মোহাঃ খোরশেদ আলম, সম্পাদক ও প্রকাশক, মুক্তসংবাদ প্রতিদিন ১২ অক্টোবার ২০২৬ ০৬:৫২ পি.এম
খোরশেদ আলমঃ মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা, সামরিক কৌশল, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও কৌশলগত প্রভাব আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তা এবং আন্তর্জাতিক জোটের পরিবর্তন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে-মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কি আগের মতোই নিরঙ্কুশ?
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সামরিক অভিযান, পাল্টা হামলা, সামুদ্রিক যোগাযোগের নিরাপত্তা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেই হুমকির মুখে ফেলে না; বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই সামুদ্রিক পথের ওপর নির্ভরশীল। এখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে সামরিক সংঘাতের তীব্রতা যতই বাড়ুক, যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যকে রাজনৈতিক সমাধানের সমার্থক মনে করার সুযোগ নেই। কোনো পক্ষ সাময়িক সামরিক সুবিধা অর্জন করলেও তার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, পারস্পরিক আস্থা কিংবা স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা যায় না। বরং সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হয়, সমাধানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় তত বাড়ে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং কূটনৈতিক প্রভাব এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সামরিক শক্তি থাকা এবং সেই শক্তিকে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফলাফলে রূপান্তর করতে পারা এক বিষয় নয়।
ইরাক ও আফগানিস্তানের দীর্ঘ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে দেখিয়েছে, বিপুল সামরিক সম্পদ ব্যয় করেও একটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কিংবা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুরোপুরি নিজের অনুকূলে গড়ে তোলা কতটা কঠিন। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মানবিক মূল্য, অর্থনৈতিক ব্যয় এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ইউরোপীয় মিত্র ও অন্যান্য অংশীদারদের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র সব বিষয়ে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন পাবে—এমন ধারণাও আর নিঃশর্তভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। মিত্ররাষ্ট্রগুলো ক্রমেই নিজেদের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক জোটগুলোতে সহযোগিতার পাশাপাশি মতপার্থক্যও দৃশ্যমান হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হওয়ার ইঙ্গিত নয়। বরং এটি এমন এক বাস্তবতার দিকে নির্দেশ করে, যেখানে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক অংশীদারত্ব এবং আন্তর্জাতিক বৈধতার গুরুত্ব বাড়ছে। অর্থাৎ, বিশ্বরাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণে আধিপত্যের ধারণার চেয়ে পারস্পরিক নির্ভরতা ও কার্যকর দর-কষাকষির বাস্তবতা ক্রমেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন আর কেবল বহিঃশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার নিষ্ক্রিয় ক্ষেত্র নয়। ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অন্যান্য রাষ্ট্র নিজ নিজ নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও আঞ্চলিক অবস্থান বিবেচনায় ক্রমাগত কৌশল পুনর্নির্ধারণ করছে।
এই দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সহযোগিতা, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এবং কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনাও। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কেবল ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে—এমন ধারণা বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিফলন নয়।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও এই বৃহত্তর সমীকরণের অংশ। পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক চলাচলের স্বাধীনতা- প্রতিটি বিষয়েই দুই পক্ষের অবস্থান জটিল। এসব বিরোধের সমাধান কেবল শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
বরং আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা-উদ্বেগকে স্বীকৃতি দেওয়া, আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করা এবং আলোচনার জন্য গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথ উন্মুক্ত করতে পারে।
যুদ্ধের প্রভাব কখনোই যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, নৌপরিবহনের ঝুঁকি এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা দ্রুত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষত বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উদ্বেগ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যেও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা কেবল একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক লক্ষ্য নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে, সামরিক শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্ভব হলেও তার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, নিরাপত্তা-উদ্বেগ কিংবা আঞ্চলিক বাস্তবতাকে স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা যায় না। যুদ্ধ কখনো কখনো সাময়িক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা ও পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি।
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরায়েল এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রয়েছে—তারা কি সংঘাতের চক্রকে আরও বিস্তৃত করবে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে একটি কার্যকর নিরাপত্তাকাঠামো নির্মাণের চেষ্টা করবে?
এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: উত্তেজনা প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ, সামুদ্রিক যোগাযোগের নিরাপত্তা, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলা, পারমাণবিক ঝুঁকি হ্রাস এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক সংলাপ। প্রয়োজনে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যস্থতাও আলোচনার পথ সুগম করতে পারে।
তবে কূটনীতি কার্যকর হতে হলে তা হতে হবে বাস্তবসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এক পক্ষের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণকে শান্তির পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করলে সমঝোতার সুযোগ সংকুচিত হয়। বিপরীতে, নিরাপত্তার উদ্বেগ ও জাতীয় স্বার্থকে আলোচনার কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে পারলে টেকসই সমাধানের সম্ভাবনা বাড়ে।
সর্বশেষ, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা একটি মৌলিক শিক্ষা সামনে আনে: সামরিক শক্তি কোনো রাষ্ট্রকে প্রভাবশালী করতে পারে, কিন্তু সেই প্রভাবকে স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে প্রয়োজন বিচক্ষণ কূটনীতি, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও চ্যালেঞ্জটি কেবল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার নয়; বরং এমন একটি আঞ্চলিক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখা, যেখানে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা কোনো একক রাষ্ট্রের আধিপত্যের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। একইভাবে ইরান ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিরও দায়িত্ব রয়েছে উত্তেজনা হ্রাস, আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ এবং আলোচনাভিত্তিক সমাধানের পথ অনুসন্ধানে।
বিশ্ব আজ এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন একটি আঞ্চলিক সংঘাতও বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এই বাস্তবতায় শক্তির প্রদর্শন নয়, শক্তিকে সংযতভাবে প্রয়োগ করার সামর্থ্যই নেতৃত্বের প্রকৃত পরিচয়।
মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর নয়, বরং সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অঙ্গীকার এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিতে। কারণ যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করা যেতে পারে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রতিদ্বন্দ্বীকেও আলোচনার টেবিলে অবশ্যই আনতে হবে।
মোহাঃ খোরশেদ আলম
লেখক, গবেষক, সম্পাদক ও মানবাধিকার কর্মী।
মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির নতুন সমীকরণ: মার্কিন আধিপত্যের সীমাবদ্ধতা ও শান্তির অনিবার্যতা
জাতিসংঘের শীর্ষ মঞ্চে বাংলাদেশি মেধার উত্থান, কে এই খলিলুর রহমান?
মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এমএজি ওসমানীর ১০৮তম জন্মবার্ষিকী পালন
গণভোটের রাজনীতি ও সংসদের ওয়াকআউট: বিরোধিতা কি যুক্তির পথে?
বৃহত্তর ময়মনসিংহ কর আইনজীবী সমিতি-ঢাকার কার্যনির্বাহী পরিষদ ২০২৬–২০২৭-এর প্রথম সভা অনুষ্ঠিত
অসহায় স্ত্রী- শারমিন চৌধুরী সন্তানদের বাচাঁতে সরকারের সহায়তা চেয়ে সাংবাদিক সম্মেলন
হেলথ প্রমোশনে সমন্বিতভাবে কাজ করার লক্ষ্যে কুয়েট ও ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত
বিশ্ব শরণার্থী দিবস ২০২৬ এ রোহিঙ্গা এবং হোস্ট কমিউনিটির প্রতি মর্যাদা ও সম্মান আহ্বান
মালয়েশিয়া সফর: বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন
চোর পলাশকে ধরিয়ে দিতে পারলে ২০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা
সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর: তথ্যমন্ত্রী
সম্পাদক পরিষদ নেতাদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক