a
ফাইল ছবি
বিপুলসংখ্যক মৃত্যুর জন্য তুরস্ক সরকার ভূমিকম্পের তীব্রতাকে দায়ী করলেও তুরস্কের সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা ভবন নির্মাণে অনিয়মকেই এর জন্য দায়ী করছেন।
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের একটি বহুতল ভবন ধসে ২১ জনের মৃত্যু হয়। তদন্তে দেখা যায়, আটতলা ভবনের ওপরের তিনটি তলা নির্মাণ করা হয়েছিল অবৈধভাবে। কিন্তু ভবনটির মালিকপক্ষ স্রেফ কিছু অর্থ জরিমানা দিয়ে ভবনটি বৈধ করে নিয়েছিল।
তুরস্কের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ একটি দেশে ভবন নির্মাণের সময় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নীতিমালা না মানার পরও জরিমানা দিয়ে ‘ক্ষমা’ পাওয়ার এ সুযোগ বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা। ২০১৯ সালের ভবন ধসের পর চেম্বার অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্সের চেয়ারম্যান সেমাল গোকচে বলেছিলেন, এর অর্থ হলো আমাদের শহরগুলো, বিশেষত ইস্তাম্বুলকে কবরস্থানে পরিণত করা এবং আমাদের ঘরগুলো থেকে কফিন বের করার পরিস্থিতি তৈরি করা।’ (টার্কিশ সিটিজ কুড বিকাম ‘গ্রেভইয়ার্ডস’ উইথ বিল্ডিং অ্যামনেস্টি, ইঞ্জিনিয়ার্স সে, রয়টার্স, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)
চার বছর যেতে না যেতেই তুরস্কের প্রকৌশলীদের সেই আশঙ্কা সঠিক প্রমাণিত হলো। ৬ ফেব্রুয়ারি ভয়াবহ ভূমিকম্পে হাজার হাজার ভবন ধসে সিরিয়া ও তুরস্কের এক বিশাল অঞ্চল আক্ষরিক অর্থেই কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ২৪ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে তুরস্কের অধিবাসী প্রায় সাড়ে ২০ হাজার।
এই বিপুলসংখ্যক মৃত্যুর জন্য তুরস্ক সরকার ভূমিকম্পের তীব্রতাকে দায়ী করলেও তুরস্কের সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা ভবন নির্মাণে অনিয়মকেই এর জন্য দায়ী করছেন। ইস্তাম্বুলের বোগাজিচি ইউনিভার্সিটির কান্দিলি অবজার্ভেটরি অ্যান্ড আর্থকোয়েক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুস্তাফা এরদিক আল-জাজিরাকে বলেছেন, ‘ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা এত বেশি হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো যথাযথ মান বজায় রেখে ভবন নির্মাণ না করা।’
তুরস্কের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের উচিত হবে অবিলম্বে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের দুর্বল অবকাঠামোর ভবন চিহ্নিত করে সেগুলোর সংস্কারের কর্মসূচি হাতে নেওয়া, নতুন ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড মানা হচ্ছে কি না, তার তদারকি নিশ্চিত করা, ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতা ও চিকিৎসার সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি ও তার নিয়মিত ড্রিল করা, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানিসহ পরিষেবাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ভূমিকম্পসহনীয় করা।
অথচ আনাতোলিয়ান ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত হওয়ায় তুরস্ক মারাত্মক ভূমিকম্পপ্রবণ একটি অঞ্চল। এর আগে ১৯৯৯ সালে দেশটির উত্তর-পশ্চিমে ইজমিত অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ১৭ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। বিভিন্ন সময় ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির শিকার তুরস্কে ভবন নির্মাণে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়, যার সর্বশেষ সংস্করণটি করা হয় ২০১৮ সালে। কিন্তু এসব আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং সময়-সময় জরিমানার বিনিময়ে ক্ষমার ব্যবস্থা থাকায় তুরস্কের পুরোনো ভবনগুলোকে যেমন ভূমিকম্পসহনীয় করা হয়নি, তেমনই নতুন নির্মিত অনেক ভবনও ভূমিকম্পপ্রতিরোধী করে নির্মিত হয়নি।
বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু পুরোনো ভবনই নয়, এমনকি সদ্য নির্মিত অনেক ভবনও ভূমিকম্পে ধসে গেছে, যা এসব ভবন নির্মাণে অনিয়মকেই নির্দেশ করে। তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় প্রায় ৭৫ হাজার ভবন ওই ক্ষমার আওতায় এসেছিল। (টার্কি আর্থকোয়েক: হোয়াই ডিড সো মেনি বিল্ডিংস কলাপস?, বিবিসি, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩)
তুরস্কের ক্ষমতাসীন এরদোয়ান সরকার বরাবরের মতো ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে জরিমানার বিনিময়ে বিল্ডিং কোড ভঙ্গ করে নির্মাণ করা ভবনের বৈধতা দেওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। সে সময় জরিমানার বিনিময়ে ক্ষমার জন্য ১ কোটি আবেদন জমা পড়ে, যার মধ্যে থেকে ১৮ লাখ আবেদন মঞ্জুর করা হয়। ভবন নির্মাণে অনিয়মকে এভাবে ক্ষমা করে ২০১৯ সাল নাগাদ তুরস্ক সরকারের আয় হয় ৩১০ কোটি ডলার। (টার্কিশ সিটিজ কুড বিকাম ‘গ্রেভইয়ার্ডস’ উইথ বিল্ডিং অ্যামনেস্টি, ইঞ্জিনিয়ার্স সে, রয়টার্স, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)
তুরস্কে ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও ভূমিকম্পে বিপুল হতাহতের এ ঘটনা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। তুরস্ক-সিরিয়ার মতো বাংলাদেশও ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা, সিলেট সীমান্তে সক্রিয় ডাউকি ফল্টের অবস্থান ও টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টের অবস্থান এবং উত্তর-পূর্বে সীমান্তসংলগ্ন ইন্ডিয়ান প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল হওয়ায় বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ১৮৭০ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত বড় আকারের বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প হয়েছে এ অঞ্চলে। পরবর্তী সময়ে ছোট ছোট কিছু ভূমিকম্প হলেও বড় মাত্রার কোনো ভূমিকম্প হয়নি।
তবে গত ১০০ বছরে বড় কোনো ভূমিকম্প না হওয়ায় ছোট কম্পনগুলো শক্তি সঞ্চয় করে সামনে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা তৈরি করছে বলে মনে করছেন ভূতত্ত্ববিদেরা। বাংলাদেশে তুরস্কের মতো শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে বিশেষত রাজধানী ঢাকাসহ ঘনবসতিপূর্ণ শহরের ভবনগুলোর কত শতাংশ টিকে থাকবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বাংলাদেশে ইমারত নির্মাণ আইন ও বিধিমালা থাকলেও ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে মেনে না চলার অভিযোগ বহুদিনের। আর আইন মেনে চলতে বাধ্য করবার ব্যাপারে নগরকর্তৃপক্ষের গাফিলতিও সুবিদিত,তারা মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও নিয়মিত তদারকির অভাবে পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সূত্র ধরে বণিক বার্তা জানাচ্ছে, দেশের শহরাঞ্চলের নির্মাণ করা ও নির্মাণাধীন ৬০ শতাংশ ভবনই তৈরি হচ্ছে বা হয়েছে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে।
এর মধ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এর আওতাধীন ভবনের ৬৫.০৩ শতাংশ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন ২৮.৫৭ শতাংশ, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ৫৩.৬৯ শতাংশ, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ৬৭.৯৬ শতাংশ, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ২৫.৩৭ শতাংশ এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন ভবনের ২৪.৫৩ শতাংশ ভবন নানা ধরণের নিয়ম ভঙ্গ করে তৈরী।
ভবন নির্মাণে অনিয়মের মধ্যে রয়েছে অনুমোদিত উচ্চতার বেশি উঁচু ভবন নির্মাণ, নকশার বাইরে গিয়ে ভবন সম্প্রসারণ, আবাসিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ, ভবনের চারপাশে প্রয়োজনীয় খোলা জায়গা না রাখা, যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না রাখা ইত্যাদি। (শহরাঞ্চলের ৬০% ভবন নির্মাণে নিয়মের ব্যত্যয়, ২০ জানুয়ারি ২০২২, বণিক বার্তা) এভাবে অনিয়মের মাধ্যমে নির্মিত ভবনগুলো ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারাত্বক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) কর্তৃক ২০০৯ সালে তৈরি একটি রিপোর্ট অনুসারে, শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৮৩ শতাংশ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৯২ শতাংশ এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসব নগরে পুরোপুরি ভেঙে পড়া ভবনের সংখ্যা হবে যথাক্রমে ২ লাখ ৩৮ হাজার, ১ লাখ ৪২ হাজার এবং ৫০ হাজার। ঢাকায় ৭৪৮টি পানির পাম্প, ৭টি গ্যাস কম্প্রেসর স্টেশন এবং ৫৪ হাজার বৈদ্যুতিক স্থাপনা, চট্টগ্রামে ৭২টি পানির পাম্প, ২২টি গ্যাস কম্প্রেসর স্টেশন এবং ২৮ হাজার বৈদ্যুতিক স্থাপনা ও সিলেটে ১৮টি পানির পাম্প, ১টি গ্যাস কম্প্রেসর স্টেশন এবং ৯ হাজার বৈদ্যুতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ঢাকায় পানির পাইপে ১ হাজার ১৬টি ও গ্যাস পাইপে ৬৮৪টি স্থানে, চট্টগ্রামে পানির পাইপে ৭২৭টি ও গ্যাস পাইপে ২২৯টি স্থানে এবং সিলেটে পানির পাইপে ১২২টি ও গ্যাস পাইপে ৯৭টি স্থানে লিকেজ বা ছিদ্র তৈরি হবে। এ ছাড়া ঢাকায় ১০৭টি, চট্টগ্রামে ৩৬টি এবং সিলেটে ১৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটবে। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের সিট পাওয়া যাবে ঢাকায় মোট সিটের ১২ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৪ শতাংশ এবং সিলেটে ১ শতাংশেরও কম। রাত দুইটায় ভূমিকম্প হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে মৃতের সংখ্যা হবে যথাক্রমে ২ লাখ ৬০ হাজার, ৯৫ হাজার ও ২০ হাজার।
আর বেলা দুইটায় ভূমিকম্প হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে মৃতের সংখ্যা হবে যথাক্রমে ১ লাখ ৮৩ হাজার, ৭৩ হাজার ও ১৪ হাজার। (সূত্র: আর্থকোয়েক রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট অব ঢাকা, চিটাগং অ্যান্ড সিলেট সিটি করপোরেশন এরিয়া, কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম, ২০০৯, পৃষ্ঠা xi- xiii)
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির এই রিপোর্ট তৈরির পর এক যুগেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, এ সময়ে নিয়ম না মেনে তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা আরও বেড়েছে। কিন্তু ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমানো বা উদ্ধার তৎপরতার প্রস্তুতির কোনো অগ্রগতি নেই। পুরোনো ভবনগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করার কোনো উদ্যোগ নেই, নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে যথাযথ নকশা মানা হচ্ছে কি না এবং রড, সিমেন্ট, বালুর যথাযথ ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা-ও দেখার কেউ নেই।
এ অবস্থায় ঢাকায় সাতের বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন তো ধ্বংস হবেই, সেই সঙ্গে নিয়ম না মেনে ও জলাশয় ভরাট করে তৈরি নতুন ভবনও ধসে পড়বে। রানা প্লাজা ধস-পরবর্তী অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে ভূমিকম্পে বিপুল ধ্বংসযজ্ঞ হলে আমাদের উদ্ধার তৎপরতার সামর্থ্য কত সীমিত। এ অবস্থায় ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষকে উদ্ধার, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, ভূমিকম্প-পরবর্তী পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলা নিয়ে কেমন অসহনীয় একটা পরিস্থিতি হবে, তা অনুমান করাও কঠিন।
ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি রাজনৈতিক। ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা যায় না, কিন্তু যথাযথ প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমে ভূমিকম্পে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়।
তুরস্কের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের উচিত হবে অবিলম্বে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের দুর্বল অবকাঠামোর ভবন চিহ্নিত করে সেগুলোর সংস্কারের কর্মসূচি হাতে নেওয়া, নতুন ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড মানা হচ্ছে কি না, তার তদারকি নিশ্চিত করা, ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতা ও চিকিৎসার সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি ও তার নিয়মিত ড্রিল করা, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানিসহ পরিষেবাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ভূমিকম্পসহনীয় করা।
