a
ফাইল ছবি
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক মরণোত্তর চক্ষুদান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আজ শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে মরণোত্তর চক্ষুদানবিষয়ক এক অনুষ্ঠানে তিনি এ প্রতিশ্রুতি দেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে রোটারি ইন্টারন্যাশনাল ও সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি।
মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আমার মৃত্যুর পর চক্ষুদান করতে চাই। মৃত্যুর পর আমার চোখ যদি কারও কাজে আসে, তাহলে আমি খুশি হব।’
তিনি বলেন, ‘চক্ষুদানের মাধ্যমে অন্য কোনো ব্যক্তি দৃষ্টি শক্তি পেলে মানুষ মরেও বেঁচে থাকতে পারে। এটা সোয়াবের কাজ, ভালো কাজ এবং পুণ্যের কাজ। আমার মৃত্যুর পর চোখ কারও কাজে লাগলে ভালো লাগবে। এ চক্ষুদানকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে পারলে অনেক মানুষের উপকার হবে।’
মোজাম্মেল হক বলেন, ‘শহরের মানুষের মধ্যে অপেক্ষাকৃত মানবিকতা কম। সব কাজই নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা করে। অন্যদিকে গ্রামের মানুষ উদার। অন্যের জন্য কিছু করার চেষ্টা করে। তাই মরণোত্তর চক্ষুদান আন্দোলন উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছাতে পারলে ভালো সুফল পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা নিয়ে কর্নিয়া সংগ্রহ করা গেলে, অনেক মানুষ পৃথিবীর আলো দেখতে পারবে।’
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান লে. জে. (অব.) হারুন-অর-রশিদ, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ বরেন চক্রবর্তী, আমিনুল ইসলাম লিটু প্রমুখ।
দেশের প্রথম বিআরটির কিলোমিটারে ব্যয় ২০৮ কোটি টাকা
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছ থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বাস চলাচলের বিশেষ ব্যবস্থা ‘বাস র্যাপিড ট্রানজিট’ (বিআরটি) প্রকল্পের প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে ২০৮ কোটি টাকা। এত বেশি খরচ ধরা হলেও প্রকল্পের কাজ আট বছরেও অর্ধেক শেষ হয়নি। এখন প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়ানোর ফন্দি আঁটা হচ্ছে।
এদিকে, বিমানবন্দর এলাকায় লঞ্চিং গার্ডার ধসে পড়ায় গত রোববার থেকে ওই অংশের নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। যদিও প্রকল্পের নির্মাণকাজের শুরু থেকে এ অঞ্চলের মানুষ চরম ভোগান্তিতে আছেন। তারা বলছেন, কাজের এমন মন্থরগতি দেখে কচ্ছপও লজ্জা পাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ২০ দশমিক ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে এই বিআরটি রুট। হিসাব করে দেখা যায়, কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হচ্ছে ২০৮ কোটি টাকা।
• কাজের গতিতে কচ্ছপও লজ্জা পায়
• নতুন করে ব্যয় বাড়ানোর ফন্দি
• বন্ধ বিমানবন্দর অংশের নির্মাণকাজ
• চীনা বিশেষজ্ঞদল আসছে ২৮ মার্চ
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, নকশা ও স্পেসিফিকেশন জটিলতায় প্রকল্পের ব্যয় আবার সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবর্তন করতে হবে টঙ্গী-জয়দেবপুর সড়কের কারিগরি ডিজাইন। তাতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়বে কমপক্ষে ১৬১ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে তিনজন প্রকল্প পরিচালকের একজন এ এস এম ইলিয়াস শাহ রোববার (২১ মার্চ) বিকেলে ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রকল্পের ব্যয় সংশোধনের জন্য আমরা প্রস্তাব তৈরি করছি। তা এখনও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি।
রাস্তাজুড়ে চলছে বিআরটি প্রকল্পের কাজ। হচ্ছে উন্নয়ন, বাড়ছে ভোগান্তি |
প্রকল্প সূত্রে আরও জানা যায়, শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় দুই হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় চার হাজার ২৬৪ কোটি ৮২ লাখ টাকায়। ২০২০ সালে তা করা হয় চার হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
প্রকল্পের ব্যয় সংশোধনের জন্য আমরা প্রস্তাব তৈরি করছি। তা এখনও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি
এ এস এম ইলিয়াস শাহ, প্রকল্প পরিচালক
এ বিষয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে না। ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। তার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, সময়মতো প্রকল্প শেষ না হওয়ায় ভোগান্তি বাড়ছে। প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরির আগে যথাযথ সমীক্ষা না হওয়ায় এত বেশি ব্যয় ধরা হয়। এ বিষয়ে সরকার তৃতীয়পক্ষ নিয়োগ করে ব্যয়ের বিষয়টি যাচাই করতে পারে।
‘আমাদের দেশে মহাসড়ক ও রেলপথ নির্মাণের ব্যয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চেয়ে বেশি। এই বিআরটি প্রকল্পের কাজ বহু আগেই শেষ করা উচিত ছিল।’
বিআরটি বা বাস র্যাপিড ট্রানজিট হলো বাস চলাচলের আলাদা সড়ক। এতে বিশেষায়িত বাস চলাচল করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্রুত বাস চলাচলের এই ব্যবস্থা চালু আছে। ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় ২০০৪ সালেই এই ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছিল।
সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে না। ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। তার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, সময়মতো প্রকল্প শেষ না হওয়ায় ভোগান্তি বাড়ছে। প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরির আগে যথাযথ সমীক্ষা না হওয়ায় এত বেশি ব্যয় ধরা হয়। এ বিষয়ে সরকার তৃতীয়পক্ষ নিয়োগ করে ব্যয়ের বিষয়টি যাচাই করতে পারে
অধ্যাপক ড. সামছুল হক, বুয়েট
সর্বশেষ গত বছর জুনের মধ্যে কাজ শেষের লক্ষ্য নির্ধারণ হলেও তা হয়নি। ২০২২ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ সম্পন্নের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল ২০১২ সালে। ২০১৭ সালের আগে প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরুই করা হয়নি।
তবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নীলিমা আক্তার ঢাকা পোস্টকে বলেন, এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৪৩ শতাংশের বেশি। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে।
কচ্ছপগতির বিআরটি প্রকল্পে বেড়েছে যানজটের ভোগান্তি
ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিকল্পনা আরএসটিপির সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, ঢাকার সড়কে এখন ট্রিপ সংখ্যা দুই কোটি ৯৮ লাখ। ২০৩৫ সালে তা হবে পাঁচ কোটি ১১ লাখ। ২০৩৫ সালের মধ্যে ঢাকার জনসংখ্যা ৫৫ শতাংশ বেড়ে যাবে। দ্রুত গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে ২০৩৫ সালের মধ্যে ঢাকা ও এর আশপাশে ছয়টি রুটে মেট্রোরেল, দুটি রুটে বিআরটি, ছয়টি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সুপারিশ আছে আরএসটিপিতে। ওই সুপারিশের আলোকেই দেশের প্রথম বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
সর্বশেষ গত বছর জুনের মধ্যে কাজ শেষের লক্ষ্য নির্ধারণ হলেও তা হয়নি। ২০২২ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ সম্পন্নের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল ২০১২ সালে। ২০১৭ সালের আগে প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরুই করা হয়নি
