a
ফাইল ছবি । গোলাম মাওলা রনি
শিরোনামের প্রবাদবাক্যটি কে রচনা করেছিলেন আমার জানা নেই। তবে আমাদের দেশের হাটে-ঘাটে-মাঠে তো বটেই এমনকি অন্দরমহলের একান্ত আলোচনাতেও প্রবাদটি এত বেশি আলোচিত হয় যার কারণে এটি এখন আবু বঙ্গালা অথবা মুঞ্জালাদের দেশে যেন সর্বাধিক উচ্চারিত বেদবাক্যে পরিণত হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ায় যে পরাজিত হয় সে কাঙাল প্রজারূপে নিজেকে রাজার আসন থেকে নামিয়ে নিয়ে আসে স্বেচ্ছায় এবং সব দায়-দায়িত্ব বিজয়ীর ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে রাজা বানিয়ে অভিসম্পাত করতে গিয়ে বলে ওঠে, রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট, প্রজা কষ্ট পায়! স্বামী-স্ত্রী ছাড়া অন্যান্য সম্পর্ক বা শ্রেণীপেশার লোকজন যখন স্বার্থের সঙ্ঘাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় তখন হাজারো ঐতিহ্যবাহী গালিগালাজের পাশাপাশি ভদ্র ভাষায় যে অভিসম্পাত দেয়া হয় সেগুলোর মধ্যে আজকের শিরোনামের প্রবাদ বাক্যটিই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়।
রাজা কে- অথবা প্রজা কে কিংবা রাজার কোন দোষে প্রজা কষ্ট পায় তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে দুটো শব্দের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন। প্রথম শব্দটি হলো- আবু বঙ্গালা। মধ্যযুগের বিখ্যাত ঐতিহাসিক মিনহাজ উস সিরাজ তার তুযুকে ফিরোজশাহী গ্রন্থে আবু বঙ্গালা শব্দটি ব্যবহার করেছেন। দিল্লির সম্রাট ফিরোজ শাহ তুখলক যখন বাংলায় এসেছিলেন বিদ্রোহ দমনের জন্য, তখন তার সাথে মিনহাজ উস সিরাজও ছিলেন। তখনকার দিনে যারা বাঙালিদের নেতৃত্ব দিতেন তাদের আবু বঙ্গালা অর্থাৎ বাঙালিদের পিতা বলা হতো। মিনহাজ উস সিরাজের মতে- তখন বাংলা প্রদেশে শত শত আবু বঙ্গালা ছিল যারা মূলত গোত্রপতি এবং জায়গিরদার বা সরকারের পক্ষে খাজনা আদায়কারীরূপে আখ্যায়িত হতেন। তারা যোদ্ধা ছিলেন এবং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নির্ধারিত সংখ্যক সৈন্য পুষতেন।
আবু বঙ্গালারা জায়গীর লাভ করতেন দিল্লির সম্রাটের কাছ থেকে। সুতরাং সম্রাটের প্রয়োজনে তারা তাদের পোষ্য সৈন্যসহ সম্রাটের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ বিজর্সন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। এমনকি সম্রাট যদি তার নিযুক্ত প্রাদেশিক গভর্নরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেন সে ক্ষেত্রে নিয়ম মোতাবেক আবু বঙ্গালারা সম্রাটের বাহিনীর সঙ্গে একীভূত হয়ে যুদ্ধ করতেন এবং এটাই শত শত বছর ধরে চলে আসছিল সারা ভারতবর্ষে। তবে ভারতের অন্যান্য অংশের জায়গিরদাররা যেভাবে দিল্লির প্রয়োজনে বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্ব পালন করতেন তা কিন্তু প্রায়ই বাংলায় এসে উল্টো রূপ ধারণ করত। অর্থাৎ আবু বঙ্গালারা সুযোগ পেলেই কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করত এবং কোনো প্রাদেশিক গভর্নর যদি বিদ্রোহ করত তবে তারা নিয়োগকর্তার অবদান ভুলে বিদ্রোহীর পক্ষ অবলম্বন করত।
