ঢাকা শুক্রবার, ৩ আষাঢ় ১৪২৮, ১৮ জুন, ২০২১
Mukto Sangbad Protidin

ড. আলাউদ্দিন আল আজাদের আজ জন্মদিন


হানিফ, মুক্তসংবাদ প্রতিদিন: বৃহস্পতিবার, ০৬ মে, ২০২১, ০৭:৪৮
ড আলাউদ্দিন আল আজাদের আজ জন্মদিন
ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ । ফাইল ছবি

 

বাংলাদেশ ও বিশ্বের সাহিত্য ভাণ্ডারে আলাউদ্দিন আল আজাদ এক বিশেষ শ্রদ্ধেয় নাম। ভাষাসৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট কবি, সব্যসাচী লেখক, শিক্ষাবিদ ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। আলাউদ্দিন আল আজাদ বাংলাদেশের তথা সারা বিশ্বের সাহিত্য জগতের দীপ্তিমান প্রতিভা, মহান ব্যক্তিত্ব ও স্বকীয় মহিমায় উদ্ভাসিত এক নিরীক্ষাধর্মী সাহিত্যশিল্পী।

আলাউদ্দিন আল আজাদ ১৯৩২ সালের ৬ মে বৃহত্তর ঢাকার বর্তমানে নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার রামনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা গাজী আব্দুস সোবহান এবং মাতার নাম মোসাঃ আমেনা খাতুন। আলাউদ্দিন আল আজাদ অভিজাত, বনেদি ও সাংস্কৃতিক পরিবারে জন্ম নিলেও শৈশবটা তেমন সুখকর ছিল না। মাত্র দেড় বছর বয়সে মাকে হারান এবং দশ বছর বয়সে বাবা ইন্তেকাল করেন। আর তখন থেকেই শুরু প্রায় সর্বহারা আজাদের সংগ্রামশীল জীবনের।  

আলাউদ্দিন আল আজাদ ছিলেন প্রগতিশীল লেখক, বামপন্থী চিন্তাধারা ও কর্মকাণ্ডের সাথে তিনি নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। বামপন্থী রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনে এবং প্রগতিশীল সাহিত্য-আন্দোলনে আলাউদ্দিন আল আজাদের সাহসী ভূমিকা আজ অনেকেই ভুলে গেছেন। কিন্তু পথে-মাঠে-ময়দানে ও শিল্পকর্মে আলাউদ্দিন আল আজাদ মার্ক্সসীয় ভাবধারাকে সমুন্নত রাখার জন্য ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছেন। আলাউদ্দিন আল আজাদ তার প্রকৃত নাম নয়। আলাউদ্দিনের সাথে যুক্ত হয়েছে লেখক নাম 'আল আজাদ'। আর তাঁর ডাক নাম ছিল 'বাদশা'। শৈশবে তিনি বাবা-মাকে হারান; আর এখান থেকেই শুরু হয় তার জীবনসংগ্রাম। গ্রামজীবনের কৃষিভিত্তিক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা ছিল তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী।

আলাউদ্দিন আল আজাদ ১৯৪৯ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে অইএ পাস করেন। ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম এবং ১৯৫৪ সালে প্রথম শ্রেণীতে এমএ পাস করেন। ১৯৫৫ সালে তোলারাম কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ঈশ্বরগুপ্তের জীবন ও কবিতা বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। 

পরবর্তীকালে সিলেট এমসি কলেজ, চট্টগ্রাম কলজসহ পাঁচটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা এবং পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপালও ছিলেন। পেশাগত জীবনে মস্কোর বাংলাদেশ দূতাবাসে সংস্কৃতি উপদেষ্টা, শিক্ষা সচিব, সংস্কৃতিবিষয়ক বিভাগ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রেই ছিল তার পদচারণা। তাঁর রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৪৯টি। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাসমূহঃ

১। তেইশ নম্বর তৈলচিত্র (১৯৬০),
 ২। শীতের শেষরাত বসন্তের প্রথম দিন (১৯৬২), 
৩। কর্ণফুলী (১৯৬২),
 ৪। ক্ষুধা ও আশা (১৯৬৪),
 ৫। খসড়া কাগজ (১৯৮৬), 
৬। শ্যাম ছায়ার সংবাদ (১৯৮৬), 
৭। জ্যোৎস্নার অজানা জীবন (১৯৮৬), 
৮। যেখানে দাঁড়িয়ে আছি (১৯৮৬), 
৯। স্বাগতম ভালোবাসা (১৯৯০), 
১০। অপর যোদ্ধারা (১৯৯২), 
১১। পুরানা পল্টন (১৯৯২), 
১২। অন্তরীক্ষে বৃক্ষরাজি (১৯৯২), 
১৩। প্রিয় প্রিন্স (১৯৯৫), 
১৪। ক্যাম্পাস (১৯৯৪), 
১৫। অনূদিত অন্ধকার (১৯৯১), 
১৬। স্বপ্নশীলা (১৯৯২), 
১৭। কালো জ্যোৎস্নায় চন্দ্রমল্লিকা (১৯৯৬),
 ১৮। বিশৃঙ্খলা (১৯৯৭)

গল্প গ্রন্থঃ 
১। জেগে আছি,
২। ধানকন্যা, 
৩। মৃগনাভি,
৪। অন্ধকার সিঁড়ি,
৫। উজান তরঙ্গে, 
৬। যখন সৈকত, 
৭। আমার রক্ত স্বপ্ন আমার

কাব্য গ্রন্থঃ 
১। মানচিত্র, 
২। ভোরের নদীর মোহনায় জাগরণ, 
৩। সূর্য জ্বালার স্বপন,
৪। লেলিহান পান্ডুলিপি

নাটকঃ
১। এহুদের মেয়ে, 
২। মরোক্কোর জাদুকর,
৩। ধন্যবাদ, 
৪। মায়াবী প্রহর, 
৫। সংবাদ শেষাংশ। 

রচনাবলীঃ শিল্পের সাধনা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের ওপর লেখা বই "ফেরারী ডায়েরী (১৯৭৮)"

দেশবরেণ্য এই গুণীকবি বিভিন্ন সময় নানান ধরনের পুরস্কার লাভ করেছেন তার ভিতর উল্লেখযোগ্য কিছু হলো:
বাংলা একাডেমি পুরস্কার ১৯৬৪, ইউনেস্কো পুরস্কার ১৯৬৫, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ১৯৭৭, আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার ১৯৮৩, আবুল, মনসুর আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার ১৯৮৪, লেখিকা সংঘ পুরস্কার ১৯৮৫, রংধনু পুরস্কার ১৯৮৫, অলক্তা, সাহিত্য পুরস্কার ১৯৮৬, একুশে পদক ১৯৮৬, শেরে, বাংলা সাহিত্য পুরস্কার ১৯৮৭, নাট্যসভা ব্যক্তিত্ব, পুরস্কার ১৯৮৯, কথক একাডেমী পুরস্কার ১৯৮৯ এবং
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ স্বর্ণ পদক ১৯৯৪।

দেশবরেণ্য এই কবি ২০০৯ সালের ৩রা জুলাই মৃত্যুবরণ করে।

মুক্তসংবাদ প্রতিদিন / কে. আলম

চিন্তা ও মননে এক আধুনিক মানুষের নাম দুর্গেশ চন্দ্র পত্রনবীশ


এমএস.প্রতিদিন ডেস্ক:
সোমবার, ১২ এপ্রিল, ২০২১, ১০:১১
চিন্তা ও মননে এক আধুনিক মানুষের নাম দুর্গেশ চন্দ্র পত্রনবীশ

দুর্গেশ চন্দ্র পত্রনবীশ

দুর্গেশ চন্দ্র পত্রনবীশ! নেত্রকোণার মানুষের কাছে 'লালুবাবু' হিসেবেই অধিক পরিচিতি। ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব, সাহিত্যিক, নাট্যাভিনেতা, সাংবাদিক,  শিক্ষক এবং খ্যাতি অর্জন করেছিলেন আইনজীবী হিসেবে। জীবনকে ছড়িয়েছেন এবং জড়িয়েছেন নানা মাত্রায়, নানা আঙিনায়।

