a
ছবি:ইঞ্জিনিয়ার ফকর উদ্দিন মানিক
এই ভ্যাপসা গরমে লোডশেডিং এ অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ, এরফলে দুর্বিষহ জনজীবন। কয়েকদিন ধরে পত্রিকার পাতায় ও টিভি চ্যানেলে দেশের সর্বত্র লোডশেডিং এর খবর পাওয়া যাচ্ছে। সরকার বলছে, গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে কবে নাগাদ পরিস্থিতির উন্নত হতে পারে, সে ব্যাপারে কোন নিশ্চয়তা দিতে পারেননি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। কিন্তু এর প্রতিকার কি?
২০১১ সাল পর্যন্ত এই দেশে ঘরবাড়িতে বিদ্যুতের অভাবে ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকতো, লোডশেডিং ছিল নিত্য-নৈমত্তিক ঘটনা। অনেকের কাছে তা ছিল দুঃসহ স্মৃতির মতো। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্যে মানুষ লোডশেডিং শব্দটি ভুলেই গিয়েছিল। সেই অবস্থা থেকে দেশ আবার লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে ছেয়ে গেল কেন? হ্যাঁ, এ ব্যাপারে বিশ্ব পরিস্থিতির দায় আছে, কিন্তু এর বাইরে কি আর কারোর কোনো দায় নেই? বলা বাহুল্য, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ২২-২৫ হাজার মেগাওয়াট হলেও চাহিদা মাত্র ১৩-১৪ হাজার মেগাওয়াট। তাই অনেকের প্রশ্ন সক্ষমতা সত্ত্বেও লোডশেডিং কেন?
আসলে দেশে সর্বশেষ হিসাব মতে - ২০০৮-০৯ সালে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট থাকলেও তখন উৎপাদন হতো মাত্র ৪ হাজার মেগাওয়াট অর্থাৎ ঘাটতি থাকতো প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু ২০২২ সালে এসে প্রায় ২৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও চাহিদা মত প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করার মত কাঁচামালের যথেষ্ট ঘাটতি আছে। ফলে ১-২ ঘন্টা লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। কারণ বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ইউনিট প্রতি উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুন বেড়ে গেছে। এর প্রধান কারণ প্রায় ৮৫% বিদুৎ কেন্দ্র গ্যাস ও তেল নির্ভর বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। তিনি বলেন, ধৈর্য্য সহকারে এই সংকট মোকাবেলা করতে হবে। সবাইকে নিজ উদ্যোগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। পৃথিবীর অনেক উন্নত রাষ্ট্র, যাদের অনেক টাকা পয়সা আছে, তারাও লোডশেডিংয়ে যাচ্ছে। ব্রিটেনে হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ায় হচ্ছে, জাপানে হচ্ছে। কোনো কোনো দেশে বরাদ্দ থাকা সত্বেও, ব্যাংকে অর্থ থাকা সত্বেও সংবরণ করছে।
'যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি,
আশু গৃহে তার দেখিবে না আর নিশীথে প্রদীপভাতি।’
কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের কবিতার মত -দিনের বেলা প্রদীপ জ্বালানো মানুষকে পরবর্তীতে প্রয়োজনের সময় অন্ধকারেই সময় কাটাতে হয়। ঠিক তদ্রুপ দুঃসময়েও যে জাতি কারণে-অকারণে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ মৌলিক চাহিদাসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয় না করে মিতব্যয়ী হবে সেই জাতিই সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে উপনীত হবে। বস্তুত অপব্যয়ই অভাব নিয়ে আসে।
পৃথিবীর অন্যতম সেরা আবিষ্কার বিদ্যুৎ। চোখ বন্ধ করে একবার চিন্তা করে দেখলে বুঝতে পারবেন বিদ্যুৎ ছাড়া কিছুই সম্ভব না, আর সেই মূল্যবান বিদ্যুৎ সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও আমরা অহরহ অপচয় করি। এক ঢাকা শহরে যদি তিন দিন বিদ্যুৎ না থাকে কেমন হবে ভাবুনতো? - বিদুৎ না থাকলে লিফট চলবে কি?
