়ে গেছে। উনি অনেক ভালো কাজ করেছেন। এখন উনার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।’
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর ( অব) আকতার বলেন - বেগম খালেদা জিয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদ্মা সেতু উদ্বোধন অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিতে পারতেন। এতে ইতিবাচক জনমত তৈরি হতো বলেই আমি বিশ্বাস করি ।
রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.) বলেন - যারা নিজস্ব জায়গা থেকে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করে এবং নাম শুনতে পারে না, তাদের একটি অংশও আজ বলতে বাধ্য হচ্ছে, শেখ হাসিনা সত্যি পেরেছেন, তিনি পারেন। জাতীয় নেতৃত্বের বিশাল স্বীকৃতি। দক্ষিণ অঞ্চলের ২১ জেলায় যাঁরা বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মী রয়েছেন, তাঁদের মুখেও শোনা যাচ্ছে, শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কেউ এই পদ্মা সেতু করতে পারতেন না। সুতরাং আগামীর রাজনীতিতে এর একটি প্রভাব থাকবে, সেটিই স্বাভাবিক।
পদ্মা সেতু ভৌগলিকভাবে খণ্ডিত বাংলাদেশকে একসঙ্গে করেছে বলে মনে করেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক।
অন্যদিকে রাষ্ট্রের অখণ্ডতার জন্য পদ্মা সেতু ভীষণ জরুরি ছিল বলে মনে করে পদ্মা সেতুতে কারিগরি টিমে কাজ করা নদী বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত। তিনি আরো বলেন বিশ্ব ব্যাংক রাজনৈতিক কারণে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। দূর্নীতি হলে সেটার দায়ভার আমার আর ড.জামিলুর রেজা চৌধুরীর হতো।
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মারুফ মল্লিক বলেন -
কূটনীতিতে পূর্বানুমান অনুসারে ভূরাজনীতির ঘুঁটির বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার প্রতিপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগ করে। পদ্মা সেতুর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চীনা চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। পদ্মা সেতুর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অত্যন্ত জটিল। তাই এ সেতু নিয়ে চীনের উচ্ছ্বাস ভিন্ন মাত্রার।
গণতন্ত্রে জনগণই হলো সবচেয়ে বড় শক্তি। বিভিন্ন রকম নানাবিধ সমস্যা পরও আওয়ামীলীগ সরকার এক পদ্মা সেতু দিয়ে দেশের সিংহ ভাগ মানুষের সমর্থন এবং সহমর্মিতা আদায় করেতে সক্ষম হয়েছে। সে কারণেই পদ্মা সেতু জাতীয় রাজনীতির মাঠে সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। এই আবেগ, উচ্ছ্বাস- ও আনন্দের কারণে বিরোধী দল হঠাৎ করে এখন যেমন আন্দোলনের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে না, তেমনি ভূ-রাজনীতির খেলোয়াড়েরা বিপুল জনসমর্থনে থাকা এই সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম চাপ প্রয়োগ করেও খুব একটা সফল হতে পারবে বলে মনে হয় না। ঐক্যবদ্ধ জনগণের শক্তি যে বড় শক্তি, সেটি পদ্মা সেতু আবারও প্রমাণ করেছে। এই সেতু উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে জনগণ আওয়ামী লীগ সরকারকে বিশ্বাস করতে শিখেছে যে, শেখ হাসিনা যা বলেন তা পালন করেন। ফলে আগামী রাজনীতিতে পদ্মা সেতু একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে দাঁড়াবে।
প্রমত্ত পদ্মায় সেতু নির্মাণ শুধু দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেই না আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও এর প্রভাব অপরিসীম হবে। এ সেতুকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতির দাবার চাল যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনের দিকে গমন করতে পারে বলে মনে করেন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ।
ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশকে বলা হয় ‘দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়ার সেতু’। বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের সুতিকাগার ইউরোপ নয়, বরং এশিয়া। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হলো এশিয়া এবং অত্র অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান একবারে কেন্দ্র পর্যায়ে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়ন মানেই হচ্ছে এশিয়ার উন্নয়ন। সাম্প্রতিক সময়ে বুঝা যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিযোগীতা- প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক খেলায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতা হিসাবে আবির্ভূত হয়ে উঠেছে। এইরূপ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি ‘উন্নয়ন হাব’ হিসেবে যদি পদ্মাসেতুর গুরুত্ব বিবেচনা করে দেশ হিসাবে নিজেদের সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারে তাহলে সামনের দিনগুলোতে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা আরো বৃদ্ধি পাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় গুরুত্বপূর্ণ পালাবদলের ভুমিকায় থাকবে এই পদ্মা সেতু।
গত এক দশকে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিপরীতে চীনকেন্দ্রিক নতুন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উত্থান লক্ষ করা যাচ্ছে । পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক রাজনীতিতে চীন প্রথমেই বিশ্বব্যাংককে হারিয়ে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পরাজয় মানে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রেরই পরাজয়। এতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র চীনের থেকে পিছিয়ে গেল।
রাশিয়া - ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির মেরুকরণ ও সমীকরণ বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট হচ্ছে। চীন-ভারতের সম্পর্কে বরফ গলা শুরু হয়েছে। টাইমস নার্ড নামের ভারতের একটি জনপ্রিয় সংবাদ চ্যানেলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. জয়শঙ্কর বলেছেন, ‘চীনের সঙ্গে আমাদের সমস্যা রয়েছে, তবে সেটি দেখভাল করার জন্য ভারত একাই যথেষ্ট, অন্য কারো সংশ্লিষ্টতার প্রয়োজন নেই। ’ এটিকে চীন - ভারতের সুসম্পর্ক হিসাবেও অনেকে ইঙ্গিত করেছেন। চীনও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে।
জয়শঙ্কর আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন - ইউরোপের সমস্যাকে ইউরোপবাসী বিশ্বের সমস্যা মনে করে। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য সমস্যাকে ইউরোপ নিজেদের সমস্যা মনে করে না। তিনি আরো বলেছেন, আগামী দিনে ইউরোপকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন হবে, যে কথা চীন বহু আগে থেকেই বলে আসছে।
এসব বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে চীন-ভারত সম্পর্কের মধ্যে সুঘ্রাণের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, এই সুসম্পর্ক অব্যাহত থাকলে পুরো এশিয়া অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক আবহাওয়ার বিশাল পরিবর্তন ঘটবে। সেই পরিবর্তনের ঢেউ এসে পড়বে পদ্মা সেতুর ওপর।
সুতরাং পদ্মা সেতুর যেমন অভ্যন্তরীণ গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি রয়েছে বহুমাত্রিক ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব।
অনেক ষড়যন্ত্র ও হাজারো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণ, দূরদর্শী, চৌকশ নেতৃত্বের মাধ্যমে পদ্মা সেতুর উদ্ভোধন বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট মহাকাব্য। এই মহাকাব্যিক অর্জন বিশ্বরাজনৈতিক পরিমন্ডলে আমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে অনন্য মর্যাদায়-অনন্য উচ্চতায়। মর্যাদার এই আসন সমুন্নত রেখে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির প্রতিটি পথচলায় লাল-সবুজের এই মহাকাব্যিক অগ্রযাত্রাকে উঁচিয়ে ধরে নায্য অধিকার আদায়ের জন্য দল,মত নির্বিশেষে সবাইকে দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।
লেখকঃ ইঞ্জিনিয়ার ফকর উদ্দিন মানিক
সভাপতিঃ সিএসই এলামনাই এসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
(লেখকঃ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পাঠ্য বই)
ছবি: মুক্তসংবাদ প্রতিদিন