ছিমছাম একহারা গড়নের প্রখর ব্যক্তিত্বের মানুষ ছিলেন দুর্গেশ চন্দ্র পত্রনবীশ। ১৯২১ সালের ১২ই এপ্রিল ময়মনসিংহ শহরের গিরীশ চক্রবর্তী রোডে মাতামহ আইনজীবী শরৎচন্দ্র অধিকারীর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন দুর্গেশ চন্দ্র পত্রনবীশ। মূল নিবাস নেত্রকোণা জেলার মদন উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের বাড়রি গ্রামে। 

পিতা স্বর্গীয় রমেশচন্দ্র পত্রনবীশ, মাতা স্বর্গীয়া লাবন্য প্রভা দেবী। তাঁর পিতাও ছিলেন আইনজীবী এবং নেত্রকোণা শহরের নিউটাউনস্থ নিজ বাসভবনে থেকেই আইনপেশায় যুক্ত ছিলেন তিনি। পাঁচ ভাই (শৈলেশ চন্দ্র পত্রনবীশ, জিতেশ চন্দ্র পত্রনবীশ, দুর্গেশ চন্দ্র পত্রনবীশ, ভবেশ চন্দ্র পত্রনবীশ, জ্ঞানেন্দ্র চন্দ্র পত্রনবীশ) এবং দুই বোন (অতশী রায় ও নীলিমা চক্রবর্তী।) এর মধ্যে সন্তান হিসেবে চতুর্থ ও ভাইদের মধ্যে তৃতীয় দুর্গেশ চন্দ্র পত্রনবীশ।
 
মানুষের ভেতর একটি আহবান আছে। সেই আহ্বান রবীন্দ্রনাথের কথায়, 'দুর্গম পথের ভেতর দিয়ে পরিপূর্ণতার দিকে, অসত্যের থেকে সত্যের দিকে, অন্ধকার থেকে জ্যোতির দিকে, মৃত্যুর থেকে অমৃতের দিকে, দুখের মধ্যে দিয়ে, তপস্যার মধ্যে দিয়ে।' এই আহবান মানুষকে কোথায়ও থামতে দেয় না, 'চিরপথিক' করে রেখে দেয়।  দুর্গেশ পত্রনবীশ এই ডাক শুনতে পেয়েছিলেন। পেয়েছিলেন বলেই রয়ে গেলেন 'চিরপথিক' হয়ে। তাঁর জীবনাচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এই সত্যটি সহজেই বুঝা যায়। 

দুর্গেশ চন্দ্র পত্রনবীশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু নিজ গ্রামের বাড়রি স্কুলে (বর্তমানে বাড়রি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়)। সেখান থেকে প্রথম শ্রেণির পাঠ শেষ করে ১৯২৮ সালে নেত্রকোণা শহরের তৎকালীন খ্যাতনামা বিদ্যাপীঠ চন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেনীতে ভর্তি হয়ে এ বিদ্যালয় থকেই ১৯৩৭ সালে প্রথম বিভাগে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। এরপর ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে প্রথম বিভাগে আইএ এবং ১৯৪১ সালে বিএ পাশ করেন। 

রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় থাকায় মাঝখানে কয়েক বছর লেখাপড়ায় ছেদ পড়ে। '৪৭ এর দেশ বিভাগের পর রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে কলকাতার দমদম কারাগারে বন্দি অবস্থাতেই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ১৯৫২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাশ করেন দুর্গেশ পত্রনবীশ।
 
এর এক যুগ পর ১৯৬৪ সালে ঢাকা সিটি ল' কলেজ থেকে এলএলবি পাশ করে নেত্রকোণা বারে যোগ দিয়ে  আইনজীবি হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং দীর্ঘ ৪৫ বছর আইন পেশায় যুক্ত থেকে আইনজ্ঞ হিসেবে নিজেকে উত্তীর্ণ করেছিলেন ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠানে। দুর্গেশ চন্দ্র পত্রনবীশ ১৯৬০ সালে বগুড়ার এক রাজনৈতিক ঐতিহ্যবাহী পরিবারের কন্যা মিনতি ভট্টাচার্যের (পরবর্তীতে পত্রনবীশ) সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বৃটিশ খেদাও আন্দোলন, পাকিস্তান বিরোধী সংগ্রামে সেই পরিবারেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। এখনো প্রগতিশীল লড়াই সংগ্রামে সেই পরিবার বগুড়ায় অগ্রণী ভুমিকা পালন করে। 

