a
ছবি সংগৃহীত: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল
বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিশেষজ্ঞ দলের এক প্রতিবেদনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জানিয়েছে, নির্বাচনকালীন সময়ে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সীমাবদ্ধ ছিল। গণগ্রেপ্তারের মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কণ্ঠরোধ করা হয়েছে।
ইইউ’র এমন দাবিকে বিএনপির আরেকটি ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, কোনো হামলা-মামলা আমাদের পুলিশ বাহিনী, পলিটিক্যাল বাহিনী করেনি। তারাই (বিএনপি) করেছে। তারা করে তারাই যদি অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা তরে তাহলে আমরা এ ধরনের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা মনে করি এগুলো সত্যের অপলাপ। উদ্দেশ্যমূলকভাবে আরেকটি ষড়যন্ত্রের একটা নতুন ক্ষেত্র তৈরির প্রচেষ্টা নিচ্ছেন।
শনিবার (৯ মার্চ) দুপুরে পুলিশ মেমোরিয়াল ডে-২০২৪ উপলক্ষে পুলিশ স্টাফ কলেজে আয়োজিত এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনে নিরাপত্তা বাহিনী নিরপেক্ষতার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করেছে। গত নির্বাচনে অনেক মন্ত্রী, বড় বড় নেতা এই নির্বাচনে ধরাশায়ী হয়েছেন। কাজেই আমরা সুনিশ্চিত করে বলতে পারি এই নির্বাচনে কোনো ধরনের কারচুপি হয়নি বা কোনো ধরনের সাপোর্ট কেউ পেয়েছে বলে আমরা মনে করি না, দেখিনি।
তিনি বলেন, ২০১৪ সালেও তারা (বিএনপি) একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি, অগ্নিসন্ত্রাসের মাধ্যমে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করেছিল। তবে ক্রমান্বয়ে তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, তারা যে অপপ্রচার চালাচ্ছে তার কোনো ভিত্তি নেই। তবে তারা নির্বাচনের পরে মনগড়া তথ্য প্রচার করে বিদেশিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। অথচ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসা বিদেশি সাংবাদিকরা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বলেছেন যে, বাংলাদেশের নির্বাচনের সুষ্ঠু হয়েছে। আমেরিকারও দুই একটি সংগঠন বলেছে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। সূত্র: ইত্তেফাক
ছবি সংগৃহীত: জো বাইডেন ও ভ্লাদিমির পুতিন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার ক্ষমতা গ্রহণের শতদিন পূর্তির প্রাক্কালে, বার্ধক্যজনিত শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতাকে পাত্তা না দিয়েই তিনটি লাগসই পদক্ষেপ নেন। কারণ, বিশ্বে এখন ‘আমেরিকা ফার্স্ব’ নয়, ‘আমেরিকা ইজ ব্যাক’। কোভিডের ছত্রছায়ায়, ‘দি গ্রেট-রিসেট’ তথা ‘আমাদের গণতন্ত্র’কে বহাল করার একমাত্র আন্তর্জাতিক বাধা অথবা কানাগলি তৈরি করে রেখেছে ‘চীন-রাশিয়া-ইরান’ মৈত্রীবন্ধন।
উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের ফ্রিডম অব্যাহত রাখার তাগিদে তাই ১২ মার্চ স্বয়ং বাইডেন ‘কোয়াড’-এর বাকি তিন শরিক জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সঙ্গে ভার্চুয়াল সামিট করেন। ‘কোয়াডে’র চার দেশের রাষ্ট্রীয় প্রধানরা প্রতিশ্রুতি দেন যে, ইন্দো-প্যাসিফিকের দেশগুলোকে ২০২২ সালের শেষের দিকে এক বিলিয়ন ডোজ কোভিড টিকা সরবরাহ করা হবে; টিকা তৈরি হবে ভারতে, অর্থায়নের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের, বিতরণে থাকবে অস্ট্রেলিয়া। এটি একটি খুশির খবর হতে পারে; কিন্তু অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে—‘কোভিড’কে টেনে লম্বা করে ২০২২ সালের শেষ পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখা কেন! বিশেষ করে যখন দিনকে দিন ইউরোপসহ সর্বত্র স্পুতনিক-ভি ও সিনোফার্মের টিকার ডিমান্ড বাড়ছে! ‘কোয়াড’ থেকে কি বহু জল্পনাকল্পনার ‘এশিয়া ন্যাটো’র আবির্ভাব হবে! দেখা যাক। তবে ‘কোয়াডে’র শরিক ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির উচ্ছ্বসিত মন্তব্য যে, কোয়াড হবে গ্লোবাল-সাউথের (উন্নয়নশীল দেশসমূহ) শক্তি বাহিনী!
কথা প্রসঙ্গে বলছি যে, ভারতের রুশ এস-৪০০ কেনার বিষয়টি সিনেট ফরেন পলিসি কমিটি এখন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে এবং কিনলে ‘স্যাংকশনে’র ভীতি দেখানো হয়েছে; দিন কয় পূর্বে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী লয়েড অস্টিন নয়া দিল্লিতে বলেছেনও। কৃষক আন্দোলনের বিষয়টি নিয়েও ওয়াশিংটনে বিষমভাবে কুমিরের কান্নাকাটি চলছে; কিন্তু যদিও তা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ‘কোয়াড’ থেকে ‘এশিয়া ন্যাটো’ নয়—গ্লোবাল সাউথ বরং ভারতের স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি সংরক্ষণের প্রত্যাশায় রয়েছে।
পুতিনের প্রসঙ্গ এবার। তবে তার আগে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের প্রফেশনাল ’সিভি’তে দ্রুত চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। বাইডেনের রাজনৈতিক কেরিয়ারের বয়স মোটামুটি অর্ধশতাব্দী। কাজেই, বয়সে ও রাজনীতিতে জো ‘ঝানু’ ব্যক্তি। দীর্ঘ অনেক বছর ছিলেন সিনেটর হিসেবে, তারপরে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভিপি ছিলেন আট বছর ধরে, মাধ্যখানে চার বছর ফাঁকা গেছে; বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট তিনি। কর্মজীবনে সিনেট বৈদেশিক বিষয়ক কমিটির জ্যেষ্ঠ সিনেটর হিসেবে ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণে কংগ্রেসের অনুমতি আদায়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।
ইরাক আক্রমণ, সাদ্দাম হোসেনের উচ্ছেদ ইত্যাদির অজুহাত ছিল গণবিধ্বংসী অস্ত্র এবং ছিল তো নির্জলা মিথ্যা বানোয়াট নৃশংস ‘ফেয়ারিটেল’। এই অন্যায় আক্রমণে কম করে এক মিলিয়ন মানুষ মারা যায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে ও আশপাশের অন্যত্র সন্ত্রাসবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কিংবা প্রেসিডেন্ট ওবামার ভিপি থাকাকালে, প্রেসিডেন্টের ‘ওভারসিজ কনটিনজেন্সি অপারেশনস’ এবং ৮০টি দেশের ওপর রাতের অন্ধকারে নাইট ড্রোন হামলা চালানোর অংশীদার তিনি। লিবিয়া ও লিবিয়ার গাদ্দাফির নৃশংস পরিণতি, যুগোস্লাভ ফেডারেশনের আকাশ থেকে বিরামহীন ৭৮ দিনরাত্রি বোমাবর্ষণ ইত্যাদিও রয়েছে।
কিছুদিন আগে, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে প্রেসিডেন্ট বাইডেন সিরিয়ায় বোমাবর্ষণের হুকুম দেন। কিছু লোক মারা যায়। ১৭ মার্চ ‘ডিক্লাসিফাই’কৃত একটি মার্কিন ‘ইনটেল’ প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, প্রেসিডেন্ট পুতিন ২০২০ সালের মার্কিন নির্বাচনের সময় ডেমোক্রেটিক প্রার্থী বাইডেনের বিরুদ্ধে ‘প্রভাব/ইনফ্লুয়েন্স অপারেশন’ পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে এই একই তারিখে প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেন ‘এবিসি নিউজে’ তার প্রথম সাংবাদিক সাক্ষাত্কার দেন।
এই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে সাংবাদিক জর্জ স্টেফানোপউলস প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে প্রশ্ন করেন, ‘নির্বাচনের সময় ভ্লাদিমির পুতিন আপনার মানহানি করেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সমর্থন করেছেন, আমাদের নির্বাচনের ভিত্তিকে দুর্বল করেছেন, আমাদের সমাজকে বিভক্ত করেছেন। কী মূল্য তাকে দিতে হবে?’ বাইডেন বলেন, মূল্য তাকে দিতে হবে। ... তার সঙ্গে ফোনে দীর্ঘ কথোপকথন হয়েছে; বলেছি, ‘আমি আপনাকে জানি, আপনিও আমাকে জানেন। যদি প্রমাণিত হয় তো ফলভোগের জন্য প্রস্তুত থাকুন।’ ... স্টেফানোপউলস বলেন, ‘আপনি বলছিলেন যে, উনি হূদয়শূন্য ব্যক্তি!’ বাইডেন বলেন, ‘ও হ্যাঁ, আমি তাকে বলেছি বটে, তার উত্তর ছিল যে—আমরা একে অপরকে বুঝতে পারছি, ....বলেছি, আপনার চোখের ভেতরে তাকালাম কিন্তু আমার মনে হয় না যে আপনার হূদয় বলে কিছু আছে।’ স্টেফানোপউলস বলেন, ‘অতএব, ভ্লাদিমির পুতিনকে আপনি চেনেন।’...এক অর্থে, এটিকে ঐতিহাসিক ইন্টারভিউ বলা চলে, মার্কিন-রুশ সম্পর্কের ‘ওয়াটারশেড-মুহূর্ত’ বা ‘আজ...দুজনার দুটি পথ গেছে বেঁকে-মুহূর্ত’। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘এলিট’দের অনেকেরই কূটনৈতিক কম্পিটেন্স বা যোগ্যতা, ঔচিত্যবোধ, শিষ্টতার অভাব নতুন কিছু নয়। যেমন, বছর দুই আগে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ‘ঠগ’ বলতে আটকায়নি। বা ভেনিজুয়েলার মাদুরো’কে অবলীলায় ‘সন্ত্রাসী’র লেবেল দেওয়া হয়।
প্রশ্ন হলো—মস্কো এখন কী করবে? রাশিয়ার উত্তর ছিল তাত্ক্ষণিক এবং সুস্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূতকে শলাপরামর্শের জন্য মস্কোতে ডেকে পাঠানো হয়। এটি একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ। সুস্পষ্ট ইঙ্গিত যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে রাশিয়া পুনর্বিবেচনা করতে চায়। বাইডেনের অপমানের জবাব দিতে পুতিন রুশ টেলিভিশনে আসেন, ধীরস্থির শান্ত গলায় বলেন যে, বাইডেন স্টেটমেন্টে যা বলেছেন, আমরা পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত। অতঃপর, বাইডেনকে তিনি সুস্বাস্থ্য কামনা করেন এবং বলেন যে, ঠাট্টা নয়, তিনি বাস্তবিকই তার সুস্বাস্থ্য কামনা করছেন। অবশ্য পুতিন প্রচলিত বচন বা লোককথা ব্যবহার করেন, বলেন যে, ‘যে যেমন, সে ভাবে যে অন্যলোকেও ঠিক তারই মতো; বা ‘অন্য লোকের সম্বন্ধে যা-ই বলো না কেন তুমি আসলে তা-ই’।
প্রেসিডেন্ট পুতিনের মতে, ইউরোপিয়ানরা যখন সামরিক শক্তি নিয়ে (আমেরিকা) মহাদেশ বিজয়ে মত্ত, সেই সময়ে আমেরিকান প্রশাসনিক শ্রেণি সংগঠিত হতে থাকে। পুতিন জাপানের বিরুদ্ধে দুটো পারমাণবিক বোমা ফেলা এবং কালো মানুষ নিয়ে দাসপ্রথা চালুর ইতিহাস ইত্যাদি—সবই অন্যায়-অবিচারভিত্তিক যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নিপীড়নের ইতিহাস। বাইডেনের বক্তব্যের জবাব হিসেবে পুতিন একটি চমকপ্রদ প্রস্তাব করেন। অনুবাদ করলে দাঁড়ায়: এসো আমরা ‘ভারবাল শুটআউটে’ নামি। লাইভ চ্যাট কাম ডুয়েল; বিষয়বস্তু: প্যান্ডেমিক, আঞ্চলিক কনফ্লিক্ট রিজোলিয়োশন এবং স্ট্র্যাটেজিক স্থিততা/স্ট্যাবিলিটি। অডিয়েন্স: মার্কিন ও রুশ পাবলিক; শর্ত: স্বতঃস্ফূর্ত, লিখিত স্ক্রিপ্ট ব্যবহার অবৈধ। পুতিনের সময় বাইডেনের ফুল প্রোগ্রাম, সময় কবে হবে, অনিশ্চিত। অর্থাত্, ‘টাফ টকিং আমেরিকান ওয়েস্টার্ন’-এর ছোঁয়া মেশানো কোনো ঐতিহাসিক শোউডাউন হবে না, হচ্ছে না!
তবে উভয়ের ক্ষেত্রেই অনেকের মনে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার লাইন ঘুরতে পারে—‘ওরে ভাই, কার নিন্দা করো তুমি। মাথা করো নত। / এ আমার এ তোমার পাপ।’ সূত্র:ইত্তেফাক
ছবি সংগৃহীত
ময়মনসিংহ ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এ আদালতে বিচারাধীন মামলা ছিল ৩৭ হাজারের বেশি। প্রায় একই চিত্র শেরপুর ও যশোর ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালেরও। এ দুই আদালতে ১৮ হাজার ও ১২ হাজার মামলা সামলাচ্ছেন দুজন বিচারক। শুধু এ তিন আদালতই নয়, দেশের সব আদালতের বিচারকের কাঁধেই রয়েছে সক্ষমতার চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি মামলা। সম্প্রতি প্রাপ্ত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গড়ে বিচারকপ্রতি বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩০০-এর বেশি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ লাখে। এর মধ্যে অধস্তন আদালতগুলোয় ৩৭ লাখ ৩০ হাজার। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন মামলা ছিল প্রায় ৬ লাখ। ২০১২ সালে বিচারাধীন মামলা ছিল ২১ লাখ ৩৫ হাজার। এক যুগের ব্যবধানে বিচার বিভাগে মামলার জট বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।
আইনজ্ঞরা বলছেন, বিচারকস্বল্পতা ও এজলাস সংকট মামলাজটের বড় দুটি কারণ। পাশাপাশি আইনের ত্রুটি, সাক্ষী হাজির করতে না পারাও জট বৃদ্ধি করে। এসব সমস্যা দ্রুত দূর করতে পারলেই কমবে মামলাজট। তাঁরা বলেন, ‘আমাদের দেশে বিচারকরা নিজেদের সক্ষমতার চেয়ে চার-পাঁচ গুণ বেশি মামলার চাপ সামলাচ্ছেন। সিভিল রুলস অ্যান্ড অর্ডার অনুযায়ী, একজন বিচারকের কাছে সর্বোচ্চ ৫০০ মামলা থাকার কথা। এর চেয়ে বেশি মামলা থাকলেই ন্যায়বিচার না পাওয়ার শঙ্কা থাকবে। তাই যে কোনোভাবে বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।’
আইনজ্ঞরা আরও বলেন, বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারপ্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কোনো কোনো মামলা নিষ্পত্তির জন্য তাদের যুগের পর যুগ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বিচার বিলম্বের কারণে একদিকে মামলা পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে ভোগান্তি। কোনো মামলায় সাক্ষী মারা যাচ্ছে, কোনো মামলায় বাদীও মারা যাচ্ছে। মামলাজটের সমস্যাটা বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও জট কমিয়ে আনার বিষয়ে সুপারিশ করে গত বছর আগস্টে আইন কমিশনও একটি প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
মামলাজটের বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সরকার মামলাজট কমানোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে তা কমানোর জন্য নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিছু কার্যকর পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। বিচারে গতি আনতে প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এজলাস সংকট নিরসনে এরই মধ্যে সব জেলায় নতুন আদালত ভবন করা হয়েছে। আশা করছি, আমাদের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর সুফল খুব শিগগিরই পাওয়া যাবে।’
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ আদালত থেকে নিম্ন আদালত পর্যন্ত সর্বত্র মামলাজট বেড়েই চলেছে। বিচারকের সংখ্যা বাড়িয়েও কোনো লাভ হয়নি। কারণ বিচারকের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মামলা দায়েরের সংখ্যা। ২০০৮ সালে আপিল বিভাগে বিচারপতি ছিলেন সাতজন। বিচারাধীন মামলা ছিল ৬ হাজার ৮৯২টি। এরপর আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা আর কোনো দিন সাতের নিচে নামেনি। বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারপতি আটজন। আর গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচারাধীন মামলা ছিল ২৬ হাজার ৫১৭টি। একইভাবে সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগেও ২০০৮ সালে বিচারাধীন মামলা ছিল ২ লাখ ৯৩ হাজার ৯০১টি। ওই সময়ে হাই কোর্টে বিচারপতি ছিলেন ৬৭ জন। ২০১০ সালের পর এ বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা কখনো ৯০-এর নিচে নামেনি। কিন্তু মামলাজট ঊর্ধ্বমুখী। বর্তমানে হাই কোর্ট বিভাগে ৮৪ জন বিচারপতি দায়িত্বরত রয়েছেন। আর এ বিভাগে বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৮৪৭টি।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০০৭ সালের নভেম্বরে বিচার বিভাগ পৃথক্করণের সময় অধস্তন আদালতগুলোয় বিচারক ছিলেন ৩০১ জন। বিপরীতে বিচারাধীন মামলা ছিল প্রায় ১৩ লাখ। বর্তমানে ২ হাজারের বেশি বিচারকের মধ্যে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন। আর অধস্তন আদালতগুলোয় বিচারাধীন মামলা ৩৭ লাখ ২৯ হাজার ২৩৫টি। এসব তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে একজন বিচারকের বিপরীতে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মামলা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক আদালতের পরিস্থিতি আরও খারাপ। কিছু কিছু আদালতে একজন বিচারকের আওতায় ৫ থেকে ১০ হাজারের বেশি মামলা রয়েছে। আবার একজন বিচারককে একাধিক আদালতেরও দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে বিচারকদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে মামলার চাপ সামাল দিতে। আর এ কারণে অনেক মামলার শুনানির তারিখ ধার্য হচ্ছে ছয় থেকে আট মাস পরপর। আবার অনেক সময় ধার্য তারিখে শুনানি না করেই তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর এভাবেই বেড়ে যাচ্ছে দীর্ঘসূত্রতা।
বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, জনসংখ্যা অনুপাতে বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বিচারকের সংখ্যা কম। ১৭ কোটি ৩৮ লাখ জনসংখ্যার দেশে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন ১ হাজার ৮০০ বিচারক। অর্থাৎ গড়ে ৯৬ হাজার মানুষের বিপরীতে একজন বিচারক দায়িত্ব পালন করেন। যেখানে ভারতে আনুমানিক ৪৭ হাজার ৬১৯ জনের বিপরীতে একজন, পাকিস্তানে ৫০ হাজার, অস্ট্রেলিয়ায় ২৪ হাজার ৩০০, যুক্তরাষ্ট্রে ১০ হাজার এবং যুক্তরাজ্যে প্রতি ৩ হাজার ১৮৬ নাগরিকের বিপরীতে একজন বিচারক দায়িত্ব পালন করেন।
গত ১ মার্চ এক অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, ‘যে পরিমাণ বিচারক সারা বাংলাদেশে থাকা দরকার সে পরিমাণ বিচারক নেই। দেশে ৯০ থেকে ৯৫ হাজার মানুষের জন্য একজন বিচারক। এত কম বিচারক দিয়ে মামলাজট কমানো সম্ভব নয়। এ সংখ্যাটা বাড়াতে হবে। লজিস্টিক সাপোর্টসহ অন্যান্য সুযোগসুবিধা বাড়াতে হবে।’
জট কমবে যেভাবে: মামলাজট নিরসনের উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে নিজের বিচারিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মূলত দুটি কারণে মামলাজট বাড়ে। একটি হচ্ছে অবকাঠামো সমস্যা আর অন্যটি আইনগত জটিলতা।’ তিনি বলেন, ‘অবকাঠামোগত সমস্যার মধ্যে এজলাস ও বিচারক সংকট অন্যতম।’ বিচারক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে বছরে প্রায় ১০০ জন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। তবে এ সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বিবেচনায় দু-তিন বছরের মধ্যে অন্তত ৫ হাজার বিচারক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। আইন কমিশনও এমন সুপারিশই দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জট কমাতে হলে ছোটখাটো সমস্যাগুলো আদালতের বাইরেই সমাধান করতে হবে। ফৌজদারি আইনেও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা আছে। একই সঙ্গে তদন্তের সময় কমানো, বিচারক ও সংশ্লিষ্টদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।’ এ ছাড়া নতুন কোনো থানা বা উপজেলা করা হলে ইউএনও, এসি ল্যান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থানা বা উপজেলার জন্য একজন বিচারকের পদ সৃষ্টি করতে হবে বলেও মত দেন এই বিচারক।
মামলাজট নিরসনে আইনগত জটিলতা দূর করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিচারকাজে কিছু সময় ক্ষেপণের সুযোগ আমাদের আইনেই রয়েছে। এগুলো আগে দূর করতে হবে। যেমন নোটিস বা সমন জারিতে অনেক সময় চলে যায়। প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে নোটিস বা সমন জারি করা যেতে পারে। এতে সময় অনেকটা বাঁচবে। এ ছাড়া জবাব দাখিলে সময়সীমা নির্ধারণ করার পাশাপাশি বাদী বা বিবাদী পক্ষের বারবার সময় আবেদন নিরুৎসাহ করতে হবে।’ সাক্ষ্য আইন সংশোধন করে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার ও ভিডিও কনফারেন্সে সাক্ষ্য গ্রহণের বিধান যুক্ত করার প্রশংসাও করেন তিনি। এই বিচারক বলেন, ‘নতুন সাক্ষ্য আইন বিচারের সময় কমিয়ে আনতে সহায়ক হবে। তবে এর যথাযথ অনুসরণ করতে হবে।’
আইন কমিশনের সুপারিশ: মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও জট কমিয়ে আনার বিষয়ে সুপারিশ করে গত বছর আগস্টে আইন কমিশন একটি প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে জটের মূল পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হয়। সেগুলো হচ্ছে: পর্যাপ্ত বিচারক না থাকা, বিশেষায়িত আদালতে পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ না হওয়া, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা, জনবলের অভাব এবং দুর্বল অবকাঠামো।
অন্য কারণগুলো হলো: মামলার সুষম বণ্টন না হওয়া, প্রশাসনিক শৈথিল্য, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না হওয়া, কর্মকর্তা-কর্মচারীর জবাবদিহির অভাব, আইনজীবীর আন্তরিকতার অভাব, দুর্বল মামলা ব্যবস্থাপনা, জমিজমা-সংক্রান্ত নথি সংরক্ষণের অভাব, প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় মামলা নিষ্পত্তিতে ব্যবহারিক জটিলতা, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, ক্রমাগত শুনানির অভাব, যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব, নকল সরবরাহে অনিয়ম, উচ্চ আদালত কর্তৃক নথি তলব, সংশ্লিষ্ট মামলার আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিভিশন, মোকদ্দমা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ইত্যাদি।
মিথ্যা-হয়রানিমূলক মামলা কমাতে কয়েকটি সুপারিশও করে আইন কমিশন। এরমধ্যে আছে: মামলা দায়েরের সময় মিথ্যা, ফলহীন ও হয়রানিমূলক মামলা করার বিষয়টি নিরুৎসাহ করতে হবে। নালিশি মামলা গ্রহণের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর (ফরিয়াদি) অভিযোগ যাচাইয়ের মাধ্যমে মামলার রক্ষণীয়তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে মিথ্যা মামলা হলে বাদীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনের ২১১ ধারার আওতায় মামলা করার বাধ্যবাধকতা আনতে হবে এবং দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এতে মিথ্যা মামলা দায়েরের প্রবণতা কমবে এবং মামলার সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন পর্যায়ে পদ সৃষ্টি করে কমপক্ষে ৫ হাজার বিচারক নিয়োগ করা হলে জট কমিয়ে মামলার সংখ্যা সহনীয় পর্যায়ে আনা সম্ভব হবে। তবে রাষ্ট্রের সীমিত সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্বল্প সময়ে এত বিচারক নিয়োগ করা সম্ভব নয়। আবার একসঙ্গে এত বিচারক নিয়োগ করলে তাদের গুণগত মানেরও অবনতি ঘটতে পারে। তবে ধারাবাহিকভাবে প্রতি বছর কমপক্ষে ৫০০ বিচারক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে মত দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজিটাল বাংলাদেশে আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে মামলাজট নিরসনে কার্যকর ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারলে বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়ে যাবে। আইন কমিশন মনে করে, মামলাজট নিরসনের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে এক বা একাধিক সমস্যা ও তার প্রতিকারের প্রতি নজর না দিয়ে সামগ্রিকভাবে গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যাবশ্যক। সূত্র: বিডি প্রতিদিন
লেখক: আরাফাত মুন্না, বাংলাদেশ প্রতিদিন