আবু বঙ্গালাদের উল্লেখিত চরিত্রের কারণে দিল্লির নিযুক্ত গভর্নররা এ দেশে এসেই স্বাধীন ও সার্বভৌম শাসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন এবং প্রায়ই বিদ্রোহ করে বসতেন। দিল্লির সুলতানি আমল থেকে শুরু করে মোঘল পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত ছিল। ফলে বাংলার ঘন ঘন বিদ্রোহ নিয়ে দিল্লিকে তটস্থ থাকতে হতো। মিনহাজ উস সিরাজ যে সময়ের কথা বলছেন সেটা সম্ভবত ১৩৫৩ সাল ছিল। মিনহাজের মতে দিল্লির কেন্দ্রীয় বাহিনী যখন যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলো তখন আবু বঙ্গালারা তাদের সৈন্য সামন্তসহ ফিরোজ শাহ তুঘলকের পক্ষ ত্যাগ করে গভর্নর ইলিয়াস শাহের পক্ষ নিলো। ইলিয়াস বারবার চেষ্টা করছিলেন আত্মসমর্পণ করার জন্য। কিন্তু আবু বঙ্গালারা তাকে যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করতে থাকল। ফলে একটি অসম যুদ্ধে ইলিয়াস শাহের পরাজয় ঘটল এবং হাজার হাজার বঙ্গালা সৈন্য মারা পড়ল।
আবু বঙ্গালাদের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে এবার মুঞ্জালা শব্দ নিয়ে কিছু বলি। এটি একটি চৈনিক শব্দ। চীন দেশে অন্তত হাজার খানেক জনপ্রিয় চীনা ভাষা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে মান্ডারিন এবং ক্যান্টনিজ ভাষায় সংখ্যাগরিষ্ঠ চীনা কথা বলে। এই দুটি ভাষার বাইরে গুয়ানিজ এবং সাংহায়ানিজ ভাষাও অত্যন্ত জনপ্রিয়। গুয়াংসু প্রদেশের বেশির ভাগ লোকের কথ্য ভাষার নাম গুয়ানিজ। অন্য দিকে বৃহত্তম সাংহাই এলাকার লোকজন সাংহায়ানিজ ভাষায় কথা বলে। আজকের নিবন্ধে আমি যে মুঞ্জালা শব্দের কথা বলছি তা মূলত সাংহাই অঞ্চলের শব্দ। এই এলাকার অধিবাসীরা বাংলাদেশের লোকজনকে মুঞ্জালা বলে ডাকে। আপনি যদি কখনো ওই এলাকায় যান তবে তারা আপনাকে বাংলাদেশীর পরিবর্তে মুঞ্জালা বলে সম্বোধন করবে। সাংহাই বিমানবন্দরে বাংলাদেশী পাসপোর্ট দেখামাত্র ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তারা ফিসফাস করে মুঞ্জালা মুঞ্জালা বলে আরো কিসব কথাবার্তা তাদের সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করে এবং পাসপোর্টটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার পরখ করতে থাকে।
ব্যবসায়িক কাজে আমাকে একটা সময় খুব ঘন ঘন চীন যেতে হতো। আমি সাধারণত ঢাকা থেকে সরাসরি হংকং যেতামÑ তারপর সেখানকার কাজ সেরে সোজা সাংহাই যেতাম। তারপর অভ্যন্তরীণ রুট ব্যবহার করে চীনের অন্যান্য শহর-বন্দরে যেতাম। এর বাইরে সিঙ্গাপুর-ব্যাংকক অথবা কুয়ালালামপুরে কাজ থাকলে সেখান থেকেও সরাসরি সাংহাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যেতাম এবং প্রত্যেকবারই লক্ষ্য করতাম যে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা আমার পাসপোর্টটি হাতে নিয়ে ১০-১২ মিনিট ধরে নাড়াচাড়া করত এবং একটু পরপর আমার দিকে তাকাত। এরপর মাইক্রোফোনে চীনা ভাষায় যেন কিসব বলত যার মধ্যে শুনতে শুনতে আমি মুঞ্জালা শব্দটি মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। আমি আমার স্বাভাবিক কমনসেন্স দ্বারা অনুধাবন করতাম যে, আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তারা আমার গতিবিধি এবং মতিগতি বুঝার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, ডেস্কে বসা কর্মকর্তাটি আমার পাসপোর্টের পাতা উল্টাতে উল্টাতে আমার ভ্রমণবৃত্তান্ত হয়তো তার কর্তৃপক্ষকে জানাত।
