a
সংগৃহীত ছবি
মহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকায় ঢাকার চারপাশের নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জসহ সাত জেলায় কঠোর লকডাউন (বিধিনিষেধ) শুরু হয়েছে। মাদারীপুর, রাজবাড়ী ও গোপালগঞ্জও আছে এই লকডাউনের আওতায়।
এই লকডাউন বহাল থাকবে মঙ্গলবার (২২ জুন) সকাল ৬টা থেকে ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত। এতে ঢাকা প্রায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
ইতিমধ্যে ঢাকা থেকে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ঢাকা থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করা দূরপাল্লার বাসও বন্ধ রয়েছে। এই জেলাগুলোর মধ্যে যেগুলোতে ট্রেন চলাচল করে, সেখানে বন্ধ থাকবে।
গত সোমবার রাতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিটিএ) জানিয়েছে যে, কঠোর লকডাউন দেয়া ৭টি জেলার মধ্যে ছাড়াও ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল মঙ্গলবার (২২ জুন) সকাল ৬টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
অন্যদিকে ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচলকারী দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ।
সোমবার রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সরকার যে সাত জেলায় লকডাউন ঘোষণা দিয়েছে, তার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, রাজবাড়ী জেলায় রেল যোগাযোগ রয়েছে। এই তিনটি জেলায় ট্রেনে যাত্রী পরিবহন বন্ধ থাকবে। এসব জেলায় ট্রেন থামবে না। গাজীপুরে ক্রসিংয়ে ট্রেন থামলেও যাত্রী ওঠানামা করতে পারবে না। বাকি চারটি জেলা-মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, মুন্সিগঞ্জ, গোপালগঞ্জে ট্রেন যোগাযোগ নেই।
সোমবার (২১ জুন) বিকেলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জরুরি ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, রাজবাড়ী, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জে বিধিনিষেধ (লকডাউন) আরোপ করা হয়েছে।
লকডাউন চলাকালে সার্বিক কার্যাবলি চলাচল (জনসাধারণের চলাচলসহ) সকাল ৬টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। এ সময় শুধু আইন-শৃঙ্খলা এবং জরুরি পরিষেবা, যেমন-কৃষি উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি), খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্য পরিবহন, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, কোভিড-১৯ টিকা প্রদান, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস/জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, বন্দরসমূহের (নদীবন্দর) কার্যক্রম, টেলিফোন ও ইন্টারনেট (সরকারি-বেসরকারি), গণমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া), বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ডাকসেবাসহ অন্যান্য জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিস, তাদের কর্মচারী ও যানবাহন এবং পণ্যবাহী ট্রাক/লরি এ নিষেধাজ্ঞার আওতাবহির্ভূত থাকবে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
ফাইল ছবি
অন্যান্য বছরের ন্যায় এবারেও রমজান মাসে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য অফিস সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত মোতাবেক অফিস সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে সকাল ৯টা থেকে বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত।
সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ৩ বা ৪ এপ্রিল থেকে মুসলমানদের সিয়াম সাধনার মাস রমজান শুরু হবে। বর্তমানে অফিস সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, রমজানে বেলা সোয়া ১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত জোহরের নামাজের বিরতি থাকবে। সাপ্তাহিক ছুটি থাকবে যথারীতি শুক্র ও শনিবার। ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ডাক, রেলওয়ে, হাসপাতাল ও রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা এবং অন্যান্য জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এ সময়সূচির আওতার বাইরে থাকবে।
এসব প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী জনস্বার্থ বিবেচনা করে সময়সূচি নির্ধারণ ও অনুসরণ করবে। সূত্র: যুগান্তর
ছবি সংগৃহীত
আইনের শাসন যে কোনো সমাজে টেকসই শান্তি ও উন্নতির জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ। আইন সবকিছুর ঊর্ধ্বে এবং আইনের শাসনের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশে আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। সুশাসন ও সৎ বিচারব্যবস্থা ছাড়া আইনের শাসন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি একটি পূর্বশর্ত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ব্রিটিশ শাসনকাল ছাড়া উপমহাদেশের ইতিহাসে আমরা কখনো প্রকৃত অর্থে আইনের শাসনের অভিজ্ঞতা পাইনি।