সাইফুল আলম, ঢাকা: মুফাক্কিরে ইসলাম সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. প্রতিষ্ঠিত দাওয়াতি সংগঠন ‘পয়ামে ইনসানিয়াত বাংলাদেশ’ এর উদ্যোগে দেশের কিংবদন্তি আলেম, বিশ্ববরেণ্য আরবী ভাষাবিদ, চট্টগ্রাম জামিয়া দারুল মাআরিফ আল ইসলামিয়া, চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ‘আল্লামা মুহাম্মাদ সুলতান যওক নদভী রহ. : জীবন ও অবদান’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শুক্রবার (২৩ মে) বিকাল ৩টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
পয়ামে ইনসানিয়াত বাংলাদেশের অভিভাবক পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক নদভীর সভাপতিত্বে ও আমির ড. মাওলানা শহীদুল ইসলাম ফারুকীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন আল্লামা আব্দুল হামীদ পীর সাহেব মধুপুর এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন: মাওলানা আবু তাহের নদভী, মাওলানা ফুরকানুল্লাহ খলীল, আমীরুল মুছলিহীন মাওলানা খলিলুর রহমান নেছারাবাদী, প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আনিসুজ্জামান, মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী, মাওলানা আব্দুর রহীম ইসলামাবাদী, মাওলানা মুহিউদ্দীন রব্বানী, মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, মাওলানা আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ হাসান, মাওলানা লিয়াকত আলী, মাওলানা মুহাম্মাদ যাইনুল আবিদীন, মাওলানা জুলফিকার আলী নদভী প্রমুখগণ।
আলোচনা করেন মুফতি আব্দুল কাইয়ুম সুবহানী, ড. শুয়াইব আহমদ, মুফতি মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী, ড. মাওলানা গোলাম মুহিউদ্দীন ইকরাম, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, ড. একেএম মুহিব্বুল্লাহ কাসেমী, মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী, ড. মুফতি গোলাম রব্বানী, জনাব সাইফুর রহমান খান, ড. ওয়ালীয়ুর রহমান খান আজহারী, মুফতি শারাফাত হুসাইন, মাওলানা তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, মুফতি জহির ইবনে মুসলিম, মাওলানা আফিফ ফুরকান, মুফতী আফজাল হুসাইন, হাকীম মাওলানা আজহারুল ইসলাম নোমানী, মুফতি ওমর ফারুক যুক্তিবাদী, মুফতী কামরুল হাসান নেছারী, মাওলানা ইয়াসীন আহমাদ জিহাদী, মাওলানা আহমাদুল্লাহ আব্বাসসহ বরেণ্য আলেম, লেখক, গবেষক ও ইসলামী স্কলারগণ।
আলোচনা সভায় বক্তাগণ বলেন, ‘বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে মুসলিম পুনর্জাগরণের জন্য যে ধরনের ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন ছিলো তা তৈরি হয়নি। এ সময় সর্বত্র ‘ক্বাহতুর রিজাল’ বা মানব দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিলো। এমন নাযুক সময়ে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম মুফাক্কিরে ইসলাম সাইয়েদ আবুল আলী নদভী রহ. মানুষ গড়ার সাধনায় ব্রতী হন। উপমহাদেশের যে ক’জন মানুষকে তিনি আপন চিন্তায় রাঙাতে পেরেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন-বাংলাদেশী আলেম মাওলানা সুলতান যওক নদভী রহ.। সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর সোহবতের বরকতে মাওলানা সুলতান যওক নদভী রহ. হৃদয়ে উম্মাহর দরদ ধারণ করতে পেরেছিলেন। তিনি ছিলেন গতানুগতিকতার বাইরের মানুষ, যেমনটি ছিলেন সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.। ফলে তাঁর চিন্তা ও কর্ম ছিলো গতানুগতিক চিন্তা ও কর্ম থেকে আলাদা।
উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, বাংলাদেশে সর্বপ্রথম কওমী শিক্ষা সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন মাওলানা সুলতান যওক নদভী রহ.। এ লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জামিআ দারুল মাআরিফ আল-ইসলামিয়া।’
বক্তাগণ আরো বলেন, ‘মাওলানা সুলতান যওক নদভী রহ. সীমাবদ্ধ গণ্ডির মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন বৈশ্বিক ব্যক্তিত্ব ও বিশ্ববরেণ্য আরবী ভাষাবিদ। বিস্তৃত কর্মের ময়দানে তিনি নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন রাবেতা আলমে ইসলামীর সদস্য, রাবেতা আদবে ইসলামীর বাংলাদেশ ব্যুরো চেয়ারম্যান, দেশের সবচেয়ে বড় অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশেল প্রধান উপদেষ্টা, জামিয়া দারুল মাআরিফ আল-ইসলামিয়া, চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও দাওয়াতি সংগঠন পয়ামে ইনসানিয়াত বাংলাদেশের উপদেষ্টা। এছাড়া আরও অসংখ্য কল্যাণমুখী কাজে তিনি অভিভাবকত্ব করেছেন।’
বক্তাগণ আরো বলেন, ‘কীর্তিময়তায় উজ্জ্বল এই মনীষী ষাটের দশকে বাংলাদেশে ‘ আস-সুবহুল জাদিদ’ নামে আরবী ত্রৈমাসিক এবং ‘আল-হক’ নামে বাংলা মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। মাওলানা সুলতান যওক নদভী রহ. শুধু একজন মানুষ ছিলেন না, বরং একটি প্রতিষ্ঠান বা তার চেয়ে বেশি কিছু ছিলেন। সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর চিন্তা ও কর্মের প্রসার ছিলো তাঁর জীবনের লক্ষ্য। শিক্ষা, সংস্কার ও দাওয়াহ - সর্বত্র ছিলো তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণ। এই কীর্তিমান মনীষী ২ মে ২০২৫ ঈসায়ী তারিখে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান।’
বক্তাগণ আরো বলেন, ‘তাঁর ইন্তেকালে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা পূর্ণ হওয়া সম্ভব কেবল তখনই যখন আজকের যুবকেরা সুলতান যওক নদভীর মিশন ও ভিশনকে এগিয়ে নেওয়ার সাধনায় আত্মনিয়োগ করবে। মনে রাখতে হবে, গত শতাব্দীর শেষে যে মানব দুর্ভিক্ষ বা কীর্তিমান মানুষের অভাব দেখা দিয়েছিলো, সে অভাব বা দুর্ভিক্ষ আজও শেষ হয়নি, বরং আরও সংকটপূর্ণ হয়েছে। এমতাবস্থায় পূণ্যবান পূর্বসূরীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিজেকে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।’
বক্তাগণ আরো বলেন, ‘একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মুফাক্কিরে ইসলাম সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর যে কর্মসূচি ও কর্মপন্থা ছিলো, মাওলানা সুলতান যওক নদভী রহ. সেই কর্মসূচি ও কর্মপন্থা জাতির সামনে পেশ করেছেন। বর্তমান শতাব্দীতে মুসলিম উম্মাহর উত্থানের জন্য সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর কর্মপন্থা অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই, বরং আলী মিয়াঁ নদভী রহ.-এর মিশন অনুসরণ করা ছাড়া এ জাতির মুক্তি সুদূর পরাহত। প্রকৃত মানুষের অভাবের সময় সুলতান যওক নদভী রহ. এর বিদায় যে শূন্যতা তৈরি করেছে, তা কখনো পূরণ হবার নয়। তবে তাঁর মিশন ও ভিশন বাস্তবায়নে আমরা যদি নিয়োজিত হতে পারি তবে কিছুটা হলেও সে শূন্যতা পূরণ হতে পারে।
আজ ঐতিহাসিক ২৫শে মার্চ, ভয়াল ‘কালরাত’
আজ ঐতিহাসিক ২৫শে মার্চ। ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে নিরীহ ঘুমন্ত বাঙালির ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তাই দিবসটি ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে বাঙালিরা।
আজ বৃহস্পতিবার রাত ৯টা থেকে ৯টা ১ মিনিট পর্যন্ত সারা দেশে প্রতীকী ‘ব্ল্যাক আউট’ পালন করা হবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) ও জরুরি স্থাপনাগুলো এই কর্মসূচির আওতামুক্ত থাকবে।
আজকের রাতে কোনো সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবন ও স্থাপনায় কোনো আলোকসজ্জা করা যাবে না। তবে ২৬ মার্চ সন্ধ্যা থেকে আলোকসজ্জা করা যাবে। ২৫শে মার্চ গণহত্যা দিবসের জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে পাক-হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্বিচারে চালায় বিশ্ব ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ ছিল বাঙালির একটি প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এক নারকীয় পরিকল্পনা। সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যকে সামনে রেখে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জেনারেল টিক্কা খান বলেছিলেন, ‘আমি পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ চাই না’। ফলশ্রুতিতে বাঙালি জাতির জীবনে নেমে আসে এই বিভীষিকাময় ভয়াল কালরাত্রি।
একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি গত বছরের মতো এ বছরও করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ২৫শে মার্চ গণহত্যার কালরাত্রির আলোর মিছিলসহ সব কার্যক্রম স্থগিত করেছে।
তবে আজ সন্ধ্যা ৭টায় স্বাধীনতা ও গণহত্যার ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ৫০টি মোমবাতি প্রজ্বালন ও সংক্ষিপ্ত আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে।