a কবিতার ছুটি
ঢাকা রবিবার, ২৫ মাঘ ১৪৩২, ০৮ ফেরুয়ারী, ২০২৬
https://www.msprotidin.com website logo

কবিতার ছুটি


কবি শহীদুল্লাহ আনসারী, কবি ও লেখক, মুক্তসংবাদ প্রতিদিন
বুধবার, ১২ ফেরুয়ারী, ২০২৫, ০১:২৮
কবিতার ছুটি

ছবি সংগৃহীত

কবিতার ছুটি

 কবি শহীদুল্লাহ আনসারী

 

ভাষা আর আশা নিয়ে আজ বড় দৌড় ঝাঁপ বর্ণের
হাতে মহা—ধন ইমিটেশন চকচকে ঠিক যেন স্বর্ণের।
কেউ দেখেন স্বপ্নের বালিহাঁস বালিঘাটে সারারাত
নিঘুর্ম—ভাবনায় হিরে—মতি—জহরত পাওয়া যেন ডালভাত।

ডিম পাড়ে হিমশীতে ঘর বাঁধে বালুময় নির্জলা ব—দ্বীপে
সুর বাজে জাহাজের মাস্তুলে মগ্নতায় রংময় সে শিপে,
রাতারাতি বড় হবার অসম মাতামাতি দেখে কাঁপে বুকটা
চারিদিকে হানাহানি কানাকানি কীভাবে সারাবে এ রোগটা!

কারও আজ মন নেই, সত্য ও সুন্দর পুজারির ধন নেই
কবিতারা মার খায় সবখানে, কোথাও বা পারখায় শুরুতেই,
সত্য ও সুন্দরের কথা বলে। বিবেকের দংশনে রাতারাতি
মরে কেউ। আবার মতের বিভেদ নিয়ে লেগে যায় হাতাহাতি।

কবিতার রাজ্যে অরাজকতা দেখে কেউ মরে যায় লজ্জায়
কেউ কেউ মানসিক রোগি হয়, পঁচে গলে মিশে রোগ—শয্যায়,
ছন্দের দ্বন্দ্বে কাঁটাঘার গন্ধে কবিতাকে কবিতাই চেপে ধরে টুটি
দেখে শুনে গদ্যের বীজ বুনে মঞ্জুর করে দিলাম কবিতার ছুটি।

মুক্তসংবাদ প্রতিদিন / কে. আলম

আরও পড়ুন

রায়সাহেব পঞ্চানন এবং সমসাময়িক বাঙ্গালি সমাজ: ড. অমলকান্তি রায়


আরাফাত, বিশেষ প্রতিনিধি, মুক্তসংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক
রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৪, ০৫:১৪
রায়সাহেব পঞ্চানন এবং সমসাময়িক বাঙ্গালি সমাজ ড অমলকান্তি রায়

ছবি সংগৃহীত

 

বৃটিশ সাম্রাজ্য ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত হলে শাসনকার্যের সুবিধার জন্য সমগ্র দেশকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। এসময় অবিভক্ত এবং বৃহৎ বঙ্গভূমির নাম হয়েছিল প্রেসিডেন্সী বা বঙ্গভূমি প্রদেশ। আবার প্রান্তিক অবস্থাভেদে বঙ্গে উত্তর প্রান্তীয় ভূভাগকে বলা হয়েছে উত্তরবঙ্গ।

এই রাজশাহী বিভাগের মধ্য ইংরেজি পরীক্ষার প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে সাধারণ তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেন শ্রী পঞ্চানন সরকার। ১৮৮৫-১৮৮৬ সালের কুচবিহার গেজেটে শিক্ষা-বিষয়ক রিপোর্টে কালিদাস বাবুর লেখা থেকে পাই- Panchanan Sir car a native of Coochbeher, who passed the M.E. Examination in the First Division from Mathabhanga School succeeded to secure the first place in the general list of the Rajshahi Division. বাবার মুক্তারী চেতনার প্রবাব এবং সমাজ-জীবনবোধ তাঁকে ছোটোবেলা থেকে আন্দোলিত করে তুলেছিল। বিদ্যা-বুদ্ধির প্রখরতা ও সমাজের গহন-গভীরের ব্যথা-যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে কালক্রমে তিনি হলেন কিংবদন্তী মানুষ শ্রীপঞ্চানন।