জেনারেটর দিয়ে কয় ঘন্টা বেক-আপ দিবেন? শুধু তাই না - বিদুৎ না থাকলে উৎপাদন কমে যাবে - ফলে জিনিসের দাম বেড়ে যাবে, এর ফলে আয়ের সাথে ব্যয়ের অনেক পার্থক্য হওয়ায় জীবনযাত্রা অনেক কঠিন হয়ে যাবে। শুধু কি তাই, বিদ্যুৎ না থাকলে অনলাইন ভিত্তিক ব্যাংকিং লেনদেন বন্ধ হলে অর্থনৈতিতে স্থবিরতা দেখা দিবে।
সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও লোডশেডিং মানেই হলো বিদ্যুৎখাতের 'উন্নয়ন' দর্শনে বড় রকমের ত্রুটি রয়ে গেছে। এ মত দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। বিদ্যুৎ ছিল না, এখন বিদ্যুৎ আছে। কত বিদ্যুৎ দরকার, উৎপাদন সক্ষমতা কত বাড়ানো হবে, বিজ্ঞানভিত্তিক এই 'উন্নয়ন' দর্শন আমাদের বিদ্যুৎ খাতে অনুপস্থিত বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
লোডশেডিং এর কারণ-
আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস ও তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি লোডশেডিং এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে জাতীয় সম্পদের অপচয়। বিশেষ করে অতিমাত্রায় বিদ্যুতের অপচয় লক্ষ করা যায় বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে। যেখানে অযথা লাইট, ফ্যান, এসিসহ বিভিন্ন ভারি বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার হয়ে থাকে। এছাড়াও শহর - গ্রাম প্রায় সব বাসা-বাড়িতে অত্যাধিক মাত্রায় ও কিছু ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনে টিভি, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, হিটার, ইস্ত্রিসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করা হয়ে থাকে, যেগুলো বিদ্যুৎ অপচয়ের জন্য দায়ী।
এছাড়াও রান্নার কাজের জন্য অতিরিক্ত গ্যাসের ব্যবহার, কাপড় শুকানোর জন্য বৈদ্যুতিক ফ্যানের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার, ম্যাচের কাঠি বাচানোর জন্য গ্যাসের চুলা জালিয়ে রাখা, বাসায় ফ্যান, লাইট চালু রেখে অন্য কাজে ব্যস্ত থাকা ও বিয়ে বাড়িতে জাঁকজমকপূর্ণভাবে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা লোডশেডিং এর জন্য দায়ী।
এই দিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ তামিম বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনায় খরচ সাশ্রয়ের জন্য লোডশেডিংই সেরা বিকল্প। তিনি আরো বলেন- শুধু বাংলাদেশ নয়, উন্নত বহু দেশ জ্বালানি সংকটে পড়েছে। কেউ প্রস্তুত ছিল না। ইউরোপ মারাত্মক সংকটে পড়েছে। জাপান, তাইওয়ান, ভারতেও সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি আরো বলেন - দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার কোন ঘাটতি নেই, কিন্তু উৎপাদনের জন্য প্রাথমিক কাচামালের প্রাপ্যতার যথেষ্ট ঘাটতি আছে। জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় দেশের গ্যাস উৎপাদনে নজর দেয়া প্রয়োজন ছিলো।
অপরদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ পেতে সরকার জামালপুরে ১শ মেগাওয়াট যে কেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে, সেটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এ ধরনের একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আমরা দেশে সৌরশক্তির বড় অবদানটা বুঝতে পারবো। বিদ্যুতের ট্যারিফ বেশি হলেও পরিবেশের কথা মাথায় রেখে অন্তত এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা এবং বুয়েটের অধ্যাপক ডা. শামসুল আলম বলেন, সঠিকভাবে লোড ম্যানেজমেন্ট ( লোডশেডিং) গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্তমান উৎপাদন হারের মধ্যেও জনগণের দুর্ভোগ কমাতে পারে। দেশে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অবৈধভাবে ব্যবহার হয়। দেশের সকল গ্যাস ও বিদ্যুতের অবৈধ ব্যবহার বন্ধেরও মাধ্যমে এর সমাধান দ্রুত সম্ভব।
অপরদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় আপাতত স্পট মার্কেট (খোলাবাজার) থেকে গ্যাস কেনা হচ্ছে না। এ অবস্থায় জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় সারা দেশে দিনে কয়েক ঘন্টার লোডশেডিং চলছে।
বিদ্যুতের ব্যবহার নিয়ে আমাদের চিন্তা করার এখনই উপযুক্ত সময় । অভিযোগ বা পাল্টা অভিযোগের বিষয় নয় এটি বরং ঐক্যবদ্ধভাবে এটা সমাধান করতে হবে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন। তিনি বলেন, সরকার এই সমস্যার সমাধান করতে সাধ্যাতীত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে বিদ্যুৎ,গ্যাস পানিসহ মৌলিক চাহিদাসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দামের অস্থিরতার সময় বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট কমানোর গেলে এবং বিশ্ব পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে চাহিদামতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
এ দিকে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, এই পরিস্থিতি সাময়িক। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী কিছু সময়ের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানোর কথা ভাবছেন। আমাদের প্রচুর বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। বিশ্বে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি কাঁচামালের কারণে আমরা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছি। যে তেল আমরা ৭০ থেকে ৭১ ডলারে কিনতাম সেটা এখন প্রায় ১৭১ ডলার হয়ে গেছে এবং মূল্য দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশ জ্বালানি সাশ্রয়ে কেউ দাম বাড়াচ্ছে কেউবা ব্যবহার কমাচ্ছে । পুরো বিশ্বে এই সংকটময় সময়ের মূল কারণ হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি করোনা পরবর্তী শিল্প উৎপাদনে বিদ্যুৎ এর চাহিদা বেড়ে যাওয়া। অর্থনীতির ভাষায় চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ে আর ঘাটতি থাকলেও দাম বাড়ে। ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় না করলে দাম না বাড়ানোর বিকল্প থাকবে না। যদি আমরা সবাই গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হয়ে উঠি, তাহলে খুব দ্রুত এই পরিস্থিতি আমরা কাটিয়ে উঠতে পারবো।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ সংকটের এই সময়ে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কথা জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন -বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে শিডিউল অনুযায়ী এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং, দোকান-পাট রাত ৮ টায় বন্ধ,তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্থগিত ও সরকারি-বেসরকারি অফিসের কিছু কার্যক্রম ভার্চুয়ালি এবং সপ্তাহে একদিন পেট্রোল পাম্প বন্ধ রাখার, অফিস টাইম কমানো, ওয়ার্ক ফ্রম হোম, অফিস ভবনে বিদ্যুৎ খরচ সীমিত করার জন্য এতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রায় সারাদেশ এখন বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত। শহর, মফস্বল কিংবা অজপাড়াগাঁ সবখানেই এখন বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সহজলভ্যতার ফলে অনেকেই বিভিন্ন সময়ে, কারণে বা অকারণে বিদ্যুৎ অপচয় করে, যা আমাদের দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর।এখন সবারই উচিত বিদ্যুৎ অপচয় রোধ করা। আমরা নিজেদের অজান্তেই প্রত্যহ অনেক বিদ্যুৎ অপচয় করে ফেলি। এর সঙ্গে দিনকে দিন বাড়তে থাকা বিভিন্ন প্রযুক্তির পণ্যের ব্যবহারতো আছেই। তাই বলে কি বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন না? অবশ্যই করবেন। তবে বৈশ্বিক সংকটময় মুহূর্তে
বিদ্যুৎ ব্যবহারে অপচয় না করে বরং মিতব্যয়ী হওয়া উচিত। বিদ্যুতের অপচয় কমাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক- বিদ্যুৎ অপচয় রোধে কী করণীয়-
* টিউব লাইটে ইলেকট্রিক্যাল ব্যালেষ্ট ব্যবহার না করে যদি ভালো মানের ইলেকট্রনিক্স ব্যালেষ্ট ব্যবহার করা যায়, তাহলে বিদ্যুৎ বিল কম আসবে অনেক।
* ফ্যানের রেগুলেটর যদি ইলেকট্রনিক্স রেগুলেটর হয় বিদ্যুৎ বিলের খরচ বেঁচে যাবে।
* দেওয়ালের বিভিন্ন পয়েন্টে অযথা চার্জার লাগিয়ে রাখলেও কিছু বিদ্যুৎ খরচ হয়। দরকার না হলে প্লাগ খুলে ও সুইচ বন্ধ করে রাখুন।
* প্রয়োজন ব্যাতীত ওভেন, ফ্যান, পিসি ইত্যাদি বন্ধ করে রাখুন।
* বিদ্যুৎ সংযোগ খারাপ বা ত্রুটিপূর্ণ হলে আপনার বিদ্যুৎ খরচ বেশি হতে পারে। খারাপ সংযোগ সারিয়ে তুলুন।
* পুরোনো লাইট বাল্ব বদলে এনার্জি সেভার বাল্ব ব্যবহার শুরু করুন। এগুলো ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে পারে।
* ওয়াশিং মেশিন শুধু বিদ্যুৎ নয় পানিরও অপচয় করে বেশি।
* ড্রায়ারে বা ফ্যান ছেড়ে কাপড় শুকানোর বদলে বারান্দা বা ছাদে মেলে দিন।
* রেফ্রিজারেটরের কয়েল বছরে অন্তত দু’বার পরিষ্কার করিয়ে নিন। এসির ফিল্টারও পরিষ্কার রাখুন। তাহলে বিদ্যুৎ খরচ কমবে।