আজকের বিশ্বে আইনের শাসনকে সমাজ শাসনের একটি কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিখ্যাত ব্রিটিশ আইনজ্ঞ এ. ভি. ডাইসি ‘আইনের শাসন’-এর প্রবক্তা। তিনি সমাজে শৃঙ্খলা ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আইনের গুরুত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। আইনের শাসনের তিনটি মূলনীতি হলো—
১. আইনকে স্বেচ্ছাচারীভাবে ব্যবহার করা যাবে না।
২. প্রতিটি নাগরিক আইনের চোখে সমান।
৩. নাগরিকদের অধিকার সংবিধানে নিশ্চিত থাকতে হবে।
কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, তার সামাজিক অবস্থান বা ক্ষমতা যাই হোক না কেন। "আপনি যত উচ্চ পদেই থাকুন না কেন, আইন আপনার ঊর্ধ্বে"—এই নীতিই আইনের শাসনের মূল আদর্শ।
স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও চ্যালেঞ্জসমূহ:
একটি স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ কাজ। যেহেতু পুরো বিষয়টি জটিল, তাই তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সুফল আসবে না। এ কাজে যথাযথ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের যুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিতেও কুণ্ঠাবোধ করা উচিত নয়, কারণ দক্ষ ও পেশাদার ব্যক্তিদের ছাড়া বিচারব্যবস্থার সংস্কার সম্ভব নয়।
একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থা গঠনে নতুন বিচারকদের নির্বাচন, নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এটি একদিনের মধ্যে সম্ভব নয়, তবে দেরি না করে অবিলম্বে কাজ শুরু করা উচিত।
বর্তমান বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা:
বর্তমান বিচারব্যবস্থা সমাজে প্রকৃত অর্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম নয়। এটি একটি ফ্যাসিবাদী সরকারকে সুবিধা দিতে গঠিত হয়েছে, জনগণের কল্যাণে নয়। তাই পুরো বিচারব্যবস্থা পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। যদিও বিচারকগণ বিচারব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি, তবে আইনজীবীদের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিচারব্যবস্থা শুধু বিচারকদের নিয়ে গঠিত নয়, আইনজীবীরাও এর অংশ। আইনজীবীদের মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা ও উৎসাহ সৃষ্টি করতে হবে।
আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার পুরোপুরি নির্ভর করে বিচারক ও আইনজীবীদের সততা ও পেশাদারিত্বের ওপর। যদি এই দুই সম্প্রদায়ের কোনো একটি দুর্নীতিগ্রস্ত হয় বা পেশাগতভাবে অযোগ্য হয়, তাহলে সমাজে আইনের শাসন কার্যকর করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তদন্ত ও অপরাধ বিচার ব্যবস্থায় সংস্কার:
অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অপরাধ তদন্ত কর্মকর্তাদের অবশ্যই সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল হতে হবে। অপরাধ দমন ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।
এ ছাড়াও, সমাজের দায়িত্বও কম নয়। জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কীভাবে সাধারণ মানুষ এই সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সহযোগিতা করতে পারে, তা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। নৈতিক শিক্ষার উন্নয়ন জনগণের চারিত্রিক পরিবর্তন আনতে পারে, যা এই লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থনৈতিক সংস্কার ও সামাজিক উন্নয়ন:
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গরিব জনগণের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। অন্যথায় কোনো সংস্কারই টেকসই ফল আনবে না। বেশিরভাগ অপরাধ দারিদ্র্যের কারণে সংঘটিত হয়, তাই মানুষের জীবনমান উন্নয়নে জরুরি অর্থনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক যাকাত ব্যবস্থা গরিব মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কার্যকর উপায় হতে পারে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা:
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম যদি সঠিকভাবে কাজ করে, তাহলে বিচারব্যবস্থা সংস্কার সহজ হবে। তারা একদিকে সমাজকে সচেতন করতে পারে, অন্যদিকে বিচারব্যবস্থার পর্যবেক্ষক হিসেবেও কাজ করতে পারে।
আইনের শাসনকে একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। সুশাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অপরিহার্য, তবে শুধু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যথেষ্ট নয়। সমগ্র সমাজকে এই আন্দোলনে অংশ নিতে হবে, তবেই টেকসই শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
লেখক: অধ্যাপক কর্ণেল আকরাম
সম্পাদক, মিলিটারি হিস্টোরি জার্নাল