মিনতি ভট্টাচার্যের বাবার নাম ঋষিকেশ ভট্টাচার্য, মা সুষমা ভট্টাচার্য। বাবা ছিলেন আইনজীবী। এগার ভাই বোনের মধ্যে (৫ বোন ৬ ভাই) চতুর্থ সন্তান মিনতি ভট্টাচার্য আই এ পাশ করে বগুড়া ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বালিকা বিদ্যালয়ে এক যুগের অধিক সময় শিক্ষকতা করেন। 

দুর্গেশ চন্দ্র পত্রনবীশ কৈশোর ও যৌবন কাটিয়েছেন এমন একটি কালে যে সময়টিকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন 'অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগ'। একদিকে রাশিয়ায় সংঘটিত অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবারের মত মানুষের উপর মানুষের শোষনের অবসান ঘটিয়ে মানবমুক্তির অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায়, অন্যদিকে এর অভিঘাতে ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষনের নিগড়ে আবদ্ধ দেশোগুলোতে স্বাধীনতার আকাঙ্খা অভাবনীয়ভাবে তীব্র গতি লাভ করে। আর এর প্রভাবে এই সব দেশের মানুষের চেতনাগত উৎকর্ষতা এক অন্যমাত্রায় উত্তীর্ণ হয়। 

যেকোনো ধরনের ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত হয়ে যায় তারা। ভারতীয় উপমহাদেশেও এর ঢেউ এসে লাগে ভালোভাবেই। অহিংস অসহযোগ, খেলাফত আন্দোলন, ভারত ছাড় আন্দোলনের পাশাপাশি বিপ্লবী লড়াই, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, নৌ বিদ্রোহ ইত্যাদির কারণে উপমহাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিত তখন টালমাটাল।
 
নেত্রকোণা শহরের নিউটাউনস্থ আইনজীবী পিতার বাসভবনে যাতায়াত ছিল তৎকালীন অনেক বিপ্লবীর। তাঁদের সংস্পর্শে এসে দেশপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত হন দুর্গেশ পত্রনবীশ এবং দেশমাতার মুক্তি ও শোষণের নিগড় থেকে মানুষকে মুক্ত করার সংগ্রামে যুক্ত করেন নিজেকে। দেশ তখন ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল ভালোভাবেই। এ সময় নিউটাউনের বাসায় বিপ্লবীদের আনাগোনায় তাঁর মধ্যে স্বদেশ চেতনার সাথে সাথে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারারও উন্মেষ ঘটে। 

তিনি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই মানুষের সার্বিক মুক্তির উপায় হিসেবে মনে করেন এবং যোগ দেন নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশনে, যে সংগঠনটি ছিল রেভ্যুলেশনারী সোশালিস্ট পার্টির (আরএসপি) সহযোগী ছাত্র সংগঠন।

নেত্রকোণায় তিনি আরএসপি'র শাখা গঠন করেন এবং  তাঁর কর্ম দক্ষতায় খুব দ্রুতই আরএসপি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নেত্রকোণায়। কর্মনিষ্ঠার কারণে দুর্গেশ পত্রনবীশ ১৯৪২ সালে যুক্তবাংলা ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। কলকাতায় গ্রেফতার হলেন দুর্গেশ পত্রনবীশ। দীর্ঘ চার বছর কারাভোগের পর মুক্তি পান।
 
১৯৫৪ সালে পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নেত্রকোণার দশটি এবং কিশোরগঞ্জের আটটি থানা নিয়ে গঠিত বর্ণ হিন্দুদের জন্যে সংরক্ষিত প্রাদেশিক পরিষদের একটি আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা  করেছিলেন দুর্গেশ পত্রনবীশ। তখন পৃথক নির্বাচন পদ্ধতি প্রচলিত ছিল পাকিস্তানে। ১৯৫৬ সালে আবার তিনি গ্রেফতার হন।
 
আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করার প্রাথমিক পর্যায়ে ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পুনরায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। একদিকে অতিরিক্ত পরিশ্রম অন্যদিকে বারবার কারাবাসের ফলে স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে এবং মারাত্মকভাবে যক্ষায় আক্রান্ত হন তিনি। তখন যক্ষা রোগের তেমন কোনো চিকিৎসা ছিল না; বলা হতো 'যার হয় যক্ষা, তার নাই রক্ষা।' এ অবস্থায় চূড়ান্ত ঝুঁকি নিয়ে ফুসফুসে অস্ত্রোপচার করা হয় তাঁর এবং ফুসফুসের আক্রান্ত একটি অংশের পাশাপাশি পাঁজরের তিনটি হাড় কেটে বাদ দেওয়া হয়। এ ঘটনা দুর্গেশ পত্রনবীশের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর সক্রিয় রাজনৈতিক  তৎপরতা থেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন নিজেকে।

আনন্দমোহন কলেজে অধ্যয়নকালীন ১৯৪০ সালে কলেজ ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৪৮-৪৯ সালে বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন কলকাতার সাউথ সুব্বার্ন হাইস্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন দুর্গেশ পত্রনবীশ। এরপর আবার তাঁকে কারাবরণ করতে হয় এবং ১৯৫৪ সালে কারাগার থেকে বের হয়ে করাচি থেকে প্রকাশিত 'গুডউইল' পত্রিকার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকাস্থ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন তিনি। ১৯৫৮ সালে তাঁর সম্পাদনায় ঢাকা থেকে  প্রকাশিত  হয় 'সাপ্তাহিক জনতা'।

সাহিত্য চর্চার সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন দুর্গেশ পত্রনবীশ। কলকাতা থেকে প্রকাশিত 'প্রবাসী' পত্রিকায় তাঁর লেখা গল্প, প্রবন্ধ 'দ,চ,প' ছদ্মনামে নিয়মিত প্রকাশিত হতো। সিদ্ধার্থ মৈত্র ছদ্মনামে লিখেন উপন্যাস 'মিরা মিত্র', যা ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় এবং বিদগ্ধ মহলে সাড়া জাগিয়েছিল। নেত্রকোণা থেকে প্রকাশিত 'উত্তর আকাশ' এবং 'সৃজনী' পত্রিকার সাথে যুক্ত থেকে সাহিত্যে চর্চায় যুক্ত থাকেন আজীবন।
 
শান্তিনিকেতনের বাইরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন প্রথম পালন করা হয়েছিল নেত্রকোণায়, রবীন্দ্র-স্নেহধন্য সংগীতাচার্য শৈলাজারঞ্জনের উদ্যোগে এবং আরেক প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি সত্যকিরণ আদিত্যের নেতৃত্বে, ১৯৩২  সালে। সেই উদ্যোগে অংশগ্রহণ করেছিলেন শিশু দুর্গেশ পত্রনবীশ এবং পরবর্তী সময়ে নেত্রকোণায় রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।
 
১৯৭৩-১৯৭৪ সালে নেত্রকোণা সাধারণ গ্রন্থাগারের সম্পাদক ছিলেন। ২০০০ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন নেত্রকোণা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি। বিশিষ্ট নাট্যশিল্পী হিসেবে ১৯৮৮ সালে নেত্রকোণা জেলা উদীচি শিল্পী গোষ্ঠী তাঁকে সম্মাননা প্রদান করে। নেত্রকোণা ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন দুর্গেশ পত্রনবীশ।  

এছাড়াও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, নেত্রকোণা শিল্পকলা একাডেমি, পাবলিক লাইব্রেরি ও ডায়াবেটিক সমিতির আজীবন সদস্য ছিলেন দুর্গেশ পত্রনবীশ। ছিলেন নেত্রকোণা 'ল' কলেজের খন্ডকালীন অধ্যাপক ও টিচার্স ট্রেনিং কলেজের আইন উপদেষ্টা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যুক্ত হয়েছিলেন ভিন্নধর্মী এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কাটলির অন্বেষা বিদ্যালয়ের সাথে। আমৃত্যু তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কমিটির সভাপতি ছিলেন। ছিলেন প্রত্যাশা সাহিত্য গোষ্ঠীর উপদেষ্টা।