* পানি গরম করতে গিজার বা হিটার ব্যবহার কমিয়ে দিন।
* হেয়ার ড্রায়ারের বদলে বাতাসেই শুকিয়ে নিন চুল। এতে করে বিদ্যুতের অপচয় কমবে।
* গ্যাস সরবরাহ সচল থাকার পরও বিদ্যুৎ চালিত চুলা ব্যবহার না করা, বিদুৎ চালিত চুলা বিদ্যুৎ অপচয়ের অন্যতম কারণ।
* বাইরে বের হওয়ার সময় সব বৈদ্যুতিক সুইচ বন্ধ করে বের হওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ভুলবশত যেন কেউ রাতে লাইট জ্বালিয়ে ঘুমিয়ে না পড়েন।
* ওভেন চালানোর অভ্যাস ত্যাগ করুন। বিশেষ করে মাইক্রোওয়েভ। রাইস কুকার, কারি কুকার ইত্যাদি একেবারেই বাধ্য না হলে ব্যবহার করবেন না।
* নিয়ন গ্যাসীয় ডিম লাইট ও ইলেকনিং বেলাষ্ট ডিম লাইটে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। এভাবে ডিম লাইট থেকে ৫ ভাগের এক ভাগ বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়।
* বিভিন্ন উৎসব কিংবা অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা কমানোর ব্যবস্থা করুন। এমনকি বিয়ের অনুষ্ঠানেও অতিরিক্ত আলোকসজ্জা এড়িয়ে চলুন।
বর্তমানে অনেক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অযথা বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো, রাস্তার বাতি সময়মতো বন্ধ না করাসহ নানাভাবে আমরা প্রতিনিয়ত বিদ্যুতের অপচয় করছি। প্রাত্যহিক জীবনে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, তেল একে অপরের পরিপূরক। তাই বিদ্যুৎসহ সকল জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধ করার এখনই সময়। বিদ্যুৎসহ সকল রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ করার উপায়গুলো -
* দিনের আলোর সর্বোত্তম ব্যবহার হোক -দিনের বেলায় লাইট, ফ্যান কিংবা এসি কম ব্যবহার করে বাইরের আলো আর প্রাকৃতিক হাওয়াকে সাদরে আলিঙ্গন জানান আপন আলয়ে। ভোরবেলাতেই জেগে উঠুন রোজ। দিনের আলোয় হোক নিত্যদিনের সঙ্গী। সুস্বাস্থ্য আর সু-অভ্যাস দুটিই হবে ভোরের জাগরণে। আপনি ভরপুর হবেন প্রাণশক্তিতে, আর বেঁচে যাবে অহেতুক বিদ্যুৎ শক্তির খরচ।
* এসির ব্যবহার কমানো হোক - বাড়িতে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থাকলেই যে সব সময় তা চালাতে হবে, তা কিন্তু নয়। কখনো কখনো প্রাকৃতিক হাওয়াও উপভোগ করতে পারেন ছাদে বা বারান্দায়। বারান্দার সবুজ গাছ ঘরেও আনে শীতল পরশ।
*জ্বালানী ব্যবহারে অপচয় রোধ করি -জ্বালানী গ্যাসের প্রবাহ অবিরাম পাচ্ছেন একই টাকায় এই ভেবে দেশের সম্পদের অপচয় করা যাবে না। আমাদের মা -বোনেরা অনেকেই ম্যাচের কাঠি বাঁচাতে চুলা জ্বালিয়ে রাখেন যেটা কোনভাবেই উচিৎ নয় । প্রয়োজনের অধিক জ্বালানি গ্যাস ব্যবহার না করার অভ্যাস রপ্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ তথা জরিমানা আরোপের ব্যবস্থা নিশ্চিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
* মোটরযানের জ্বালানি বাঁচাতেও সচেষ্ট থাকুন- আমার টাকায় আমার জ্বালানী আমি খরচ করবো এই মনোভাব থেকে বের হতে হবে কারণ জ্বালানীর জন্য সরকার প্রায় ৫-১০ গুণ ভর্তুকি দেন। কম দূরত্বের জন্য মোটরসাইকেলের চেয়ে বাই সাইকেলে বা হেঁটে যাওয়া স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। যানবাহনে বিনা প্রয়োজনে ইঞ্জিন বন্ধ রাখতে হবে।
*পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার হোক - আপনি হয়তো প্রতিনিয়ত পানি পাচ্ছেন । আবার কোথাও রাত জেগে মোটর চালিয়েও পানি পাচ্ছে না অনেকেই । সুপেয় পানির অভাব বিশ্বব্যাপী। আপনার পানির অপচয়ের কারণে হয়তো অনেক এলাকায় পানির সংকট দেখা দিবে। তাই প্রয়োজনীয় পানি ‘ব্যবহার’ করুন কিন্তু অপচয় নয়।
* কাপড় ধোয়ার যন্ত্রের সীমিত ব্যবহার হোক- কাপড় ধোয়ার যন্ত্র প্রতিদিন না চালিয়ে কাপড় জমিয়ে রেখে কয়েক দিন অন্তর চালাতে পারেন। অথবা ওয়াশিং মেশিন ব্যবহারের পরিবর্তে হাতে কাপড় ধৌত করলে শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি জাতীয় সম্পদও বেঁচে যাবে।
* সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি করা, পাওয়ার সেভিংস বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার।বাইরে বের হবার সময় ঘরের লাইট, ফ্যান, এসি ওয়াইফাইয়ের সুইচ অফ করবেন।
* ইজিবাইক ও অটোরিকশা বন্ধ হোক - গবেষণায় দেখা গেছে অবৈধ প্রায় ১৫ লক্ষ ইজিবাইক ও অটোরিকশায় অবৈধ চার্জেই গিলে খাচ্ছে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষ মনে করে - জ্বালানি সংকট হতেই পারে কিন্তু এ বিষয়ে আগে থেকেই যদি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হতো তাহলে লোডশেডিং এর পরিমাণ অসহনীয় পর্যায়ে যেতো না! অনেকের ধারণা সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহনে যারা প্রভাবিত করেন তারা মূলত এই ক্রাইসিসের মুখে পড়তে হয় না। লোডশেডিং যাইহোক তারা এসিতেই থাকবেন অপরদিকে সমাজের বৃহৎ জনগোষ্ঠী মৌলিক চাহিদা হতে বঞ্চিত হবেন। এতে মানুষের মনে বিরুপ প্রতিক্রিয়া হবে, অথচ দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সুবিধা, শান্তি শৃঙ্খলা নানা সূচকে দেশর অভূতপূর্ব উন্নতি হলেও কিন্তু মৌলিক চাহিদায় প্রভাব পড়লে বাকি সব কিছু ম্লান হবে। এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে জনমানুষের ভোগান্তি রোধ করার বিকল্প নাই।
উন্নয়নশীল দেশ থেক উন্নত দেশ হওয়ার জন্য প্রত্যেক মানুষকে সততা,দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদ হোক বা মনুষ্য সৃষ্ট সম্পদই হোক, প্রতি ক্ষেত্রে সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে আমাদের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করতে হবে। বড় বড় অপচয় ও অব্যবস্থাপনা ছাড়াও আমাদের দিন যাপনে, দৈনন্দিন কাজকর্মে, চলতে-ফিরতে অসতর্কতা-অসচেতনতা ও অজ্ঞতার কারণে আমরা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও কর্মপরিবেশে গ্যাস, বিদুৎ, পানি, তেল ব্যবহারে ছোট ছোট অপচয় করে যাচ্ছি। দিয়াশলাইয়ের কাঠি বাঁচানো ও কাপড় শুকানোর জন্য বাসাবাড়ির গ্যাসের চুলা অকারণে জ্বালিয়ে রাখার বিষয়টি মা-বোনদের পুরনো অভ্যাস । এই অপচয়ের কারণেই হয়তো ঢাকা শহরের অনেক এলাকায় এখন গ্যাস সংকট দেখা দেয়। শুধু তাই না, অপচয়ে রাজার ভাণ্ডারও ফুরিয়ে যায় এবং
সব ধর্মে অপচয় কে বর্জন ও মিতব্যয়িতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনের বলা হয়েছে- ‘অপচয়কারী শয়তানের ভাই '। তাই জাতির প্রতিটি কণা পরিমাণ সম্পদের যথাযথ সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতের জন্য অপচয়প্রবণতা ত্যাগ করে জাতীয় সম্পদ রক্ষায় মিতব্যয়ী হতে পারলে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব হবে বলে মনে করেন দেশে বিশেষ্টজনেরা।
ভোগে নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ' - ত্যাগই মানবজীবনের মহৎ আদর্শ। ত্যাগের মধ্য দিয়েই মনুষ্যত্বের বিকাশ সাধিত হয়। যথার্থ মনুষ্যত্ব বোধসম্পন্ন মানুষের পরিচয় তার ভোগ-লালসার মাধ্যমে প্রকাশ পায় না, পরের জন্য ত্যাগের মধ্যেই মানুষের প্রকৃত সুখ নিহিত। মনে রাখতে হবে - সরকারের একার পক্ষে জাতীয় সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই জাতীয় সম্পদ ব্যবহারে প্রত্যেকের একটুখানি সচেতনতার কারণে সাশ্রয় হওয়া বিদ্যুৎই হয়তো একজনের বড় ধরনের কোনো কাজে লাগতে পারে। অতএব, দেশের সুনাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসা এবং নিজে সচেতনতা অবলম্বনপূর্বক অপরজনকে সচেতন করার মাধ্যমে বিদুৎসহ সকল রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় কমিয়ে দেশের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করি।
ইঞ্জিনিয়ার ফকর উদ্দিন মানিক
লেখক: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি
সভাপতি - সিএসই এলামনাই এসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
ফাইল ছবি
বিপুলসংখ্যক মৃত্যুর জন্য তুরস্ক সরকার ভূমিকম্পের তীব্রতাকে দায়ী করলেও তুরস্কের সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা ভবন নির্মাণে অনিয়মকেই এর জন্য দায়ী করছেন।
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের একটি বহুতল ভবন ধসে ২১ জনের মৃত্যু হয়। তদন্তে দেখা যায়, আটতলা ভবনের ওপরের তিনটি তলা নির্মাণ করা হয়েছিল অবৈধভাবে। কিন্তু ভবনটির মালিকপক্ষ স্রেফ কিছু অর্থ জরিমানা দিয়ে ভবনটি বৈধ করে নিয়েছিল।
তুরস্কের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ একটি দেশে ভবন নির্মাণের সময় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নীতিমালা না মানার পরও জরিমানা দিয়ে ‘ক্ষমা’ পাওয়ার এ সুযোগ বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা। ২০১৯ সালের ভবন ধসের পর চেম্বার অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্সের চেয়ারম্যান সেমাল গোকচে বলেছিলেন, এর অর্থ হলো আমাদের শহরগুলো, বিশেষত ইস্তাম্বুলকে কবরস্থানে পরিণত করা এবং আমাদের ঘরগুলো থেকে কফিন বের করার পরিস্থিতি তৈরি করা।’ (টার্কিশ সিটিজ কুড বিকাম ‘গ্রেভইয়ার্ডস’ উইথ বিল্ডিং অ্যামনেস্টি, ইঞ্জিনিয়ার্স সে, রয়টার্স, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)
চার বছর যেতে না যেতেই তুরস্কের প্রকৌশলীদের সেই আশঙ্কা সঠিক প্রমাণিত হলো। ৬ ফেব্রুয়ারি ভয়াবহ ভূমিকম্পে হাজার হাজার ভবন ধসে সিরিয়া ও তুরস্কের এক বিশাল অঞ্চল আক্ষরিক অর্থেই কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ২৪ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে তুরস্কের অধিবাসী প্রায় সাড়ে ২০ হাজার।
এই বিপুলসংখ্যক মৃত্যুর জন্য তুরস্ক সরকার ভূমিকম্পের তীব্রতাকে দায়ী করলেও তুরস্কের সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা ভবন নির্মাণে অনিয়মকেই এর জন্য দায়ী করছেন। ইস্তাম্বুলের বোগাজিচি ইউনিভার্সিটির কান্দিলি অবজার্ভেটরি অ্যান্ড আর্থকোয়েক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুস্তাফা এরদিক আল-জাজিরাকে বলেছেন, ‘ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা এত বেশি হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো যথাযথ মান বজায় রেখে ভবন নির্মাণ না করা।’
তুরস্কের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের উচিত হবে অবিলম্বে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের দুর্বল অবকাঠামোর ভবন চিহ্নিত করে সেগুলোর সংস্কারের কর্মসূচি হাতে নেওয়া, নতুন ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড মানা হচ্ছে কি না, তার তদারকি নিশ্চিত করা, ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতা ও চিকিৎসার সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি ও তার নিয়মিত ড্রিল করা, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানিসহ পরিষেবাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ভূমিকম্পসহনীয় করা।
অথচ আনাতোলিয়ান ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত হওয়ায় তুরস্ক মারাত্মক ভূমিকম্পপ্রবণ একটি অঞ্চল। এর আগে ১৯৯৯ সালে দেশটির উত্তর-পশ্চিমে ইজমিত অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ১৭ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। বিভিন্ন সময় ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির শিকার তুরস্কে ভবন নির্মাণে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়, যার সর্বশেষ সংস্করণটি করা হয় ২০১৮ সালে। কিন্তু এসব আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং সময়-সময় জরিমানার বিনিময়ে ক্ষমার ব্যবস্থা থাকায় তুরস্কের পুরোনো ভবনগুলোকে যেমন ভূমিকম্পসহনীয় করা হয়নি, তেমনই নতুন নির্মিত অনেক ভবনও ভূমিকম্পপ্রতিরোধী করে নির্মিত হয়নি।
বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু পুরোনো ভবনই নয়, এমনকি সদ্য নির্মিত অনেক ভবনও ভূমিকম্পে ধসে গেছে, যা এসব ভবন নির্মাণে অনিয়মকেই নির্দেশ করে। তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় প্রায় ৭৫ হাজার ভবন ওই ক্ষমার আওতায় এসেছিল। (টার্কি আর্থকোয়েক: হোয়াই ডিড সো মেনি বিল্ডিংস কলাপস?, বিবিসি, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩)
তুরস্কের ক্ষমতাসীন এরদোয়ান সরকার বরাবরের মতো ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে জরিমানার বিনিময়ে বিল্ডিং কোড ভঙ্গ করে নির্মাণ করা ভবনের বৈধতা দেওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। সে সময় জরিমানার বিনিময়ে ক্ষমার জন্য ১ কোটি আবেদন জমা পড়ে, যার মধ্যে থেকে ১৮ লাখ আবেদন মঞ্জুর করা হয়। ভবন নির্মাণে অনিয়মকে এভাবে ক্ষমা করে ২০১৯ সাল নাগাদ তুরস্ক সরকারের আয় হয় ৩১০ কোটি ডলার। (টার্কিশ সিটিজ কুড বিকাম ‘গ্রেভইয়ার্ডস’ উইথ বিল্ডিং অ্যামনেস্টি, ইঞ্জিনিয়ার্স সে, রয়টার্স, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)