আমাকে কোনো দিন অন্য কোনো চীনা বিমানবন্দরে জিজ্ঞাসাবাদ তো দূরের কথা এমনকি কোনো প্রশ্নও তারা করেনি। কেবল সাংহাই বিমানবন্দরে উল্লিখিত উপায়ে কালক্ষেপণ করাত। এ অবস্থায় আমার মনে প্রশ্ন জাগল ওরা কেন বাঙালিদের দেখলে মুঞ্জালা মুঞ্জালা বলছে এবং বেশির ভাগ বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীকে হয়রানি করছে। এ অবস্থায় সাংহাইতে আমাদের কোম্পানির এজেন্ট রিচার্ডকে বিষয়টি বললাম। কিন্তু সে কোনো সদুত্তর দিতে পারল না। এরপর আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম মুঞ্জলা শব্দের অর্থ কি। সে আমার কথা শুনে কিছুটা বিব্রত হলো এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করল প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমি যখন নাছোড়বান্দার মতো তাকে চেপে ধরলাম তখন সে জানাল যে মুঞ্জালা অর্থ বোকা বা নির্বোধ মানুষের দেশ। এ ঘটনার পর আমি আর কোনো দিন সাংহাই বিমানবন্দর দিয়ে ইন করিনি। আবু বঙ্গালা এবং মুঞ্জালা নিয়ে বহু মজার কাহিনী এবং অনেক ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি দেয়া যাবে। কিন্তু আমি ওদিকে না গিয়ে আজকের শিরোনাম প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু করতে চাই। আবু বঙ্গালাদের কারণে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে অসংখ্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বিগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে যার ফলে সাধারণ জনগণের দুঃখ দুর্দশা বা কষ্টের কোনো সীমা পরিসীমা ছিল না। অধিকন্তু আমাদের দেশকাল সমাজে আবু বঙ্গালা প্রবৃত্তির নেতা পাতিনেতা চামচা ও সুবিধাভোগীদের আধিক্য এবং তাদের প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে যুগ যুগ ধরে আমজনতা নির্যাতিত নিপীড়িত ও বঞ্চিত হয়ে আসছে। ফলে আমাদের গড়পড়তা সাধারণ বুদ্ধি বা কমনসেন্স কমতে কমতে রীতিমতো তলানিতে ঠেকেছে। তা ছাড়া আমাদের সেন্স বা মানসিক সুস্থতার সূচকও অন্যান্য দেশের তুলনায় নিম্নগামী। আমরা যদি আমাদের সেনসিবিলিটি বা অনুভব শক্তি অর্থাৎ মানুষের সুকুমার মনোবৃত্তি আবেগ এবং সংবেদনশীলতাকে মূল্যায়ন করার ক্ষমতার কথা বিবেচনা করি তবে জাতিগতভাবে লজ্জিত হতে হবে।
আমরা যদি আমাদের সেন্স অব হিউমার বিশ্লেষণ করি তবে দেখতে পাব যে, এই অসাধারণ মানবিক গুণটি স্থূল হতে হতে রীতিমতো গর্ভবতী গর্দভ বা গন্ডারের পেটের মতো হয়ে গেছে। আমাদের সেনটিমেন্ট বা হৃদয়ানুভূতি কবে যে সেন্সলেস অর্থাৎ নির্বোধ, মূঢ় বা অর্থহীন হয়ে পড়েছে তা বোঝার জন্য মুঞ্জালা শব্দের অর্থ এবং ব্যাখ্যা সংবলিত চৈনিক টিকা গ্রহণের বিকল্প নেই। উল্লিখিত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যদি রাজা এবং প্রজার সমীকরণ করতে চাই তবে দেখতে পাবো যে, আবু বঙ্গালা প্রকৃতির নেতৃত্ব থাকলে প্রজাদের দুর্ভোগ যেমন বাড়ে তেমনি প্রজারা এক সময় মানবিক গুণাবলি হারিয়ে মুঞ্জালার বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। এমন অবস্থায় প্রজাদের ওপর প্রকৃতিগতভাবেই নিকৃষ্ট রাজা চেপে বসে। আর নিকৃষ্ট রাজার অদ্ভুত সব পাগলামো এবং নির্বুদ্ধিতা কিভাবে প্রজাদের জীবনকে জাহান্নামে রূপান্তর করে ফেলে তার কিছু পরোক্ষ উদাহরণ আমরা মিনহাজ উস সিরাজের তুযুকে ফিরোজশাহীতে এবং ইবনে বতুতার ভ্রমণ বৃত্তান্তে পেয়ে যাবো।
