a
ফাইল ছবি
তামিম ইকবালের সেঞ্চুরিতে জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১২ বছর পর বিদেশের মাটিতে হোয়াইটওয়াশের কীর্তি গড়লেন টাইগাররা। বিদেশের মাটিতে সর্বশেষ ২০০৯ সালে প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ করার স্বাদ পেয়েছিল বাংলাদেশ। সেবার ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে তিন ম্যাচের প্রতিটি জিতে নেয় টাইগাররা। এর আগে ২০০৬ সালে কেনিয়ার মাঠে তাদেরকে বাংলাওয়াশ করেছিল লাল-সবুজের পতাকাধারীরা। আর এবার তৃতীয় দল হিসেবে বাইরে গিয়ে সবকটি ম্যাজ জিতল সুপার লিগের পয়েন্ট টেবিলের দুই নম্বরে থাকা দলটি।
স্বাগতিকদের ছুড়ে দেয়া ২৯৯ রানের টার্গেট তাড়া করে ৫ উইকেটে ৩০২ রান করে সফরকারিরা। জবাবে ৫ উইকেট হারিয়ে ১২ বল বাকি থাকতেই জয়ের বন্দরে নোঙর ফেলে টাইগাররা। আগামী ২২ জুলাই থেকে শুরু হবে টি-টোয়েন্টি সিরিজ। দ্বিতীয় ম্যাচ হবে ২৩ জুলাই এবং একদিন করে বিরতি দিয়ে সিরিজের শেষ ম্যাচটি হবে ২৫ জুলাই। সবগুলো ম্যাচই হবে হারারে স্পোর্টস ক্লাবে।
সবমিলিয়ে এ পর্যন্ত পঞ্চমবার টাইগারদের কাছে হোয়াইটওয়াশ হলো জিম্বাবুয়ে। এর আগে ২০১৫ সালের নভেম্বরে ঢাকায় তিন মাচের সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে জিম্বাবুয়েকে পরাজিত করে বাংলাদেশ। তার আগে ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়েকে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ৫-০ ব্যবধানে পরাজিত করেছিল বাংলাদেশ দল। ২০১৮ সালে ৩-০ ব্যবধানে জিম্বাবুয়েকে পরাজিত করে বাংলাদেশ। এরপর ২০১৯ সালেও জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশের স্বাদ দেয় টাইগাররা।
হারারে ক্রিকেট গ্রাউন্ডে সিরিজের তৃতীয় এবং শেষ ওয়ানডেতে টস জিতে প্রথমে জিম্বাবুয়েকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে সাবধানী শুরু করেছে জিম্বাবুয়ে। রেগিস চাকাবা ও তাদিওয়ানাশে মারুমানির ব্যাটিংয়ে দলের রান বাড়াচ্ছেন। দুই ওপেনারের জুটি বড় হতে থাকলতে সাকিবকে বোলিংয়ে নিয়ে আসেন তামিম। নবম ওভারে বোলিংয়ে এসেই ব্রেক থ্রু দিলেন সাকিব। তার বল সুইপ করতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন ৮ রান করা তাদিওয়ানাশে মারুমানি।
চাকাভাকে সঙ্গ দিয়ে দলীয় স্কোর বড় করছিলেন জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক্ক টেইলর। জুটি ভাঙতে দীর্ঘদিন পর মাহমুদউল্লাহকে বোলিংয়ে নিয়ে আসলেন তামিম। এসেই অধিয়ায়কের আস্থার প্রতিদান দিলেন রিয়াদ। জিম্বাবুয়ে অধিনায়ককে তামিমের ক্যাচ বানিয়ে সাজঘরে পাঠিয়েছিয়েন টাইগার এই অলরাউন্ডার। ৩৯ বলে ২৮ রান করেই ফিরলেন জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক। ২০১৯ সালের পর ফেব্রুয়ারির পর এই প্রথম এ সংস্করণে কোন উইকেট পেলেন মাহমুদউল্লাহ!
দীর্ঘদিন পর বোলিংয়ে এসে জোড়া শিকার করলেন মাহমুদউল্লাহ। টেইলরের পর মায়ার্সকেও ফেরালেন তিনি। ৩৮ বলে ৩৪ রান করে ফিরেছেন মায়ার্স। এর আগে ক্যারিয়ারের তৃতীয় ফিফটি তুলেছেন জিম্বাবুয়ের ওপেনার রেজিস চাকাভা। চাকাভার ফিফটির আগেই ১০০ রান পেরিয়ে গেছে জিম্বাবুয়ে।
মাহমুদউল্লাহর পর জিম্বাবুয়ে শিবিরে আঘাত হেনেছেন মোস্তাফিজ। মাধেভেরেকে সাকিবের তালুবন্দী করে প্যাভিলিয়নে পাঠিয়েছেন কাটার মাস্টার। ৪ বলে ৩ রান করে ফিরেছেন মাধেভেরে।
সেঞ্চুরির পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন রেগিস চাকাভা। কিন্তু তাসকিনের গতিতে পরাস্ত হয়ে সাজঘরে ফিরলেন। তাসকিন পেলেন ম্যাচের প্রথম উইকেট। ৯১ বলে ৭ চার ও ১ ছক্কায় ৮৪ রান করে বিদায় নেন চাকাভা চাকাবা ফেরেন সাজঘরে।
চাকাভার বিদায়ের পর স্বাগতিকদের হাল ধরেছেন সিকান্দার রাজা। ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান ৪৯ বলে ১৭তম হাফ সেঞ্চুরি করেছেন। ষষ্ঠ উইকেটে ১১২ রানের জুটি গড়লে বড় ইনিংসের দিকেই এগোতে থাকে জিম্বাবুয়ে। রাজার পর বার্লও অর্ধশতক পূর্ণ করেন। ৫৪ বলে ৫৭ রানে ফেরেন রাজা। জিম্বাবুয়ের এই ব্যাটসম্যান ফিরেছেন মোস্তাফিজুরের বলে মোসাদ্দেকের ক্যাচ হয়ে।
এরপর এক ওভারেই তিন উইকেট নিয়েছেন সাইফউদ্দিন। দলীয় ২৯৪ রানে বার্লকে থামান টাইগার এই অলরাউন্ডার। আউট হওয়ার আগে বার্ল করেছেন ৪৩ বলে ৫৯ রান। পরের বলে ডোনাল্ড তিরিপানোকে করেন বোল্ড। তেন্দাই চাতারা হ্যাটট্রিক হতে দেননি। দুই বল পরই বোল্ড হন ১ রানে।
শেষ ওভারে ব্লেসিং মুজারাবানিকে শূন্য রানে বোল্ড করেন মোস্তাফিজুর রহমান।
বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ তিনটি করে উইকেট নেন মোস্তাফিজুর রহমান এবং মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। এছাড়া দুটি উইকেট নেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।
২৯৯ রানের বড় লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে দুই ওপেনার তামিম ইকবাল এবং লিটন দাসের ব্যাটে উড়ন্ত সূচনা করেছে বাংলাদেশ। দুজনের জুটিতে ৮৮ রান উঠতেই তামিমের সঙ্গ ছাড়লেন লিটন। মাধেভেরের স্পিনে মারুমানির ক্যাচে বন্দি হয়ে সাজঘরে ফেরেন এই টাইগার ওপেনার। আউট হবার আগে ৩৭ বলে ৩২ রান তুলেছেন লিটন।
তামিমের সঙ্গে ৫৯ রানেই জুটি থামলো সাকিবের। পেসার লুক জংওয়ের অফস্টাম্পের বাইরের লেন্থ বল কাট করতে গিয়েছিলেন সাকিব। টাইমিং মেলাতে পারেননি। ক্যাচ ধরে ফেললেন চাকাভা। তবে আম্পায়ারের আউটের সিদ্ধান্তের পর এটি মানতে পারেননি সাকিব। যদিও এতে কোন প্রতিক্রিয়া দেখাননি বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার। ৪২ বলে সাকিবের রান ৩০।
টেন্ডাই চাতারাকে চার মেরে ক্যারিয়ারের ১৪তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি পূর্ণ করলেন তামিম ইকবাল, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে যা চতুর্থ। মাত্র ৮৭ বলেই মাইলফলকে গেলেন তিনি। ওয়ানডেতে এটি তার দ্রুততম সেঞ্চুরি। এর আগে ২০১০ সালে ৯৪ বলে সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন তিনি। গত বছর মার্চে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই ওয়ানডেতে সর্বশেষ সেঞ্চুরি করেছিলেন তামিম।
ড্রিঙ্কস বিরতির পরই ফিরে গেছেন তামিম। ডোনাল্ড তিরিপানোর খোঁচা দিয়ে ধরা পড়েছেন উইকেটের পেছনে চাকাভার হাতে। ৯৭ বলে ১১২ রান করে ফিরতে হলো তাকে। এর ঠিক পরের বলেই ক্যাচ আউট মাহমুদউল্লাহ। তিরিপানোর বলে ইনসাইড এজড হয়ে চাকাভার হাতেই পড়লো সেই বল।
গেল দুই ম্যাচের ব্যর্থতার পর শেষ ম্যাচে ব্যাট হাতে রান পেয়েছেন মিঠুন। তবে ইনিংস বেশিদূর নিয়ে যেতে পারেননি। মাধেভেরেকে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলেছেন তিনি। সীমানার ওপর সেটি নিয়েছেন টেন্ডাই চাতারা। ৫৭ বলে ৩০ রান করে ফিরেছেন মিঠুন। ভেঙেছে নুরুলের সঙ্গে তার ৬৪ রানের জুটি। শেষ ৬ ওভারে বাংলাদেশের প্রয়োজন ৩০ রান। ক্যারিয়ারে নিজের প্রথম অর্ধশতক তুলে পূর্ণ করে জয় নিয়েই মাঠ ছাড়েন নুরুল হাসান সোহান। ৩৯ বলে ৪৫ রান অপরাজিত থাকেন তিনি। এদিকে আফিফ অপরাজিত ছিলেন ১৭ বলে ২৬ রানে। সূত্র: সমকাল
ফাইল ছবি
নাজমুল হাসান শান্তর প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি সাথে তামিম ইকবাল ও অধিনায়ক মুমিনুল হকের দায়িত্বশীল ব্যাটিং প্রথম টেস্টের প্রথম দিনটি নিজেদের করে নিল টিম টাইগার দিন শেষে মাঠে অপরাজিত ছিল নাজমুল শান্ত ১২৬* রানে এবং অধিনায়ক মুমিনুল হক ৬৪* রানে।
সেঞ্চুরির খুব কাছে গিয়েও উইকেট বিলিয়ে ৯০ রানে থামেন তামিম। এ নিয়ে ২য় বারের মত ৯০ এর ঘরে আউট হলে বাংলাদেশের এই ড্যাশিং ওপেনার। এমন চার টেস্টের মধ্যে তিনটিতে যারা আগে ব্যাট করেছে তারাই জয়ী হয়েছে। সে বিবেচনায় টসটা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একের পর এক ব্যর্থতার বৃত্তে থাকা বাংলাদেশ অধিনায়ক টসে জিতে ব্যাটিং এর সিদ্ধান্তকে কার্যকর করেন ব্যাটসম্যানরা। এদিকে ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ড সফরে অভিষেক হওয়া প্রতিভাবান বা বাঁহাতির ব্যাটসম্যান নাজমুল শান্ত বিরূপ কন্ডিশনে হঠাৎ খেলতে নেমে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি কিন্তু শান্ত প্রতি আস্থা হারায়নি নির্বাচকরা।
আজ ক্যান্ডির পাল্লেকেলে স্টেডিয়ামে দিনটাই নিজের করে নিলেন এই বাহাতি ব্যাটসম্যান। টস জিতে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশ দিনের শুরুতে দলীয় ৮ রানে ব্যক্তিগত ০ রানে সাইফ হাসানের উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে যায়, তবে সে ধাক্কা সামলে নিয়েছেন তামিম-শান্তর ১৪৪রানের জুটি।
দিনের দ্বিতীয় ওভারেই শ্রীলঙ্কার একমাত্র সফল বোলার বিশ্ব ফার্নান্দোর বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়ে সাজঘরে ফিরেন সাইফ।এর পর দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে শান্ত যোগ করেন ১৪৪ রান দলীয় ১৫২ রানে সেঞ্চুরি থেকে ১০ রান দূরে থাকতে আউট হন মি.খান সাহেব।তামিম আউট হবার আগেই ফিফটি তুলে নেন শান্ত।পরে অধিনায়ক মুমিনুল হককে নিয়ে চা বিরতির আগে দলীয় খাতায় যোগ করেন ৪৮ রান। তবে চা বিরতির পরের সেশনে কোন উইকেটই হারায়নি বাংলাদেশ। শান্তের সাথে পাল্লা দিয়ে রান বাড়াতে থাকেন মুমিনুলও।
৭৪তম ওভারের পঞ্চম বলে চার হাঁকিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি তুলে নেন শান্ত। এক হাতে ব্যাট অন্য হাতে হেলমেট উঁচিয়ে মাথা নিচু করে ড্রেসিংরুমে দিকে উদ্দেশ্য উদযাপন করলেন নিজের সেঞ্চুরি। ২৩৫ বলে ১২ চার ১ ছক্কায় সেঞ্চুরিতে পৌঁছানো এই বাঁহাতি দিনশেষে অপরাজিত ২৮৮ বলে ১৪ চার ১ ছক্কায় ১২৬ রানে। মুমিনুল করেন ১১৭ বলে ৫ চারে ক্যারিয়ারের ১৪ তম ফিফটি করেন ১৫০ বলে ৬৪ রান।
দিন শেষে এক প্রতিক্রিয়ায় শান্ত বলেন, গত কয়েক মাসে সত্যিই কঠোর পরিশ্রম করেছি এবং আমি রান করছিলাম না, তবে আমি জানতাম যে আমি যদি ঘুরে দাড়াই এবং আমার প্রাকৃতিক খেলা খেলি তবে আমি স্কোর করতে পারি এবং আমি সত্যিই খুশি।
মানসিকভাবে আমি খুব ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করছি এবং এটি আমাকে অনেক সহায়তা করেছে। আজ আমি ব্যাটিংয়ের সময় অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিলাম এবং কখন এবং কোথায় স্কোর করব সে সম্পর্কে খুব বেশি ভাবছিলাম না, আমার চিন্তার প্রক্রিয়াটি কেবল বলটি দেখার এবং সেই অনুসারে খেলতে হবে। আমাদের ভাল ব্যাট করতে হবে।
প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশের স্কোর: ৩০২/২ (৯০), তামিম ৯০, সাইফ ০, শান্ত ১২৬*, মুমিনুল ৬৪*; বিশ্ব ১৭-২-৬১-২।
ছবি(ডানে): নওয়াব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম স্থপতি নওয়াব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী’র কর্মময় জীবন
জন্ম ও বংশ পরিচয়ঃ