তুরস্কে ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও ভূমিকম্পে বিপুল হতাহতের এ ঘটনা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। তুরস্ক-সিরিয়ার মতো বাংলাদেশও ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা, সিলেট সীমান্তে সক্রিয় ডাউকি ফল্টের অবস্থান ও টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টের অবস্থান এবং উত্তর-পূর্বে সীমান্তসংলগ্ন ইন্ডিয়ান প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল হওয়ায় বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ১৮৭০ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত বড় আকারের বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প হয়েছে এ অঞ্চলে। পরবর্তী সময়ে ছোট ছোট কিছু ভূমিকম্প হলেও বড় মাত্রার কোনো ভূমিকম্প হয়নি।
তবে গত ১০০ বছরে বড় কোনো ভূমিকম্প না হওয়ায় ছোট কম্পনগুলো শক্তি সঞ্চয় করে সামনে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা তৈরি করছে বলে মনে করছেন ভূতত্ত্ববিদেরা। বাংলাদেশে তুরস্কের মতো শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে বিশেষত রাজধানী ঢাকাসহ ঘনবসতিপূর্ণ শহরের ভবনগুলোর কত শতাংশ টিকে থাকবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বাংলাদেশে ইমারত নির্মাণ আইন ও বিধিমালা থাকলেও ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে মেনে না চলার অভিযোগ বহুদিনের। আর আইন মেনে চলতে বাধ্য করবার ব্যাপারে নগরকর্তৃপক্ষের গাফিলতিও সুবিদিত,তারা মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও নিয়মিত তদারকির অভাবে পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সূত্র ধরে বণিক বার্তা জানাচ্ছে, দেশের শহরাঞ্চলের নির্মাণ করা ও নির্মাণাধীন ৬০ শতাংশ ভবনই তৈরি হচ্ছে বা হয়েছে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে।
এর মধ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এর আওতাধীন ভবনের ৬৫.০৩ শতাংশ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন ২৮.৫৭ শতাংশ, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ৫৩.৬৯ শতাংশ, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ৬৭.৯৬ শতাংশ, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ২৫.৩৭ শতাংশ এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন ভবনের ২৪.৫৩ শতাংশ ভবন নানা ধরণের নিয়ম ভঙ্গ করে তৈরী।
ভবন নির্মাণে অনিয়মের মধ্যে রয়েছে অনুমোদিত উচ্চতার বেশি উঁচু ভবন নির্মাণ, নকশার বাইরে গিয়ে ভবন সম্প্রসারণ, আবাসিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ, ভবনের চারপাশে প্রয়োজনীয় খোলা জায়গা না রাখা, যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না রাখা ইত্যাদি। (শহরাঞ্চলের ৬০% ভবন নির্মাণে নিয়মের ব্যত্যয়, ২০ জানুয়ারি ২০২২, বণিক বার্তা) এভাবে অনিয়মের মাধ্যমে নির্মিত ভবনগুলো ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারাত্বক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) কর্তৃক ২০০৯ সালে তৈরি একটি রিপোর্ট অনুসারে, শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৮৩ শতাংশ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৯২ শতাংশ এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসব নগরে পুরোপুরি ভেঙে পড়া ভবনের সংখ্যা হবে যথাক্রমে ২ লাখ ৩৮ হাজার, ১ লাখ ৪২ হাজার এবং ৫০ হাজার। ঢাকায় ৭৪৮টি পানির পাম্প, ৭টি গ্যাস কম্প্রেসর স্টেশন এবং ৫৪ হাজার বৈদ্যুতিক স্থাপনা, চট্টগ্রামে ৭২টি পানির পাম্প, ২২টি গ্যাস কম্প্রেসর স্টেশন এবং ২৮ হাজার বৈদ্যুতিক স্থাপনা ও সিলেটে ১৮টি পানির পাম্প, ১টি গ্যাস কম্প্রেসর স্টেশন এবং ৯ হাজার বৈদ্যুতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ঢাকায় পানির পাইপে ১ হাজার ১৬টি ও গ্যাস পাইপে ৬৮৪টি স্থানে, চট্টগ্রামে পানির পাইপে ৭২৭টি ও গ্যাস পাইপে ২২৯টি স্থানে এবং সিলেটে পানির পাইপে ১২২টি ও গ্যাস পাইপে ৯৭টি স্থানে লিকেজ বা ছিদ্র তৈরি হবে। এ ছাড়া ঢাকায় ১০৭টি, চট্টগ্রামে ৩৬টি এবং সিলেটে ১৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটবে। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের সিট পাওয়া যাবে ঢাকায় মোট সিটের ১২ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৪ শতাংশ এবং সিলেটে ১ শতাংশেরও কম। রাত দুইটায় ভূমিকম্প হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে মৃতের সংখ্যা হবে যথাক্রমে ২ লাখ ৬০ হাজার, ৯৫ হাজার ও ২০ হাজার।
আর বেলা দুইটায় ভূমিকম্প হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে মৃতের সংখ্যা হবে যথাক্রমে ১ লাখ ৮৩ হাজার, ৭৩ হাজার ও ১৪ হাজার। (সূত্র: আর্থকোয়েক রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট অব ঢাকা, চিটাগং অ্যান্ড সিলেট সিটি করপোরেশন এরিয়া, কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম, ২০০৯, পৃষ্ঠা xi- xiii)
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির এই রিপোর্ট তৈরির পর এক যুগেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, এ সময়ে নিয়ম না মেনে তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা আরও বেড়েছে। কিন্তু ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমানো বা উদ্ধার তৎপরতার প্রস্তুতির কোনো অগ্রগতি নেই। পুরোনো ভবনগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করার কোনো উদ্যোগ নেই, নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে যথাযথ নকশা মানা হচ্ছে কি না এবং রড, সিমেন্ট, বালুর যথাযথ ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা-ও দেখার কেউ নেই।
এ অবস্থায় ঢাকায় সাতের বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন তো ধ্বংস হবেই, সেই সঙ্গে নিয়ম না মেনে ও জলাশয় ভরাট করে তৈরি নতুন ভবনও ধসে পড়বে। রানা প্লাজা ধস-পরবর্তী অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে ভূমিকম্পে বিপুল ধ্বংসযজ্ঞ হলে আমাদের উদ্ধার তৎপরতার সামর্থ্য কত সীমিত। এ অবস্থায় ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষকে উদ্ধার, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, ভূমিকম্প-পরবর্তী পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলা নিয়ে কেমন অসহনীয় একটা পরিস্থিতি হবে, তা অনুমান করাও কঠিন।
ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি রাজনৈতিক। ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা যায় না, কিন্তু যথাযথ প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমে ভূমিকম্পে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়।
তুরস্কের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের উচিত হবে অবিলম্বে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের দুর্বল অবকাঠামোর ভবন চিহ্নিত করে সেগুলোর সংস্কারের কর্মসূচি হাতে নেওয়া, নতুন ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড মানা হচ্ছে কি না, তার তদারকি নিশ্চিত করা, ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতা ও চিকিৎসার সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি ও তার নিয়মিত ড্রিল করা, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানিসহ পরিষেবাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ভূমিকম্পসহনীয় করা।
দুর্বল অবকাঠামোর ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি অনেক বেশি, বড় আকারের ভূমিকম্প নিয়মিত হয় না বলে ভূমিকম্প মোকাবিলার প্রস্তুতিতে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। সূত্র: প্রথম আলো
লেখক: কল্লোল মোস্তফা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবেশ ও উন্নয়ন অর্থনীতিবিষয়ক লেখক। ই-মেইল: kallol_mustafa@yahoo.com
ফাইল ছবি
ইরানের পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনা এবং ইউক্রেনে রুশ হামলার ফলে বিশ্বব্যাপী গমের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ঘাটতি সামাল দিতে করণীয় নির্ধারণ করতে ইসরাইল সফর করছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন।
ঐতিহাসিক এ সফরে তিনি ইরান ইস্যুতে আরব নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তাই শনিবার তিনি ইসরাইলের রাজধানীতে পৌঁছান।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা আরব দেশগুলোর নেতারা এখানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত ৬ বিশ্বশক্তির সম্পাদিত বহুল আলোচিত পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করতে ইসরাইলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপন আলোচনা করছেন অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন।
ইরান গত বছরের ২৯ নভেম্বর ভিয়েনায় এ বিষয়ে আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে। চলতি বছর জুনে ইরানের কট্টরপন্থি প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ আলোচনার বিষয়টি স্থগিত হয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরমাণু চুক্তি থেকে সরে গিয়েছিলেন। সূত্র: যুগান্তর