দুর্বল অবকাঠামোর ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি অনেক বেশি, বড় আকারের ভূমিকম্প নিয়মিত হয় না বলে ভূমিকম্প মোকাবিলার প্রস্তুতিতে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। সূত্র: প্রথম আলো
লেখক: কল্লোল মোস্তফা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবেশ ও উন্নয়ন অর্থনীতিবিষয়ক লেখক। ই-মেইল: kallol_mustafa@yahoo.com
ছবি সংগৃহীত
নিউজ ডেস্ক: সমাজে যে কোনো ধরনের নেতৃত্বের জন্য প্রজ্ঞাই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাতিকে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করতে রাজনৈতিক নেতাদের অবশ্যই প্রজ্ঞার গুণাবলী থাকতে হবে। প্রজ্ঞাবিহীন রাজনৈতিক নেতা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না; বরং জনগণের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করে। একটি সমাজ কেবল তখনই সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে যখন তা সুশাসিত ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্ব দ্বারা পরিচালিত হয়।
ইতিহাসে এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে যেখানে একজন গতিশীল নেতার নেতৃত্বে একটি দেশ দ্রুত উন্নতি লাভ করেছে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বর্তমান বিশ্বে তুরস্কের এরদোয়ান আরেকজন প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর উন্নয়নে নেতার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এখানে অনেক মুসলিম নেতা তাদের প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের মাধ্যমে জনগণের কল্যাণে কাজ করেছেন। ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং প্রজ্ঞাবান নেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন। মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার এক উজ্জ্বল প্রমাণ।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সর্বাধিক সফল রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যিনি ভারতের মুসলিমদের জন্য একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। পাকিস্তানের জন্ম তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার ফলেই সম্ভব হয়েছিল।
বাঙলার আরেক রাজনৈতিক মেধাবী ছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, যিনি কলকাতার মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের উত্থানে অসাধারণ অবদান রেখেছিলেন। খাজা নাজিমুদ্দিন ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মহান উদাহরণ, যারা পাকিস্তান গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
বাংলাদেশের জনগণ প্রথমবার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় পেয়েছিল মেজর জিয়ার মাধ্যমে, যিনি সঠিক সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পুরো জাতিকে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ থেকে মুক্ত করেছিলেন। যদিও শেখ মুজিব বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানের জন্য ভূমি প্রস্তুত করেছিলেন, তবে যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে নেতৃত্ব প্রদানে ব্যর্থ হন। তার এই ভূমিকা পরবর্তীতে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। দেশ পরিচালনায়ও তিনি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার অভাবে ব্যর্থ হন। বাকশাল গঠন শেখ মুজিবের একটি বড় রাজনৈতিক ভুল হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এর ফলে তার জীবনও ঝরে যায়।
অন্যদিকে, জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের এক দূরদর্শী নেতা, যিনি একটি আধুনিক ও স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন, যেখানে বহিরাগত হুমকি থেকে মুক্তি ছিল। তার গৃহীত সংস্কার কর্মসূচি তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রমাণ। 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ' ধারণার প্রবর্তন এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠা তার প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের ফল। গত পাঁচ দশকের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানকেই বাংলাদেশের একমাত্র দূরদর্শী নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