ইতিহাসের পাঠকরা নিশ্চয়ই জানেন যে, আমাদের রাজনীতি অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থায় যখন মারাত্মক কোনো অসঙ্গতি অনিয়ম এবং আজব তামসার ঘটনা ঘটে তখন আমরা সাধারণত সেটিকে তুঘলকি কাণ্ড বলে থাকি। সর্বভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েক হাজার বছরের রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি যদি বিচার বিশ্লেষণ করা হয়, তবে সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক এবং পরে ফিরোজ শাহ তুঘলকের জমানায় যেসব পরস্পরবিরোধী কর্মকাণ্ড ঘটেছে তার সাথে অন্য কোনো রাজা বাদশাহদের রাজত্বকালের তুলনা চলে না। এই দুই তুঘলকি শাসকের কারণে রাজধানী দিল্লি দুইবার বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে। মুহাম্মদ বিন তুঘলক দিল্লি থেকে রাজধানী দেবগিরিতে স্থানান্তর করতে গিয়ে ভারতের অর্থনীতির সর্বনাশ ঘটিয়েছেন এবং প্রচণ্ড রক্তপাত নিষ্ঠুরতা ও অহেতুক যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে লাখ লাখ লোকের প্রাণ সংহার করেছেন। তিনি রাজনীতি সিংহাসন এবং রাজপ্রাসাদকে এতটাই ভয়ঙ্কর বানিয়ে ফেলেছিলেন যে, তার মৃত্যুর পর কেউ সুলতান হতে চায়নি এবং পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই একমাত্র বিরল ঘটনা যে ভারতবর্ষের মতো বৃহত্তম সাম্রাজ্যের সম্রাটের মৃত্যুর পর কেউ সিংহাসনে বসতে চায়নি- ফলে পুরো তিন দিন সিংহাসন খালি ছিল।
উল্লিখিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সাম্রাজ্যের আমির-ওমরাহ, আলেম-ওলামা এবং উজির-নাজিররা একরকম জোর করে সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের চাচাতো ভাই ফিরোজ শাহ তুঘলককে সিংহাসনে বসান ১৩৫১ সালের ২৩ শে মার্চ। তিনি প্রায় ৩৭ বছর রাজত্ব করেন। কিন্তু আশা আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছার বিপরীতে পাওয়া বিশাল সাম্রাজ্যটিকে তিনি আল্লাহর মাল দরিয়ায় ঢাল এইরূপ মনোভাব নিয়ে পরিচালনা করতে থাকেন। তিনি বাংলা ও উড়িষ্যা ছাড়া অন্য কোনো অঞ্চলে যুদ্ধাভিযান চালাননি। ফলে দিল্লি শাসিত অঞ্চলের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যায়। তিনি যুদ্ধ বিগ্রহে জড়াতেন না। কাউকে ক্ষেপাতেন না। উল্টো আলেম ওলামা সেনাপতি কোতোয়ালদের তোয়াজ তদবির করতেন। তিনি অনেক ভালো ভালো কাজ করেছেন কিন্তু রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি কুশাসন ও অবিচার অনাচারের জন্য সর্বকালের ইতিহাস ভঙ্গ করেছেন। তার আমলে যে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি হতো অমনটি মানবজাতির ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্র কোনো কালে ঘটেনি। কথিত আছে সুলতান নিজে তার কর্মচারীদের কাছ থেকে কাজ আদায়ের জন্য গোপনে ঘুষ দিতেন।
সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের কারণে কেবল দিল্লির সিংহাসন নয় পুরো ভারতবর্ষের রাজনীতি ধ্বংস হয়ে যায়। বাংলার আবু বঙ্গালারা দলে দলে তাদের সাঙ্গোপাঙ্গ মুঞ্জালাদের নিয়ে দিল্লিতে আসর জমাতে থাকেন। এভাবেই ৩৭টি বছর পার হয়। সুলতানের মৃত্যুর পর তার দুর্বল উত্তরাধিকারীরা গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং ১০ বছরের গৃহযুদ্ধে তুঘলকি রাজ্যের প্রজাদের জীবনে যে নরক যন্ত্রণা চলছিল তাতে ঘি ঢেলে দেয়ার জন্য বিশ্ববিখ্যাত বিজেতা তৈমুর লং দিল্লি আক্রমণ করেন এবং দিল্লিকে নরককুণ্ড বানিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিরানভূমিতে পরিণত করেন।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য/সূত্র: নয়া দিগন্ত
ছবি সংগৃহীত
ঢাকা প্রতিনিধি: একটি জাতির বিকাশ ও অগ্রগতিতে সঠিক দিকনির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে ভুল নির্দেশনা একটি জাতির পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পূর্ববাংলার, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের নিরীহ বাঙালি মুসলিম জনগণ দীর্ঘদিন ধরে তাদের দুর্বল নেতৃত্বের কারণে বিভ্রান্তির শিকার হয়ে আসছে। মনে হয়, তারা যেন দুর্ভাগ্যের জন্যই নির্ধারিত, আর তাদের এই কষ্ট থেকে মুক্তির কোনো আশু সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ ইতিহাসজুড়ে, বিশেষ করে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর থেকে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত, একটি বলের মতো টস-মস হয়েছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে "চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত" নামক একটি নীতির দ্বারা তারা সমাজের দরিদ্র কৃষকশ্রেণিতে পরিণত হয়, অথচ পলাশীর যুদ্ধের আগে তারা সমাজের একটি সমৃদ্ধ শ্রেণি ছিল।
ব্রিটিশ শাসকদের ‘বিভাজন ও শাসন’ নীতির ফলে পূর্ববাংলার মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তারা রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ে। হাজী শরীয়তউল্লাহ ও পীর দুধু মিয়া ফারায়েজি আন্দোলনের মাধ্যমে ইসলামের মূল চেতনা দিয়ে মুসলিম সমাজে সংস্কার আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। তিতুমীর হিন্দু জমিদারদের অত্যাচার থেকে মুসলমানদের রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন এবং মুসলমানদের মধ্যে জাতীয় চেতনা ও রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নবাব আবদুল লতিফ ও স্যার সায়েদ আমীর আলী মুসলমানদের মাঝে আধুনিক শিক্ষার প্রসারে কাজ করেন, যেমনটি উত্তর ভারতের জন্য স্যার সায়েদ আহমদ করেছিলেন।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ, ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগের জন্ম এবং ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা মুসলমানদের মধ্যে একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণির জন্ম দেয়। এটি সম্ভব হয়েছিল নবাব আবদুল লতিফ, স্যার সায়েদ আমীর আলী ও নবাব স্যার সলিমুল্লাহর সঠিক দিকনির্দেশনার কারণে। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, খাজা নজিমুদ্দিন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আকরাম খাঁ, এবং আবুল মনসুর আহমদ এই সময়েরই ফল। তারা সবাই মুসলিম বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানে প্রকৃত পথপ্রদর্শক ছিলেন। তারা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান সৃষ্টিকে সমর্থন করেন এবং সফল হন, তবে কলকাতার অভিজাত হিন্দু শ্রেণি ও কংগ্রেস নেতাদের ষড়যন্ত্রে পশ্চিম বাংলা হারিয়ে ফেলেন।
পাকিস্তানের কেন্দ্র সরকার যখন পূর্ব পাকিস্তানে আন্তরিকভাবে কাজ শুরু করে, তখন একটি নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, বুয়েট, ক্যাডেট কলেজ, আদমজী, কর্ণফুলী কাগজ কল, খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি – এইসব উন্নয়ন জনগণের মধ্যে আশা জাগায়। এই সময় জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়নি, কিন্তু ভারত তাদের স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে ভাষা ও সংস্কৃতিকে হাতিয়ার বানিয়ে একটি রাজনৈতিক দল গড়ে তোলে। হতাশ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী মুসলিম লীগ নেতাদের দিয়ে আওয়ামী লীগ তৈরি করা হয়, যা অনেকে মনে করেন শুরু থেকেই ভারত-সমর্থিত দল ছিল। এদের উদ্দেশ্য ছিল সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করা, যেমন ১৯৭২ সালের শুরুতেই জাসদের সৃষ্টি করে শেখ মুজিবের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা হয়।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভুল দিকনির্দেশনার ফলে সেনাবাহিনী ভুল সিদ্ধান্ত নেয় এবং পাকিস্তান ভেঙে যায়। অন্যদিকে শেখ মুজিব, যিনি বাঙালির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বিবেচিত ছিলেন, সেই সংকটময় সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব না দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। চরমপন্থীরা গেরিলা যুদ্ধ সংগঠিত না করে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন এবং গোটা জাতিকে বিভ্রান্তিতে ফেলে দেন।
এই সময় জাতিকে পথ দেখান মেজর জিয়াউর রহমান, যিনি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং জনগণের ডাকে সাড়া দিয়ে জাতীয় নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে রাতারাতি নায়কে পরিণত হন।
ভারত এ সুযোগটি দীর্ঘদিন ধরে খুঁজছিল, এবং বন্ধুত্বের ছদ্মবেশে আওয়ামী লীগ নেতাদের ভুল পথে পরিচালিত করে। বিজয়ের মুহূর্তে ভারত মঞ্চে আসে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয়কে নিজেদের অর্জন হিসেবে ঘোষণা করে। স্বাধীনতার নামে নিরীহ বাঙালি মুসলমান জনগণ ভারতের দাসে পরিণত হয় এবং ভারত তাদের প্রধান কর্তৃত্ব হয়ে ওঠে। শেখ মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নেতা হলেও জাতিকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে ব্যর্থ হন এবং ১৯৭৫ সালের আগস্টে তার পতন ঘটে।
একটি রাজনৈতিক সমঝোতার আগেই আবারও এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী সামরিক নেতার বিভ্রান্তিকর পদক্ষেপে গোটা দেশ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫-এ সৈনিক-জনতা বিপ্লব সেই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটায় এবং জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আরোহনের মধ্য দিয়ে মানুষ নতুন আশা দেখতে শুরু করে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানই একমাত্র নেতা যিনি নিজেকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করে জাতিকে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করেন। তিনি একটি আধুনিক বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং ভারতীয় আধিপত্য থেকে দেশকে রক্ষা করেন, যদিও নিজের জীবন রক্ষা করতে পারেননি।
এরপর জাতি বারবার বিভ্রান্ত হয়েছে নেতাদের আত্মস্বার্থের কারণে। কেবল ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার প্রথম শাসনামল কিছুটা ব্যতিক্রম। তিনি প্রশাসনে ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ করেছিলেন, যদিও আত্মীয়দের অগ্রাধিকার এবং সেনাপ্রধান বাছাইয়ে ভুল সিদ্ধান্ত তার এবং দেশের জন্য ক্ষতিকর ছিল। তবে জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ বা বিভ্রান্তি তিনি সৃষ্টি করেননি। কখনো কখনো কাছের আত্মীয় বা অপরিণত দলের নেতাদের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে জাতিকে ঠকাননি।