তাঁর জন্ম কুচবিহারের মাটিতে। গাছপালা, জল-হাওয়া, ধরলা ও দিলদরিয়া নদীর আহবে পুষ্ট হয়ে উঠেছেন। গৃহস্থ, সমর্থ-গৃহস্থ, জোতদার পরিবেষ্টিত দেশজ সংস্কৃতি ও হিন্দুর দশকর্মবিধির প্রবাহ তাঁর বাসভূমিতে। এরকম পরিবেশে একটি পরিচ্ছন্ন গ্রামে পূর্ব ভারতের বৃটিশ-মিত্র রাজ্য কুচবিহারে পঞ্চানন জন্ম নেন। এই পঞ্চানন সমাজে এখন মানুষের হৃদয়-সিংহাসনে অধিষ্ঠিত রাজাধিরাজ। জন্মের সময়টা ছিল ১৮৬৬ সাল। কুচবিহার জেলার মাথাভাঙ্গা মহকুমার খলিসামারি গ্রাম। কুচবিহারে তখন মহারাজা ছিলেন নরেন্দ্রনারায়ণ। মহারাজার পুত্র বৃটিশ-ভারতে খ্যাত মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ জন্ম নেন রায়সাহেব পঞ্চাননের জন্মের কিছু বছর আগে, ১৮৬৪ সালে। এগার মাস বয়স থেকে নৃপেন্দ্র নারায়ণ রাজা। সে-সময়ে রাজ্যের সিংহাসন নিয়ে যতীন্দ্র নারায়ণের সঙ্গে দ্বন্দ্ব হয়। কিন্তু কর্ণেল হটন সাহেবের মধ্যস্থতায় নৃপেন্দ্র নারায়ণই রাজা হন। মহারাজা নরেন্দ্র নারায়ণের মৃত্যু হলে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল।

মানুষের হৃদয়ের রাজাধিরাজ পঞ্চাননের জন্মের সময় তাঁর পরিবারের প্রচলিত রীতিনীতি তৎকাল গ্রাম-বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। সমসাময়িককালে নৃপেন্দ্র নারায়ণের জন্মের দেশীয় রীতি-নীতিকে ছাপিয়ে ব্রাক্ষণ্য সাংস্কৃতিক ধারাটি প্রবল ছিল। নৃপেন্দ্র নারায়ণের বড় হয়ে উঠার সমস্ত দায়িত্ব অর্পিত ছিল বঙ্গীয় কুলীণ নবকান্ত মজুমদার, দেওয়ান ব্রাক্ষণ নীলকমল সান্যাল, সীতেশ সান্যাল প্রমুখ বঙ্গীয় দেশীয় রাজকর্মচারীগণের। কুচবিহার রাজধানীর জৌলুষ থেকে বহু দূরে মাথাভাঙ্গার খলিসামারি গ্রামে আর একজন মহাপুরুষ গ্রামীণ পরিবেশে প্রবাহমান ভারতীয় ধারায় শিক্ষা গ্রহণ শুরু করেছিলেন। উল্লেখ্য, ঠিক তাঁর কয়েক বছর আগে থেকে জোড়াসাঁকোতে বড় হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

স্বাধীন মতাদর্শ প্রকাশ, সামাজিক উন্নয়নের বিধান, জাতির মোচন, কৃষক ও দিনমজুর মানুষের উন্নতি সাধন, নারীদের মর্যদা রক্ষা, পুরাতন দৃষ্টির মূল্যায়ন- এই বিষয়গুলি রূপায়ণের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি রাজরোষমুক্ত অঞ্চল। বৃটিশ করদ মিত্র কুচবিহার রাজ্য ছেড়ে বেছে নিয়েছিলেন অবিভক্ত বঙ্গ দেশের রংপুর শহর। এই শহরই তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল। বাঙ্গালি যে সমাজে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন তা ছিল রাজবংশীয় ক্ষত্রিয় সমাজ। সে সময়ে নিদ্রাচ্ছন্ন রাজবংশীয় সমাজকে ক্ষত্রিয় আন্দোলনের মাধ্যমে জাগিয়ে তোলার সমস্তরকম বৈপ্লবিক কর্মসূচীর নেতৃত্ব ছিলেন তিনি। সেই আন্দোলনের ঢেউ নিজের গণ্ডী ছাড়িয়ে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে থেকে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন, তা ছিল সমাজে স্বীকৃতির লড়াই। এই আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন তিনি।

বলাবাহুল্য, রংপুর শহর পঞ্চানন বর্মার মূল কর্মক্ষেত্র ছিল। আগে থেকেই এই শহরকে ঘিরে মহাজীবন ও কবি-সাহিত্যিকদের চিন্তার বলয় সৃষ্টি হয়েছিল। এই রংপুরেই ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর দেওয়ান ছিলেন রাজা রামমোহন রায়।