বিআরটি’র সদরঘাট থেকে বিমানবন্দর রুটে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেটি করা যাচ্ছে না। এর রুট ঢাকা উড়াল সড়ক বা ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঝিলমিল-নটর ডেম কলেজ ফ্লাইওভারসহ বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে এখন বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর রুটে বিআরটি ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে। এটিই দেশের প্রথম বিআরটি ব্যবস্থা।
ঢাকার যানজট নিরসনের লক্ষ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট (বিআরটি গাজীপুর-বিমানবন্দর) ২০১২ সালের ২০ নভেম্বরে একনেকে অনুমোদিত হয়। সরকারের তিনটি সংস্থার অধীনে নির্মাণকাজ চলছে এটির। মাটির সমান্তরালে বিআরটি লেন নির্মাণ করছে সওজ অধিদফতর। উড়ালসেতু, টঙ্গী সেতু ও উড়াল লেন নির্মাণ করছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।
বিমানবন্দরের কাছে বিআরটি প্রকল্পের ধসে পড়া গার্ডারের অংশবিশেষ |
ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন ও বাসডিপো নির্মাণ করছে এলজিইডি। প্রকল্পের ২০ দশমিক ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে সাড়ে ১৫ কিলোমিটার হবে সড়কের সমান্তরালে। এ অংশ বাস্তবায়ন করছে সওজ অধিদফতর। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে চীনের গেঝুবা গ্রুপকে নির্মাণকাজের ঠিকাদার নিয়োগ দেয় সওজ অধিদফতর।
এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৪৩ শতাংশের বেশি। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে
নীলিমা আক্তার, অতিরিক্ত সচিব, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়
১০ লেনের টঙ্গী সেতু ও উত্তরা হাউজ বিল্ডিং থেকে টঙ্গীর চেরাগ আলী পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার উড়ালসড়ক নির্মাণ করছে বাংলাদেশ সেতু বিভাগ। এ অংশের ঠিকাদার চীনের জিয়াংসু প্রভিন্সিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ। এছাড়া বাসডিপো, ড্রেন, ফুটপাত ও বাজার উন্নয়ন কাজ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর। সরকারের পাশাপাশি এডিবি, ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি), গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (ডিইএফ) এ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে।
আব্দুল্লাহপুর অংশে বিআরটি প্রকল্পের ধসে পড়া একটি পিয়ার ক্যাপ |
বিমানবন্দর-গাজীপুর সড়কের মাঝামাঝি অংশে প্রকল্পের কাজ চলছে। এই অংশে বিআরটি’র ৪.৫ কিলোমিটার উড়ালপথ ও উড়ালসেতু থাকবে। এর মধ্যে ৩.৫ কিলোমিটার ছয় লেনের হবে। এক কিলোমিটার হবে দুই লেনের। বিআরটি বাসডিপোসহ বিভিন্ন স্থানে ২৫টি স্টপেজ থাকবে। বিআরটি’র নির্দিষ্ট পথে চলাচলের জন্য ১৪০টি আর্টিকুলেটেড বাস কেনা হবে।
বন্ধ বিমানবন্দর অংশের নির্মাণকাজ
ঢাকার বিমানবন্দর রেলস্টেশনের সামনে লঞ্চিং গার্ডার ভেঙে পড়ার পর গত রোববার থেকে বিমানবন্দর এলাকায় বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের অধীন এই অংশে উড়ালসেতুর নির্মাণকাজ চলছিল। সব খুঁটি বসানোর কাজ শেষ হয়েছে এখানে। মাসখানেক আগে কংক্রিটের রোডওয়ে স্ল্যাব স্থাপনের কাজ শুরু হয়। তবে গত রোববার (১৪ মার্চ) ৯ ও ১০ নম্বর খুঁটির লঞ্চিং গার্ডার ধসে পড়লে কাজ বন্ধ রাখা হয়।
গত রোববার বিমানবন্দর এলাকায় গার্ডারের লাঞ্চার ধসে পড়েছিল। ওই দুর্ঘটনার তদন্ত করছে সাত সদস্যের একটি দল। বিমানবন্দর ছাড়া বাকি অংশের কাজ চলছে
মো. সফিকুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ঢাকা বিআরটি কোম্পানি লি.