বর্তমানে জাতি শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনে পুরোপুরি বিভ্রান্ত। ভারতের হস্তক্ষেপ ও দখলদারিত্বকে তিনি উন্মুক্ত চেক দিয়েছেন। এমনকি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। সদ্য এক সেনাপ্রধান সেনাবাহিনীর ভেতরের অনেক অনিয়মের কথা প্রকাশ করেছেন, যা ফ্যাসিস্ট শাসনামলে ঘটেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি পেশাদার বাহিনীতে পরিণত না করার জন্য দায়ী কারা? শুধু কি রাজনৈতিক নেতারা? সেনাপ্রধানদের ভূমিকা কী? অতীতের সব সেনাপ্রধানদের জাতিকে বিভ্রান্ত করার দায় থেকে অব্যাহতি দেয়া যায় না।
বাস্তবতার নিরিখে বাংলাদেশ এক প্রকার ভারতের অধীনস্ত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল, কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব সেই আধিপত্যের অবসান ঘটায়। তবে বিপ্লবের পরবর্তী রাজনীতি এখনো মানুষকে শঙ্কামুক্ত করতে পারেনি, বরং অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি আরও গভীর হয়েছে। মানুষ আশা করেছিল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আসবে, কিন্তু বাস্তবতা তাদের হতাশ করেছে।
বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে নির্বাচন নিয়ে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতের অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়। লন্ডনে ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের মধ্যে যে সৌহার্দ্যপূর্ণ একান্ত বৈঠক হয়েছে, তা একটি রাজনৈতিক সমঝোতার জন্ম দিয়েছে এবং সম্ভবত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। উভয় নেতা দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরফলে সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে জাতি কিছুটা মুক্তি পেয়েছে।
এটি নিঃসন্দেহে খালেদা জিয়ার পরিপক্ব ও দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলাফল, যিনি আবারও জাতির প্রকৃত অভিভাবক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। আর কেউ যেন জাতিকে আর বিভ্রান্ত না করে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে, যেন জাতি বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত থাকে। আমরা একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ দেখতে চাই, আর রাজনৈতিক নেতাদের উচিত সততার সঙ্গে জাতিকে সঠিক পথে পরিচালনা করা।
ফাইল ছবি
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র কুদস ফোর্সের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমাইল কাআনি বলেছেন, ইরান মনে করে আফগানিস্তানে এমন একটি সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা জরুরি যেখানে সব জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে। সংঘাত ছাড়াই আফগান সংকটের সমাধান খুঁজছে ইরান।
মঙ্গলবার এক টুইট বার্তায় আরও বলেছেন, আমেরিকার এখন পরিকল্পনা হলো গোটা বিশ্বের সুন্নি মুসলমানদের সঙ্গে ইরানের সংঘাত সৃষ্টি। এ লক্ষ্যেই কাজ করে যাচেছ মার্কিন প্রশাসন।
তিনি বলেন, মার্কিন ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আর এমনভাবে কাজ করতে হবে যেখানে ইরানের নিরাপত্তা বিঘ্ন না ঘটে।