নওয়াব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ১৮৬৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ীর বিখ্যাত জমিদার পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন । তার আড়াইশ’ বছর পূর্বে নওয়াব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর প্রপিতামহ শাহ সৈয়দ খোদা বখ্শ বর্তমান টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ীতে বসতি স্থাপন করেন। এ পরিবারের আদি পুরুষ হযরত শাহ আতীকুল্লাহ (রঃ) বাগদাদ থেকে দিল্লীতে আগমন করেন।
নওয়াব আল চৌধুরী শৈশবে গৃহশিক্ষকের নিকট আরবী, ফার্সী ও বাংলায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। এরপর তাঁর আনুষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরু হয় রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে এবং পরবর্তীতে কলকাতার বিখ্যাত সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে তিনি কৃতিত্বের সাথে এফ. এ পাস করেন।
নওয়াব আরী চৌধুরীর প্রথম স্ত্রী ছিলেন বগুড়ার বিখ্যাত জমিদার সৈয়দ আব্দুস সোবাহান আলী চৌধুরীর কন্যা আলতাফুন্নেসা চৌধুরানী। তাঁর মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন ইতিহাসখ্যাত ঈসা খাঁর শেষ বংশধর সৈয়দা সাঈদা আখতার খাতুনকে। এই স্ত্রী নিঃসন্তান ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি সৈয়দ আবদুস সোবহান আলী চৌধুরীর অপর কন্যা সাকীনা খাতুন চৌধুরাণীকে বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রী আলতাফুন্নেসা চৌধুরাণীর এক ছেলে আলতাফ আলী চৌধুরী এবং এক মেয়ে উম্মে যাহ্বরা লতীফুন্নেসা চৌধুরাণী। তৃতীয় স্ত্রী সাকীনা খাতুন চৌধুরাণীর এক ছেলে হাসান আলী চৌধুরী ও এক মেয়ে উম্মে ফাতিমা হুমায়রা খাতুন।
নওয়াবজাদা হাসান আলী চৌধুরী ১৯৬২-৬৩ সালে পাকিস্তান আমলে শিল্পমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন জাতীয় সংসদের এক প্রবীণ ও বিচক্ষণ সংসদ সদস্য। আলতাফ আলী চৌধুরীর ছেলে মুহাম্মদ আলী চৌধুরী ১৯৫৩-৫৫ সালে খাজা নাজিম উদ্দিনের স্থলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। অপরপক্ষে, নওয়াবজাদা হাসান আলী চৌধুরী’র একমাত্র কন্যা সৈয়দ আশিকা আকবর ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি আমৃত্যু নওয়াব আলী খোদা বখ্শ ধনবাড়ী ওয়াকফ এস্টেটের মোতায়াল্লী ছিলেন। ২০২২ সালে ২৫ এপ্রিল ঢাকার নিজ বাস ভবনে ইন্তেকাল করেন।ধনবাড়ীতে ঐতিহাসিক জামে মসজিদের পার্শ্বে তাকে সমাহিত করা হয়। তাঁর স্বামী বর্তমানে নওয়াব আলী-হাসান আলী স্মৃতি সংসদের প্রেসিডেন্ট ও দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ট্রেজারার ও ভাইস-চ্যান্সেলর এবং আইটি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. আকবর উদ্দিন আহমদ। তাঁদের দুই ছেলে- আবরার উদ্দিন আহমদ ও আফিফউদ্দিন আহমদ।
উল্লেখ্য, ছোট ছেলে আফিফউদ্দিন আহমদ নওয়াব আলী খোদা বখ্শ ধনবাড়ী ওয়াকফ এস্টেট ও জঙ্গলবাড়ী এস্টেটের মোতায়াল্লীর দায়িত্ব পালন করে আসছেন এবং তিন মেয়ে- আলমাস রহমান, স্বামী-কায়হান রহমান, আসফিয়া হোসেন, স্বামী-ফায়সাল হোসেন এবং আতকিয়া আজিম, স্বামী- ব্যারিস্টার হাসান আজিম।প্রত্যেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে স্ব-স্ব পেশায় নিয়োজিত আছেন।
রাজনৈতিক দর্শনঃ
১৯০৫ সালের বঙ্গ-ভঙ্গ আন্দোলন থেকে নওয়াব আলী চৌধুরী রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তিনি একাধারে একজন খাঁটি মুসলমান, বাঙ্গালি এবং সর্বভারতীয় ছিলেন। তাঁর সমসাময়িক সমমনা ও বিরোধী রাজনীতিকদের মধ্যে একমাত্র তিনিই ছিলেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রবক্তাদের প্রবল বাঁধার মুখেও বঙ্গ-ভঙ্গ কার্যকর হয়ে পূ্ববঙ্গ ও আসাম নামক একটি মুসলিম প্রধান প্রদেশ জন্ম লাভ করলে নওয়াব আলী চৌধুরী একটা সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। তিনি মুসলমানদের অনগ্রসতার জন্য অশিক্ষাকে মূলতঃ দায়ী বলে মনে করতেন।
১৯০৫ সালে যেদিন বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়, সেদিনই ঢাকার নর্থব্রুক হলে তাঁর ও ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর উদ্যোগে ‘প্রাদেশিক রাজনৈতিক সংগঠন গঠিত হয়। এ সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম সমাজকে শিক্ষামন্ত্রে উজ্জীবিত করে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ গঠনের ভিত রচনা করা। এরপূর্বে ১৮৮৬ সালে মুসলমানদের শিক্ষাদীক্ষায় উজ্জীবিত করার লক্ষে আলীগড়ে স্যার সৈয়দ আহম ‘অল ইন্ডিয়া এডুকেশনাল কনফারেন্স’ গঠন করেছিলেন। ১৮৯৯ সালের ডিসেম্বর মাসে স্যার সৈয়দ আমির আলীর সভাপতিত্বে কলকাতায় এর প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। আবার তাঁরই সভাপতিত্বে ১৯০৩ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি ‘ক্যালকাটা মোহামেডান ইউনিয়ন’-এর বার্ষিক অধিবেশনে এর বঙ্গীয় শাখা সমিতির অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯০৬ সালের ১৪ এবং ১৫ এপ্রিল নওয়াব আলী চৌধুরী, নবাব সলিমুল্লাহ প্রমুখের সহযোগিতায় ঢাকায় এর শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়।
নবাব সলিমুল্লাহ ও নওয়াব আলী চৌধুরী যথাক্রমে এর সভাপতি ও সম্পাদক নির্বাচিত হন। কংগ্রেসের বিরোধীতার সত্ত্বেও সমিতি কর্তৃক উত্থাপিত শিক্ষা বিষয়ক বেশ কিছু প্রস্তাব সরকার কর্তৃক গৃহীত ও বাস্তবায়িত হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- অনেকগুলো মুসলিম হোস্টেল স্থাপন, ছাত্রবৃত্তি বৃদ্ধি, পাঠ্যসূচী সংশোধন, নুতন মিডল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা এবং মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজি, ইতিহাস, ভূগোল শিক্ষার ব্যবস্থা। ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর বঙ্গভঙ্গ রহিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নতুন প্রদেশে মোট ৪টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯০৪ সালে প্রথম অধিবেশন রাজশাহীতে, ১৯০৮ সালে দ্বিতীয় অধিবেশন ময়মনসিংহে, ১৯১০ সালে অধিবেশন বগুড়ায় এবং ১৯১১ সালে অধিবেশন রংপুরে অনুষ্ঠিত হয়। ভারত বিভক্ত হওয়ার প্রায় ৩০ বছর এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় ৫০ বছর আগে ভারতীয় আইন সভায় তিনি সিলেট জেলাসহ পূর্ববঙ্গকে একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ইউনিটে পরিণত করার প্রস্তাব দেন।
তিনি বঙ্গভঙ্গ সম্পর্কে বলেন, ‘প্রদেশ করার জন্য যুদ্ধ করিয়াছি এবং যদিও সে সেষ্টা সফল হয় নাই, তথাপিও পূর্ববঙ্গে যাহারা আমাদের প্রতিপক্ষ ছিলেন, তাহারা পর্যন্ত স্বীকার করিবেন যে, আমরা যাহার জন্য চেষ্টা করিয়াছিলাম, তাহাই ঠিক এবং বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়াতে ঐ প্রদেশের হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই ক্ষতি হইয়াছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাঃ
১৯১১ সালের ১৯ আগষ্ট ঢাকার কার্জন হলে ল্যান্সলট হেয়ারের বিদায় এবং চার্লস বেইলীর শুভাগমন উপলক্ষে সংবর্ধনা সভার পৃথক দুটি মানপত্রে নওয়াব সলিমুল্লাহ ও নওয়াব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। ১৯১২ সালে ৩১ জানুয়ারি লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় অবস্থানকালে নবাব সলিমুল্লাহ ও নওয়াব আলী চৌধুরীসহ ১৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল তার সাথে সাক্ষাৎ করে বঙ্গ-ভঙ্গ রদের ফলে মুসলমানদের যে ক্ষতি হচ্ছে সেসব তুলে ধরেন। এ সময় তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানালে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দিয়ে চলে যান। এলক্ষ্যে ২৭ মে, ১৩ সদস্যবিশিষ্ট নাথান কমিটি গঠিত হলে নওয়াব আলী চৌধুরী এই কমিটিতে অন্যতম সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এই কমিটির