বাঙ্গলার মনীষীদের কথা উঠলেই রামমোহন, বিদ্যাসাগর, কেশব সেন, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ- এইসকল মনীষীদের নাম উজ্জ্বল হয়ে উঠে। বাঙ্গালি সমাজ জীবনের ভৌগোলিক পরিধিটি অনেক বড়। এই ভৌগোলিক পরিধির সঙ্গে শুধু বল্লালী-ছত্রিশ জাতের ইতিহাসটাই সম্পূর্ণ নয়। বৃহৎ বঙ্গদেশে বিশেষ করে অবিভক্ত উত্তরবঙ্গের বাঙ্গালি সংস্কৃতিতে পুষ্টি নানা বর্ণের মানুষরাও আছেন। ব্রাক্ষ্ণণ্য শ্রেণিবিভাজনে বাঙ্গলায় ক্ষত্রিয় নেই বলে আমরা কি শ্লাঘা বোধ করি? বৃহৎ বঙ্গদেশের জাতি-সংস্কৃতির ইতিহাসে ক্ষত্রিয় জাতির একটি বিরাট গৌরব অধ্যায় রয়েছে। ইতিহাসের ঘটনা পরস্পরায় মহাপদ্মনন্দের সঙ্গে সংগ্রামে পরাস্ত হয়ে পুন্ড্রবর্ধন এলাকায় আর্য ক্ষত্রিয়রা আত্মগোপন করে থাকেন দীর্ঘকাল। স্থানীয় নানা অনার্য লোকের সঙ্গে সংমিশ্রণ ঘটে।এই আত্মগোপনের পরিধির বিস্তৃত লাভ করে তৎকাল কামরূপের রত্নপীঠ এলাকায়। বর্তমান বৃহৎ জলপাইগুড়ি জেলার এলাকায় ছিল এই রত্নপীঠ। দীর্ঘকাল প্রায় ২৩০০ বছর একই ভূখন্ডে থাকার ফলে আত্মগোপনকারী আর্য ক্ষত্রিয়দের মধ্যে সামাজিক ও দৈহিক বৈশিষ্ট্যের কিছু পরিবর্তন ঘটে। অষ্ট্রিক ও দ্রাবিড় প্রেণিভুক্ত মানুষের সমুদ্র পথে সুবর্ণভূমি, তিব্বত, পূর্ব আসামের গিরিপথ বেয়ে মঙ্গোল শ্রেণিভুক্ত মানুষের বাংলায় আগমন ঘটে। .বাঙ্গালীর রক্তপ্রবাহে মঙ্গোলের মিশ্রণের প্রবাহ ক্ষীণ থাকলেও উত্তরবঙ্গের আত্মগোপনকারী আর্য ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে প্রথমে অষ্ট্রিক ও দ্রাবিড় রক্তের মিশ্রণ ঘটে এবং অনেক পরে মঙ্গোল রক্তের ধারার মিশ্রণ ঘটে। এই জাতি বর্তমান অবিভক্ত বঙ্গের বৃহত্তর উত্তরবঙ্গের গর্বিত জাতি রাজবংশী। দীর্ঘকাল অনগ্রসরতার জন্য এই জাতিকে পশ্চাৎমুখীতা থেকে জোর্তিময় করার জন্য আত্মত্যাগব্রত নিয়েছিলেন রায়সাহেব পঞ্চানন।

আক্ষেপ এখানেই বঙ্গদেশের মনীষীদের অনুসন্ধানকালে তাঁকে দীর্ঘদিন সামনের সারিতে বসানো হয়নি। বহু আন্দোলন এবং রাজবংশী সমাজের শিক্ষার বর্তমান তুলনামূলক অগ্রসরতা হেতু তিনি বাঙ্গালীর চরিত্রাভিধানে আসন পেয়েছেন। তাঁর মণীষা সমস্ত ক্ষেত্রে প্রকাশিত হয়েছিল অবিভক্ত বঙ্গের রংপুর শহরকে ঘিরে। পশ্চিম বাংলার দক্ষিণ বঙ্গের কলকাতাসহ গোটা বাংলাদেশের তৎকালীন চিন্তাবিদদের প্রভাব রংপুর শহরে পড়েছিল। স্বদেশী আন্দোলনের ঢেউয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৬ সালে তাঁর ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসে নিখিলেশকে বলেছেন- ‘চায়ের টেবিলে সন্দীপকে বললুম, তুমি রংপুর যাবে না? সেখান থেকে চিঠি পেয়েছি, তারা ভেবেছে,  আমিই তোমাকে জোর করে ধরে রেখেছি।’ ঠিক এই উপন্যাসের তিন বছর আগে সারা বিশ্বে কবিগুরুর নোবেল প্রাপ্তি সংবাদ এবং অখন্ড উত্তরবঙ্গে পঞ্চাননের নেতৃত্বে উপবীত গ্রহণের মধ্য দিয়ে ক্ষত্রিয়ত্ব প্রতিষ্ঠা একটি যুগান্তকারী ঘটনা। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের স্বদেশীয়ানার উদ্দীপনায় তাঁর জীবনে আর এক নতুন ঢেউ এলো। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী, ব্রক্ষবান্ধব উপাধ্যায়ের সাথে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের ঢেউয়ে সমকালীন যুবকদের চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করে সংগঠিত করার কাজটি সম্মন্ন করে ফেলেছিলেন তিনি।
১৯০১ থেকে ১৯৩৫ পর্য্ন্ত রংপুরের সঙ্গে তিনি সম্পূর্ণরূপে জড়িত। এই সময়কালে বঙ্গদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রত্যক্ষ করেছেন। শিক্ষা ও আর্থিক অনগ্রসর জাতিকে কিভাবে উন্নত থেকে উন্নততর করা যায়- এই ছিল তাঁর একমাত্র ব্রত। ইংরেজ সরকারের থেকে সমস্ত সুযোগ আদায় করার মূল লক্ষ্য ছিল রাজবংশী ক্ষত্রিয় জাতিকে মর্য্দাসম্পন্ন ও বলবান করা। উত্তর-পূর্ব ভারতের ভূখন্ডকে শিক্ষা-সংস্কার ও আর্থিক দিক থেকে উন্নত করার জন্য আমৃত্যু সংগ্রাম করে যথেষ্ট সফলতায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। ইংরেজ শাসনের সঙ্গে যুক্ত থেকে দেশের একটি বড় অংশের বৃহত্তর সমাজের অগ্রদূত ছিলেন।
স্বাধীনতা ফিরে পাবে এই আশ্বাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদানের জন্য বাঙ্গলা জাতীয় সেনাদল গঠন করলেন। জলপাইগুড়ি, রংপুর, দিনাজপুর ও আসামের ধুবরি প্রভূতি স্থান থেকে রাজবংশী যুবকরা সেনাদলে নাম লেখালেন। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথের A nation in making গ্রন্থে এই বিষয়ে উল্লেখিত আছে।