জেনারেল এরশাদ নিজেকে দেশ গড়ার একজন কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন, কিন্তু রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাবে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো ভণ্ডামির দ্বার খুলে দেন। এরশাদের পতনের পর বিএনপি বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা প্রদর্শন করে। তবে বিএনপির কিছু রাজনৈতিক ভুলের কারণে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। এরপর খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আবার কাজ করে এবং বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে।
কিন্তু পরবর্তীতে বিএনপির রাজনৈতিক ভুলভ্রান্তি বড় বিপর্যয়ে পরিণত হয় এবং তারাই এর শিকার হয়। পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবেশ দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং গত পনেরো বছর ধরে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনামলে বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ে।
বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা এই ফ্যাসিস্ট শাসনের চরম নির্যাতনের শিকার হন। হেফাজতসহ অন্যান্য ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোকেও কঠোর দমন-পীড়নের সম্মুখীন হতে হয়। বাংলাদেশের জনগণ পরিবর্তনের সকল আশা হারিয়ে ফেলেছিল, কিন্তু হঠাৎ করে আল্লাহর কৃপায় একটি বিপ্লবের মাধ্যমে, যা বিপুল প্রাণহানি ও অপরিসীম কষ্টের বিনিময়ে এসেছিল, তারা আশার আলো দেখতে পায়।
ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সফলতা অর্জন করেছে এবং ড. ইউনুস দায়িত্ব পালনে যোগ্য বলেই প্রতীয়মান হয়েছেন। তবে সমস্যা রয়েছে বিপ্লবের অংশীদারদের মধ্যে, যারা দেশের সংকটময় মুহূর্তে নিজেদের দায়িত্ব ভুলে ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে।
দেশ অবশ্যই একটি রাজনৈতিক দলের দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত এবং এটি এখন বিএনপির পালা। জনগণ প্রত্যাশা করে বিএনপির নেতৃত্ব এমন পরিপক্কতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রদর্শন করবে, যা অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত হুমকির মুখে দেশকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের জনগণ ঐতিহাসিকভাবে স্বাধীনতাপ্রেমী এবং যারা জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাবে, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে কখনও দ্বিধা করবে না। বাংলাদেশের জন্য যারা রাজনীতি করছেন, তাদের সবার এই বাস্তবতা মনে রাখা উচিত।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নির্মাণাধীন পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল প্রকল্প ২০২২ সালের জুন মাসে চালু করা হবে। একই সময়ে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল চালু করা হবে।
আজ রোববার সচিবালয়ে সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে অনুষ্ঠিত এক ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়।
মন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু চালুর সময়সীমা কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। ২০২২ সালের জুন মাসের দিকে এটি চালু করা সম্ভব হবে। একই সময়ে আরও তিনটি প্রকল্প চালু হয়ে যাবে বলে আশা করেন তিনি। সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলেও জানান ওবায়দুল কাদের।
পদ্মা সেতু ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার প্রকল্প। এটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। তাতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়বে বলে সরকার আশা করছে। পদ্মা সেতু চালু হলে এর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হবে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০২২ সালে পদ্মা সেতু উদ্বোধন হলে ওই বছর সেতুতে চলাচল করবে প্রায় ২৪ হাজার যানবাহন। সংখ্যাটি প্রতিবছরই বাড়বে। ২০৫০ সালে প্রায় ৬৭ হাজার যানবাহন চলবে পদ্মা সেতু দিয়ে।