অধীনে ২৫টি সাব কমিটি গঠিত হলে তিনি ৬টি বিভাগের সদস্য নিযুক্ত হয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হলে আর্থিক সংকটের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ চাপা পড়ে যায়। সে সময নওয়াব আলী চৌধুরী ছিলেন ইমপিরিয়াল কাউন্সিলের সদস্য। তিনি বিষয়টি ১৯১৭ সালে ৭ মার্চ ইম্পিরিয়াল কাউন্সিলে পূণরায় উত্থাপন করেন এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯২০ সালে ১৮ মার্চ ভারতীয় আইনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল অ্যাক্টে পরিণত হয়। ২৩ মার্চ তা গভর্ণর জেনারেলের অনুমোদন লাভ করে। লর্ড হার্ডিঞ্জ কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির ৯ বছর পর ১৯২১ সালের জুলাই মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস যথারীতি শুরু হয়।
পরবর্তী বছর ১৯২২ সালে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তিবাবদ ১৬ হাজার টাকার একটি তহবিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রদান করেন। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে অর্থাভাব দেখা দিলে সে যুগের এই দানশীল একাই নিজ জমিদারীর একাংশ বন্ধক রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে এককালীন ৩৫ হাজার টাকা প্রদান করেন।শিক্ষার ব্যাপারে তিনি এতোটাই আন্তরিক ছিলেন যে, তার সেই অভিজ্ঞতা ও মেধা কাজে লাগানোর জন্য যখন তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলমান মন্ত্রী ছিলেন, তখন তাকে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বও প্রদান করা হয়।
১৯২৯ সালের ১৭ এপ্রিল ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।এদেশের মানুষের শিক্ষা বিস্তারে নারীদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা তাঁর কিছু উক্তির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তাঁর উক্তি ‘আমাদের বালিকাদের প্রশিক্ষণের পরই আমাদের বালকদের শিক্ষা অনেকাংশে নির্ভর করে। শিক্ষার প্রাথমিক স্কুল হলো বাড়ি। মায়েরা শিক্ষিত না হলে শিশুদের চরিত্র গঠনের আশা করা যায়না। এ বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ।’ (১৯১৪ সালে ১১ এপ্রিল ঢাকায় বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি মুসলমান শিক্ষা সমিতির সভায়।)
এছাড়াও দেশে ৩৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে তিনি জমি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। ১৯১০ সালে তিনি তাঁর নিজস্ব এলাকা ধনবাড়ীতেও ধনবাড়ী নওয়াব ইনষ্টিটিউট নামের একটি হাইস্কুল স্থাপন করেন। এছাড়া সোনাতলা, কোদালিয়া, গফরগাঁও, পিংনা, জঙ্গলবাড়ি, হযরতনগরসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে সহায়তা প্রদান করেন।
শিক্ষার প্রতি অতি অনুরাগী এই দানবীরের নামে দেরীতে হলেও তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বপরূপ ২০০৩ সালে ৯ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজের সভাপতিত্বে সিন্ডিকেটের এক সভায় সর্বসম্মতিক্রমে নওয়াব আলী চৌধুরীর নামে সিনেট ভবন নামকরণ করা হয়। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাত যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর সীমাহীন অবদান, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরতে পরতে তাঁর নাম অম্লান থাকবে, এটাই পরবর্তী প্রজন্মের নিকট প্রত্যাশা।
বাংলা ভাষা ও নওয়াব আলী চৌধুরীঃ
নওয়াব আলী চৌধুরী ১৯১১ সালে রংপুর অধিবেশনে মাতৃভাষা বাংলার স্বপক্ষে প্রথম সোচ্চার হয়ে বলেছিলেন, ‘বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, মাতৃস্তনের ন্যায়, জন্মভূমির শান্তি নিকেতনের ন্যায় বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষা আমাদের নিকট প্রিয়, কিন্তু হতভাগ্য আমরা, প্রিয় মাতৃভাষার উন্নতিকল্পে আমরা উদাসীন। অধ:পতন আমাদের হবে না-তো কার হবে?’