জননেতা পঞ্চানন শিক্ষা বিস্তার ও আর্থিক বিস্তার ও আর্থিক উন্নয়নের উপর সবিশেষ গুরুত্ব দিলেন। এছাড়া জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে পরা একটি সমাজের মানুষের মাঝে জাত্যাভিমান জাগ্রত করার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষা। তাই শিক্ষা প্রসারে তাঁর বক্তব্য-‘বন্ধু সব! আপনাদের সকলের নিকট করজোড়ে শত শতবার বিনীতভাবে বলিতেছি, আপন আপন সন্তান সন্ততিদিগকে বিদ্যা-শিক্ষা করাইবেন। তাহাদের বিদ্যা শিক্ষার্থে যদি সর্বস্ব নিঃশেষিত হয়, যদি ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করিয়াও ছেলে-পেলেকে লেখাপড়া শিখাইতে হয়  তাহাও করাইবেন। তথাপি তাহাদের মূর্খ করিয়া রাখিবেন না।’ শিক্ষাই সকল উন্নয়নের প্রথম সোপান। এই চেতনাকে বৃদ্ধি করার জন্য শিক্ষা বিস্তারের জন্য গ্রামে-গঞ্জে সাধারণ ছোট ছোট সভায় ধারাবাহিক বক্তব্য রাখতেন।

রায়সাহেবের আদর্শ ও কর্মপদ্ধতি গ্রামের মানুষের মধ্যে আদর্শরূপে গেঁধে রয়েছিল। বর্তমান পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে জন সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে সেখানেও সর্বাগ্রে শিক্ষাকে প্রথম স্থান দেওয়া হয়েছে। তদানীন্তন অনুন্নত অখন্ড উত্তরবঙ্গে শিক্ষাবিস্তারের জন্য আন্দোলন করে তিনি হয়েছেন এই অঞ্চলের ‘বিদ্যাসাগর’। বিদ্যাসাগরের মতোই তিনি সংস্কৃতে দক্ষ এবং ইংরেজিতে পারদর্শী ছিলেন। স্ত্রী-শিক্ষা প্রচারে এবং স্ত্রী-সম্মান রক্ষার্থে তাঁর দান বিদ্যাসাগরের চাইতে কম নয়। অথচ এই শিক্ষা আন্দোলনের জন্য করদমিত্র রাজ্য কুচবিহার-প্রশাসন থেকে সেরকম উৎসাহ বা উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়নি।

সেই সময় রংপুর ছিল সর্বাঙ্গীণভাবে রাজবংশী ক্ষত্রিয় সমাজের প্রতীকী শহর। অন্যবর্গের জমিদারগনের রংপুরের ক্ষত্রিয় সমাজের জমিদাররাও ছিলেন বিদ্যোৎসাহী ও সমাজ কল্যাণমুখী। এই বিষয়ে শ্যামপুরের খাজাঞ্চি, ডিমলার কামিনীকুমার সিংহ রায়, সদ্য পুষ্করিণীর প্রসন্ননাথ চৌধুরী, শিমূলবাড়ির হরিকিশোর বর্মা, প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যে প্রতিবাদী সামাজিক আন্দোলনের জন্য সমগ্র রাজবংশী সমাজ আন্দোলিত হয়েছিল তার হৃৎপিন্ড ছিলি এই রংপুর।

দিনাজপুরে পঞ্চানন বর্মার ক্ষত্রীয় আন্দোলন দেরীতে শুরু হলেও সেই জেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিবৃন্দ যথাক্রমে প্রেমহরি বর্মণ, শ্যামাপ্রসাদ বর্র্মণ, গোবিন্দচন্দ্র রায়, কবি নবদ্বীপচন্দ্র বর্মণ, বিশিষ্ট কমিউনিস্ট কর্মী ও বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য শ্রী রূপনারায়ণ রায় প্রমুখ রায় সাহেবের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে সমাজকে আন্দোলনের পথ এগিয়ে নিয়ে যান। ১৯২১ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্য্ন্ত রায় সাহেবের পঞ্চাননের তাঁর Political life ছিল অত্যন্ত active নিজের জাতিসত্তার বিকাশ ও উন্নয়ন করতে গেলে সমাজের অন্যান্য শ্রেণিরও বিকাশ প্রয়োজন, এই উপলব্ধি তাঁর বরাবর প্রখর ছিল।