২০০৭ সালের ২৯ নভেম্বর ৮৬ বছর বয়সে রাত আনুমানিক ৯.৩৪ এ নেত্রকোণার নিউটাউনস্থ বড়পুকুর পাড়ের নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী দুর্গেশ চন্দ্র পত্রনবীশ। মৃত্যুকালে স্ত্রী মিনতি পত্রনবীশ, দুই পুত্র শান্তনু পত্রনবীশ (আইনজীবী) এবং অতনু পত্রনবীশ(ব্যবসায়ী), দুই পুত্রবধূ এবং দুই নাতি ও এক নাতনিসহ অসংখ্য গুনগ্রাহী রেখে গিয়েছিলেন তিনি। গত ৩১ জানুয়ারি, ২০২১ দুপুর ৩টায় ৯১ বছর বয়সে না-ফেরার ভুবনে পাড়ি জমান স্ত্রী মিনতি পত্রনবীশ।

তিনি জীবনাচরণে, চিন্তা ও মননে ছিলেন আধুনিক, জীবন ঘনিষ্ঠ, দেশপ্রেমিক এবং আন্তর্জাতিকতাবাদী।


জন্মশতবার্ষিকীতে অপার শ্রদ্ধা---/স্বপন পাল

মুক্তসংবাদ প্রতিদিন / কে. আলম

গণপরিবহন চালুর দাবিতে রবিবার পরিবহন শ্রমিকদের বিক্ষোভ


এমএস.প্রতিদিন ডেস্ক:
শুক্রবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২১, ০৩:৫১
গণপরিবহন চালুর দাবিতে রবিবার পরিবহন শ্রমিকদের বিক্ষোভ

ফাইল ছবি

আগামী রবিবার (২ মে) গণপরিবহন চালুসহ তিন দফা দাবিতে বিক্ষোভ করবে পরিবহন শ্রমিকরা। শুক্রবার (৩০ এপ্রিল) সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন।
 
ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা ওসমান আলী তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, রমজান মাস প্রায় শেষের দিকে। সামনে ঈদ। এই অবস্থায় সড়ক পরিবহন এর প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিক কর্মহীন অবস্থায় থাকায় তাদের জীবিকা নির্ভর অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে। 

এই অবস্থায় সড়ক পরিবহন শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসলে তার দায়দায়িত্ব বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন বহন করবে না। এই প্রেক্ষিতে আমাদের তিন দফা দাবি মেনে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। আমাদের দাবিও কর্মসূচি হলো;

১. স্বাস্থ্যবিধি মেনে মোট আসনের অর্ধেক যাত্রী নিয়ে গণপরিবহনও পণ্য পরিবহন চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে।
২. সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের আর্থিক অনুদান ও খাদ্য সহায়তা প্রদান করতে হবে।
৩. সারা দেশে বাস ও ট্রাক টার্মিনালগুলোতে পরিবহন শ্রমিকদের জন্য ১০ টাকায় ওএমএস এর চাল বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে।

ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা ওসমান আলী আরও বলেন, আমাদের এই তিন দফা দাবি বাস্তবায়নে আগামী ২ মে রবিবার সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল এবং ৪ মে মঙ্গলবার সারাদেশে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে।

ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আরও বলেন, গণপরিবহন বন্ধ থাকার কথা থাকলেও আমরা লক্ষ্য করেছি যাত্রীরা অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও মিনি ট্রাক মোটর সাইকেলে স্বাস্থ্যবিধি নামেনি যাত্রী পরিবহন করছে। এমনকি নদীপথে স্পিডবোর্ড ও ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ধারণক্ষমতার চেয়ে চার গুণ বেশি যাত্রী এবং অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে যাত্রী বহন করা হচ্ছে। 

যাত্রীরা দূর-দূরান্তে চলাচলের জন্য করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি এবং অতিরিক্ত অর্থব্যয় করে নানান হয়রানির শিকার হয়ে যাতায়াত করছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন চালু করা হলে যাত্রীরা সব ধরনের ঝুঁকি ছাড়াই চলাচল করতে পারবেন। আমরা গণপরিবহন চলাচলের অনুমতি দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। শুধুমাত্র গণপরিবহন বন্ধ রেখে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ হবে না।

মুক্তসংবাদ প্রতিদিন / কে. আলম
Share on Facebook
×