তৎকালীন প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে একজন জমিদার হয়ে বাংলা রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে তিনি আপোষহীন ভূমিকার স্বাক্ষর রাখেন। উর্দূ ও ইংরেজী ভাষার সমর্থক নওয়াব আব্দুল লতিফ, স্যার সৈয়দ আমির আলী ও নবাব সলিমুল্লাহর রাজনৈতিক অনুসারী হয়েও তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে কথা বলেন।
১৯২১ সালে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য লিখিত প্রস্তাব পেশ করেন নওয়াব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। তখন ভারতের রাষ্ট্রভাষা কি হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বাংলার অভিজাত মুসলমানরা উর্দুর পক্ষে এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুরা হিন্দীর পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। ঠিক সে সময়ে নওয়াব আলী চৌধুরী লিখিত প্রস্তাবের মাধ্যমে বৃটিশ সরকারকে বলেছিলেন, ভারতের রাষ্ট্রভাষা যাই হোক, বাংলার রাষ্ট্রভাষা করতে হবে বাংলা-কে।
সাহিত্য সংস্কৃতিতে পৃষ্ঠপোষকতাঃ
নওয়াব আলী চৌধুরী সাহিত্যসেবীদের আর্থিক এবং অন্যান্য বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতেন। মহাকবি কায়কোবাদ, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, পন্ডিত রেয়াজউদ্দিন আহমদ আল মাশহাদী, কবি মোজাম্মেল হক প্রমুখ তাদের সাহিত্য প্রকাশনায় নওয়াব আলী চৌধুরীর দান ছিল অপরিসীম। ফলে উল্লেখিত লেখকগণ তাদের বিভিন্ন প্রকাশনায় নওয়াব আলী চৌধুরীর নামে উৎসর্গ করে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
১৮৯৫ সাল থেকে ১৯০৪ সাল পর্যন্ত নওয়াব আলী চৌধুরীর কর্মতৎপরতা ছিল প্রধানত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিককেন্দ্রিক। ১৮৯৫ সালে ‘মিহির’ ও ‘সুধাকর’ পত্রিকা একত্রিত হয়ে সাপ্তাহিক ‘মিহির-সুধাকর’ নামে আত্বপ্রকাশ করে। তিনি এ পত্রিকার মালিক ছিলেন। এজন্য একটি প্রেস ক্রয় করে কলকাতাস্থ বাসভবনে স্থাপন করেন। ভাষা সৈনিক, সমাজসেবী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষানুরাগী অনন্য জমিদার নওয়াব আলী চৌধুরী একজন সাহিত্যিকও ছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ-ঈদুল আজহা (১৮৯০), মৌলুদ শরীফ (১৯০৩), ভারনাকুলার এডুকেশন ইন বেঙ্গল (১৯০০) এবং প্রাইমারী এডুকেশন ইন রুরাল এরিয়াস (১৯০৬) প্রকাশিত হলে সকল মহলে প্রশংসিত হয়।
বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বসমূহঃ
নওয়াব বাহাদুল সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক তথা বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিধি এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, অল্প পরিসরে তা উল্লেখ করা সম্ভবপর নয়।
নিম্নে উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বসমূহঃ
১। ময়মনসিংহ মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার।
২। ময়মনসিংহ ডিস্টিক্ট বোর্ডের মেম্বার।
৩। ১৯১৪ সালে আইন পরিষদের সদস্য।
৪। ১৯০৬-১১ সাল পর্যন্ত পূর্ববঙ্গ ও আসাম ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য।
৫। ১৯২১-২৩ সালে ইন্ডিয়ান লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য।