১৯৯২ সালে বিধান পরিষদে চা-বাগানের শ্রমিকদের নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। বঙ্গীয় আবগারী আইন সংশোধনের প্রস্তাব করেন। জেলা-মহকুমার ম্যাজিষ্ট্রেটদের আঞ্চলিক ভাষায় দক্ষতা আনার বিষয়ে প্রস্তাব করেন ১৯২৩ সালে। তৎকালীন সরকার প্রাথমিক শিক্ষার চাইতে মধ্যশিক্ষার গুরুত্ব দিতে চাইলে তিনি আপত্তি করে বলেন- “I beg to oppose all these motions, Primary education is a necessity of the day, but it seems more attention is paid by government to secondary Education than to primary education….. I say that primary education is an ablolute necessity.” সাধারণ মানুষ থানাতে নালিশ করতে যেতে ভীষণ ভয় পেতেন। এই বিষয়টিকে সহজ করার জন্য তিনি নানা উদাহরণ দিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বিধান পরিষদে। বিধান পরিষদের সদস্যরূপে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁকে মানবতাবাদী রাজনীতিবীদের উচ্চস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।

পঞ্চানন বর্মা মৃত্যুকালে যে ব্যক্তিকে অত্যন্ত গুরু দায়িত্ব সহকারে ভারপ্রাপ্ত করে রেখেছিলেন, তিনি উপেন্দ্রনাথ বর্মণ। উত্তরবঙ্গের জন সমাজে উপেন্দ্রনাথের এই অন্বেষণের সোনালী ফসল হ’ল ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার জীবনচরিত, ক্ষত্রিয় জাতির ইতিহাস, প্রবাদ-প্রবচন ও হেঁয়ালী, জল্লেশ মহাপীঠ, উত্তরবাংলার সেকাল ও আমার জীবনস্মৃতি প্রভূতি। বহু সংবাদপত্রে, স্মারক পত্রিকায় সাময়িক পত্রে ও গ্রন্থে তাঁর মূল্যবান লেখা প্রকাশিত হয়েছে।”

গবেষক, লেখক, রাজনীতিবিদ যে কোনভাবেই তাঁর মূল্যায়ন করি না কেন সব ক্ষেত্রেই উপেনবাবুর উজ্জ্বল জ্যোতি অম্লান। মন্ত্রীসভায় তাঁর সততার কথা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দিনলিপিতে পাওয়া যায়। স্বীয়-শক্তির উপর গভীর আস্থা রেখে চারপাশের সমাজকে আত্মমর্যদায় স্বনির্ভ্রর করে তুলতে তিনি প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেছিলেন।

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ রংপুর শাখা পত্রিকা গ্রন্থাদি প্রকাশনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে পত্রিকা সমিতি গঠন করে। এই সমিতিতে থাকেন যথাক্রমে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, ভবানী প্রসন্ন লাহিড়ী, সুরেশচন্দ্র রায়চৌধুরী, পঞ্চানন সরকার এবং হরগোপাল দাস কুন্ডু। এঁদের মধ্যে শ্রী পঞ্চানন সরকার (বর্মা) মহাশয়কে সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তিনি সম্পাদক হয়েই তৎকালীন বৃহৎ উত্তরবঙ্গের লুপ্তপ্রায় সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি ও দুষ্পাপ্য পুঁথির সম্পাদনায় মনোনিবেশ করেন।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৭ সালে তাঁর লোকসাহিত্য গ্রন্থ প্রকাশ করেন এবং বাংলাদেশের অবহেলিত গ্রাম সাহিত্যের প্রতি বিজ্ঞজনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অনুরূপভাবে রায়সাহেব প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে প্রবাদ-প্রবচন (কথা ও ছিল্কা), রূপকথা ‘নাদিম পরামানিকের পাঁঠা’, জগন্নাথ বিলাই, মহিলা ব্রত’, ‘বাহা সে বা্ন্ধব’ ইত্যাদি পল্লীসাহিত্যকে নিভৃত অঞ্চল থেকে জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। কারণ এই সকল লোকসাহিত্যেই জীবনধারার পরস্পরকে খুঁজে পাওয়া যায়।

তিনি নিষ্ঠাবান গবেষকের মতো গোবিন্দ মিশ্রের গীতা আবিষ্কার করেন। দ্বিজলোচনের ‘চন্ডিকা বিজয়’ কাব্যকানি আবিষ্কার করে বিদগ্ধ মহলে বিষ্ময়ের সৃষ্টি করেন। ‘গোপীচন্দ্রের গান’ গ্রন্থে শব্দার্থ নিরূপণে সহায়তা করার জন্য গ্রন্থটির প্রথম সংস্ককরণের ভূমিকায় শ্রী বিশ্বেশ্বর ভট্টাচার্য্ মহাশয় এই মনীষী পঞ্চাননের নিকট কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। মৌলিক সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিশেষ ছাপ রেখে গেছেন বিভিন্ন কবিতায়। ‘ডাংধরী মাও’, ‘বেটাছাওয়ার প্রতি’ কবিতাগুলি রচনা করে যুব সমাজকে সামাজিক আন্দোলনের অনুকূলে উজ্জীবিত করে তুলেছিলেন। নানাবিধ স্বার্থক ভূমিকায় বাঙ্গালি চিন্তাবিদদের নক্ষত্র সভায় যেমন তিনি আলোকিত, তেমনি অন্যদেরকও উজ্জ্বল করেছিলেন আমাদের রায়সাহেব পঞ্চানন।

(লেখক পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একজন সাবেক যুগ্মসচিব)। এছাড়াও তিনি বিশিষ্ট লোক সাহিত্য গবেষক এবং দেশে-বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন।

 

মুক্তসংবাদ প্রতিদিন / কে. আলম

শুভ জন্মদিন বঙ্গবন্ধু


মুক্তসংবাদ প্রতিদিন:
বুধবার, ১৭ মার্চ, ২০২১, ১০:১১
শুভ জন্মদিন বঙ্গবন্ধু

ফাইল ফটো:

আজ ১৭ মার্চ, শুভ জন্মদিন বঙ্গবন্ধু! প্রতি বছর এ দিনটি আমার একান্ত ভাবনার দিন, আনন্দ ও বেদনায় আপ্লুত স্মরণীয় দিন। কেন আনন্দ-বেদনা? নিজের মনে গুঞ্জরিত এ প্রশ্নের উত্তর মনের মধ্যেই আছে। আনন্দ এ জন্য যে, ১৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্ম হয়। বেদনা এ জন্য যে, আপনার কথা ভাবলে গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়কের চরিত্রের করুণ পরিণতির কথা মনে পড়ে যায়। আপনার মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তোলা একটি ছবির দিকে তাকিয়ে আমার দুই চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। কী অনবদ্য ভঙ্গিতে বসে আছেন আপনি! মুখে পরম তৃপ্তির কোনো রহস্যময় ঈষৎ হাসি ছড়িয়ে আছে। ছবিটির দিকে তাকিয়ে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, কী ভাবছেন আপনি? দেশের কথা? দেশের মানুষের কথা? নাকি অন্য কিছু? আপনার বসার টেবিলের পাশেই আমি তখন দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভাবতে পারিনি, পরিচিত বা অপরিচিত কারও তোলা ছবিটি প্রতিটি ১৭ মার্চে আমাকে এভাবে আনন্দ-বেদনায় মগ্ন করে রাখবে।

আপনাকে আমি চিনতাম ও জানতাম স্কুলে ছাত্রাবস্থা থেকে। প্রথম চাক্ষুষ দেখা পাই ১৯৬২ সালে প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত কচি-কাঁচার মেলার এক অনুষ্ঠানে। আপনি মেলার সদস্যদের উদ্দেশে একটি বক্তব্য রেখেছিলেন। ৬০ বছর পরে সে বক্তৃতার কথাগুলো খুব একটা মনে থাকার কথা নয়। ভালোভাবে লেখাপড়া করার জন্য ও দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হওয়ার জন্য আপনি শিশু-কিশোরকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কচি-কাঁচার মেলার সদস্যরা আপনাকে গার্ড অব অনার দিয়ে নিজেরা গৌরবান্বিত হয়েছে। কচি-কাঁচার মেলার চারজন সদস্য- সদ্যপ্রয়াত খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, বাংলা একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খান, শিল্পী হাশেম খান ও আমি ছিলাম আপনার একান্ত ভক্ত ও অনুরক্ত। দাদাভাই রোকনুজ্জামান খান গর্বভরে বলতেন, ‘কচি-কাঁচার মেলার সদস্যদের কেউ রাজাকার হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অনেকে আত্মদান করেছে’। মুক্তিযুদ্ধকালে দৈনিক ইত্তেফাক ও কচি-কাঁচার আসরের অফিসটিকেও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আপনার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হলো ষাটের দশকের মাঝামাঝি পুরানা পল্টনের আওয়ামী লীগ অফিসে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু শেখ ফজলুল হক মনি তার হোন্ডার পেছনে আমাকে তুলে আপনার সঙ্গে পরিচয় করাতে নিয়ে যান। খুব কম সময়ই ছিলাম আপনার সামনে। কিন্তু আমার ক্ষুদ্র জীবনে সেটা ছিল এক মাহেন্দ্রক্ষণ। ওই দিনটির স্মৃতি মনের মণিকোঠায় চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে আছে। আরও অনেক স্মৃতি আছে আমার। মুক্তিযুদ্ধকালে আমি মুজিবনগর সরকারের তথ্য বিভাগে চাকরিরত ছিলাম। তারই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী আমাকে বঙ্গভবনে ডেকে নেন। ওই সময়ের একটি ছোট্ট স্মৃতি আমার খুবই মনে পড়ে। ১৯৭২ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে দেখতে ৩২ নম্বরের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সঙ্গে আমিও ছিলাম। দুদিন পরে বঙ্গবন্ধু বঙ্গভবনে এলেন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে। বঙ্গবন্ধুকে গাড়িতে তুলে দিতে সামরিক সচিব ও আমি করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, মাহবুব! কাল তোমারে দেখেছি!

আমি সবিস্ময়ে বললাম, কোথায় স্যার? তুমি কালকে টেলিভিশনে আসছিলা। বঙ্গবন্ধু বললেন।

কী আশ্চর্য! এটা কি একটা বলার কথা হলো আমার মতো নগণ্য একজন সরকারি কর্মকর্তাকে? সেদিন বুঝতে পারিনি। পরে বুঝতে পেরেছি, এমন ছোটখাটো ঘটনাও দৃষ্টি এড়ায় না তাঁর। এজন্যই তো তিনি বঙ্গবন্ধু!

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ ত্যাগ করে রাষ্ট্রপতি হন। সেদিনই তিনি আমাকে ডেকে বলেছিলেন, ‘তুমি আমার সঙ্গে থাকবা।’ এরপর তাঁর মৃত্যুদিন পর্যন্ত আমি বঙ্গবন্ধুর অধীনে তাঁর সহকারী প্রেস সচিব নিয়োজিত হই। প্রেস সচিব ছিলেন আবদুল তোয়াব খান। ২৫ জানুয়ারি থেকে ওই বছর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময় খুব বেশি নয়। কিন্তু ওই সময়টুকু বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আমার জীবনের গৌরবগাথা। তাঁর সঙ্গে অনেক স্মৃতি আছে এ সময়ের, যার কিছু ঘটনা আমার ‘বঙ্গভবনে পাঁচ বছর’ বইয়ে উল্লেখ করেছি। এর মধ্যে আছে বঙ্গবন্ধুর পিতার চল্লিশায় টুুঙ্গিপাড়া যেতে ‘গাজী’ জাহাজে মধ্যরাতে নিজের মাথার বালিশ আমার মাথার তলে দিয়ে দেওয়া, টাঙ্গাইলে ভাসানী সাহেবের বাড়ি থেকে খুলনায় তাঁর ভাই শেখ নাসেরের বাড়িতে যাওয়ার পথে অভুক্ত আমাকে খাবার প্রদানের জন্য হেলিকপ্টারের কর্মকর্তাদের নির্দেশ, বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর অনুলেখক হিসেবে কাজ করার সময় একান্ত স্মৃতিচারণা, ১৪ আগস্টে ৩২ নম্বরের বাসায় যাওয়ার আগে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার শেষ কথোপকথন, আরও কত কী!

স্বাধীন বাংলাদেশে আপনার প্রথম জন্মদিন উদযাপনের স্মৃতি চিরকাল মনে থাকবে। ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ সকাল ১০টায় তেজগাঁও বিমানবন্দরে নামল ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ বিমান ‘রাজহংস’। ভারতরত্ন ইন্দিরা সর্বপ্রথম অবতরণ করলেন। তারপর নামলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং এবং পরে অন্য অতিথিবৃন্দ। বিমানবন্দরে ইন্দিরাকে ফুলের মালা পরিয়ে অভ্যর্থনা জানান শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব। বিকাল ৩টায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভাষণ দিলেন ইন্দিরা গান্ধী। ময়দানের একপাশে নৌকার আকারে বিশাল মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে ‘ইন্দিরা মঞ্চ’ নামে। বিশাল জনসমুদ্রকে সামনে রেখে ইন্দিরা গান্ধী প্রথম দুই মিনিট বাংলায় বক্তৃতা দেন, পরে বাংলায় দীর্ঘ বক্তৃতাদানে অক্ষমতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে হিন্দিতে বক্তৃতা করলেও কবিগুরুর কবিতার দুটি চরণ আবৃত্তি করেন। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চল রে।’

ইন্দিরা গান্ধীকে আমি প্রথম দেখি ১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর কলকাতার প্যারেড গ্রাউন্ডে। বক্তৃতায় মাঝখানে ছেদ পড়ল, দিল্লি থেকে খবর এসেছে পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করেছে। তার পরের ঘটনা তো সবারই জানা। স্বাধীনতার পর এবার বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গভবনে ছিলেন। তাঁর আরাম-আয়েশের জন্য আমাদের যথাসাধ্য প্রচেষ্টা ছিল। বঙ্গভবনের একজন অফিসার হিসেবে তখন তাঁকে কাছে থেকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখতে পাই। আরও কাছে থেকে দেখতে পাই ওই বছর নভেম্বর-ডিসেম্বরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ভারতে রাষ্ট্রীয় সফরকালে রাষ্ট্রপতি ভবনে এবং পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনে। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে ঢাকায় এসে তিন দিন বঙ্গভবনে ছিলেন তিনি। দেশে ফেরার আগে বঙ্গভবনের অফিসারদের কিছু উপহার দিয়েছিলেন। আমি পেয়েছিলাম ভারতীয় র-সিল্কের একপ্রস্থ কাপড়। পরে তা দিয়ে একটা পাঞ্জাবি তৈরি করাই। সব মিলিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর প্রথম জন্মদিনটি চিরকালই আমার স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে।