৬। ১৯০৬ সালে ঢাকার শাহবাগে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ গঠনের সময় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সেক্রেটারী জেনারেল।
৭। মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় কমিটির সহ-সভাপতি।
৮। মুসলিম লীগের গঠনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য ৩ সদস্য কমিটির অন্যতম সদস্য।
৯। ১৯০৭ সালে করাচিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের প্রথম অধিবেশনে পূর্ব বাংলা ও আসামের পক্ষে প্রতিনিধিত্বকারী।
১০। ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দাবী নিয়ে দিল্লীতে সম্রাট পঞ্চম জর্জের সাথে সাক্ষাৎ।
১১। ১৯১২ সালের ৩ ও ৪ মার্চ মুসলিম লীগের অধিবেশনে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব সাংগঠনিকভাবে পাসকরণ।
১২। ১৯১৬ সালে লাক্ষ্ণৌ অধিবেশনে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়নের দাবী পুনঃউত্থাপন।
১৩। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য।
১৪। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটির সদস্যসহ প্রেসিডেন্সী কলেজের গভর্নিং বোর্ড, মুসলিম শিক্ষা সম্বন্ধীয় উপদেষ্ঠা কমিটি, পূর্ববঙ্গ ও আসামের মুসলমানদের বিবাহ রেজিষ্ট্রার ও কাজী নিয়োগ ও পরিদর্শনের স্থায়ী কমিটি, হাই মাদ্রাসা সংস্কার কমিটি, বঙ্গদেশ গ্রাম্য প্রাথমিক শিক্ষা কমিটি, পূর্ববঙ্গ ও আসাম সেন্ট্রাল টেক্সট বুক কমিটির সদস্য, সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেহান এসোসিয়েশনের সভাপতিসহ ইংল্যান্ড প্রবাসী ভারতীয় ছাত্রদের সাহায্য সহায়তার জন্য যে শিক্ষাসভা ও পরামর্শসভা ছিল তার প্রাদেশিক শাখা কমিটির সদস্য, পূর্ববঙ্গ ও আসামের শিল্প ও চিকিৎসা কনফারেন্সের সদস্য, ইম্পিরিয়াল কনফারেন্সের সদস্য, ধর্ম বিষয়ে দান করার জন্য গঠিত ইম্পিরিয়াল কনফারেন্সের সদস্য এবং পূর্ববঙ্গ আসাম শিক্ষা বোর্ডের পাঠ্য তালিকা প্রণয়ন কমিটির একমাত্র মুসলমান সদস্য ছিলেন তিনি।
বিভিন্ন খেতাবসমূহঃ
১৮৯৬ সালে খান বাহাদুর, ১৯১১ সালে নওয়াব, ১৯১৮ সালে কম্পানিয়ন অব দি মোস্ট এমিনেন্ট অর্ডার অব দি ইন্ডিয়ান এম্পেয়ার (সি.আই.ই) এবং ১৯২৪ সালে নওয়াব বাহাদুর পদবী লাভ করেন।
ইন্তেকালঃ
এই মহান পুরুষ ১৭ এপ্রিল ১৯২৯, বাংলা ১৩৩৬ সালের ১লা বৈশাখে দার্জিলিং-এর ইডেন ক্যাসেলে ইন্তেকাল করেন। দার্জিলিং থেকে কলকাতা হয়ে তাঁর লাশ ধনবাড়ীতে আনা হয় এবং ৪ বৈশাখে তাঁর হাতে গড়া বিখ্যাত ধনবাড়ী নওয়াব জামে মসজিদের পার্শ্বে সমাহিত করা হয়। তিনি সারাজীবন শিক্ষা-দীক্ষায় পশ্চাৎপদ বাঙ্গালী মুসলমানদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলার অনবদ্য প্রয়াস চালিয়ে গেছেন। তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এ জাতির সেবায় নিজেকে আত্বনিয়োগ করে গেছেন। সবশেষে নওয়াব পরিবারের আধ্যাত্বিক চেতনার বহিঃপ্রকাশের একটি বিরল দৃষ্টান্ত হল- এই মহা মণীষীর মৃত্যুর ৯৫ বছর পরও তাঁর অছিয়ত অনুযায়ী তাঁদের কবরের পাশে দিন-রাত ২৪ ঘন্টা কোরআন তেলাওয়াতের ব্যবস্থা এখনও জারি আছে।
লেখক:
মোহা: খোরশেদ আলম
সম্পাদক, মুক্তসংবাদ প্রতিদিন ও
সেক্রেটারী, নওয়াব আলী-হাসান আলী স্মৃতি সংসদ, ধনবাড়ী, টা্ঙ্গাইল।