আবার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ। ব্যক্তিগত একটি ঘটনার কথা মনে হলে আমার মন সঙ্কুচিত হয়ে যায়। কথাটা সঙ্গতকারণে আগে কাউকে বলিনি। সেটাও ১৯৭৫ সালের ঘটনা। আমরা হেলিকপ্টারে বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধনের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে যাই। ফেরার পথে আমি চট্টগ্রামে ব্যক্তিগতভাবে দুই দিনের যাত্রাবিরতি করি। চট্টগ্রাম নিউমার্কেট থেকে আমি চাকচিক্যময় একটা স্যুটপিস কিনি। স্যুট বানিয়ে ওটা পরে অফিসে যেতে বঙ্গবন্ধুর সামনে পড়ে যাই। তিনি আমাকে পোশাক সম্পর্কে কিছু না বললেও আমার এক সহকর্মীকে বলেন, অত জমকালো পোশাক যদি কাউকে সাধারণ মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, সেটা কি ঠিক? কথাটা জানার পর পোশাকের বিষয়ে আমি সাবধান হয়ে গিয়েছিলাম। এই একটি ঘটনা ছাড়া বঙ্গবন্ধু আমাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আর কখনো ভর্ৎসনা করেননি।

আজ সবচেয়ে মনে পড়ছে বঙ্গবন্ধুর শেষ জন্মদিনটির কথা। ১৯৭৫ সালের ১৬ মার্চ আমাকে ডেকে বললেন, ‘তুমি তো কচি-কাঁচা! তুমি কাল আমার বাসায় আসবা। আমি যে এক সময়ে শিশু-কিশোর সংগঠনের কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার প্রথম আহ্বায়ক ছিলাম, কথাটা তিনি জানতেন। এজন্য আমাকে কচি-কাঁচা বলে সম্বোধন করেছেন এবং তাঁর জন্মদিনে বিশেষভাবে উপস্থিত থাকতে বলেছেন। দিনটি বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোরের সঙ্গে কাটাবেন। ছোটদের সান্নিধ্য তিনি যে কতটা ভালোবাসেন, তা সবাই জানে। ১৭ মার্চ সকালবেলা ৩২ নম্বরের বাড়িতে পৌঁছে গেলাম। বঙ্গবন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে তিনি শুধু মাথা ঝাঁকিয়ে হাসলেন। এত প্রাণোচ্ছল বোধহয় তাকে খুব কমই দেখেছি। নিজের জন্মদিন বলেই হয়তো তিনি খুশিতে উচ্ছল হয়েছিলেন। আমার বারবার মনে হচ্ছিল, জন্মদিন বলেই কী তিনি ছেলেবেলার কথা মনে করে একেবারে শিশু হয়ে গেছেন?

৩২ নম্বরের বাসায় তখনো তেমন জনসমাগম হয়নি। শেখ কামাল এসে মিষ্টির প্লেট তুলে দিলেন হাতে। জিজ্ঞাসা করলেন, মাহবুব ভাই, নাশতা করেছেন তো? না করে থাকলে আমার সঙ্গে একটু আসেন। আমি জানালাম, নাশতা করেই এসেছি। একটু পরে মন্ত্রী এম কোরবান আলী এলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন জানালেন। বিগলিত হাসি দিয়েই অভিনন্দনের উত্তর দিলেন বঙ্গবন্ধু। সেদিন সকাল বেলায়ই ‘বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলার’ ছোটমণিদের নিয়ে এসেছেন দৈনিক বাংলার ‘শাপলা কুঁড়ির আসর’-এর পরিচালক বিমান ভট্টাচার্য। বঙ্গবন্ধু আগত শিশুদের গাল ছুঁয়ে আদর করলেন। তাদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠলেন। পরে অন্যান্য সংগঠনের শিশু-কিশোররাও এলো। ৩২ নম্বরের বাড়ির গেটের বাইরে তখন অগণিত নেতা-কর্মী ও ভক্তদের ভিড়। তারা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাতে সমবেত হয়েছেন। ভিতরে আসতে পারছেন না। বঙ্গবন্ধু বলে দিয়েছেন, তিনি আগে ছোটদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।

আজ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এ দুটি গৌরবময় সময়ের মোহনায় দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবিটির দিকে আবার তাকিয়ে দেখছি। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে একটি সংবিধানও দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের সংবিধানে ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা’র আদর্শ মূলনীতি হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল। সে চারটি মূলনীতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে আজ। বঙ্গবন্ধুর ছবিটির দিকে তাকিয়ে আমার বারবার মনে হচ্ছে, কী ভাবছেন বঙ্গবন্ধু? দেশের কথা না, দেশের মানুষের কথা? এর বাইরে তাঁর তো কোনো ভাবনা ছিল না। আমার মতে, বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করার পাশাপাশি অনুসরণ করা প্রয়োজন ছিল। আমরা কি তা পেরেছি? আজ এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর ছবির দিকে তাকিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা হচ্ছে- ‘আপনি কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলেন?’

লেখক: নির্বাচন কমিশনার, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। উৎস: বাংলাদেশ প্রতিদিন

মুক্তসংবাদ প্রতিদিন / কে. আলম
Share on Facebook

মুক্তসংবাদ প্রতিদিন এর জনপ্রিয়

সর্বশেষ - শিল্প ও সাহিত্য