লঞ্চিং গার্ডার হলো একধরনের ক্রেন যা দিয়ে কংক্রিটের রোডওয়ে স্ল্যাব স্থাপন করা হয়। রোববার (২১ মার্চ) বিধ্বস্ত লঞ্চিং গার্ডারটি পরিদর্শনের কথা ছিল চীন থেকে আসা একটি বিশেষজ্ঞদলের। প্রকল্পের তিনজন পরিচালকের একজন এ এস এম ইলিয়াস শাহ এদিন বিকেলে ঢাকা পোস্টকে বলেন, আগামী ২৮ মার্চ চীন থেকে ওই বিশেষজ্ঞদলটি ঢাকায় আসবে।
শিল্পীর চোখে বিআরটি প্রকল্প
বিমানবন্দরে বিআরটি প্রকল্পের লঞ্চিং গার্ডার দুর্ঘটনার আগে আব্দুল্লাহপুরে একই প্রকল্পের একটি পিয়ার ক্যাপ ধসে পড়ে। দুটি দুর্ঘটনা তদন্তে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আনিসুর রহমানকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন এখনও জমা দেওয়া হয়নি।
ঢাকা বিআরটি কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সফিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত রোববার বিমানবন্দর এলাকায় গার্ডারের লাঞ্চার ধসে পড়েছিল। ওই দুর্ঘটনার তদন্ত করছে সাত সদস্যের একটি দল। বিমানবন্দর ছাড়া বাকি অংশের কাজ চলছে।
ফাইল ছবি
‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। ১৯২১ সালের এই দিনে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল এই প্রতিষ্ঠানের। তৎকালীন ব্রিটিশশাসিত বাংলায় এটিই ছিল একমাত্র উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পরাধীন দেশে এবং রাজকীয় ক্ষতিপূরণ হিসেবে পশ্চাৎপদ এ অঞ্চলের মানুষকে শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে নিতে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।
কোভিড-১৯ মহামারির কারণে ১৬ মাস ধরে বন্ধ আছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ কারণে এমন দিনেও আজ জাঁকজমকপূর্ণ কোনো কর্মসূচি আয়োজন করেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সীমিত পরিসরে প্রতীকী কর্মসূচির মাধ্যমে শতবর্ষ পূর্তির মূল অনুষ্ঠান শুরু হবে। এর নাম দেওয়া হয়েছে অগ্রবর্তী অনুষ্ঠান।
আগামী নভেম্বর মাসে শতবর্ষের আনুষ্ঠানিকতা উদযাপনের সিদ্ধান্ত আছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান। ওইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে শতবর্ষের মূল অনুষ্ঠান বর্ণাঢ্য ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজনের পরিকল্পনা আছে। রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মো. আবদুল হামিদ এতে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপনলগ্নে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান। পাশাপাশি অভিনন্দন জানিয়েছেন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সবাইকে। তিনি বলেন, জ্ঞান আহরণ ও বিতরণের গৌরবগাথা নিয়ে শতবর্ষ পাড়ি দিয়েছে প্রাণপ্রিয় এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, চিরগৌরবময় মুক্তিযুদ্ধসহ গণমানুষের সব লড়াইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সর্বদা নেতৃত্ব দিয়েছে। জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং দেশ সেবায় রেখেছে অনন্য অবদান।
দেশের প্রতি আমাদের মমত্ববোধ ও চিরকৃতজ্ঞ চিত্তই এগিয়ে চলার পাথেয়। তাই শতবর্ষে মাতৃভূমি ও গণমানুষের প্রতি আমাদের অনিঃশেষ কৃতজ্ঞতা। শতবর্ষ উদ্্যাপনের বিরল সৌভাগ্য-প্রাপ্তির ক্ষণে আমরা দেশের শিক্ষা ও গবেষণার মানকে আরও উন্নত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি। পাশাপাশি চলমান মহামারি পরিস্থিতি উত্তরণ হলে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, সর্বোপরি ক্যাম্পাস আগের মতো প্রাণবন্ত ও মুখরিত হবে সেই প্রার্থনা করি।
দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা জানান, প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত মান বজায় রাখার কারণেই প্রতিষ্ঠানটি অভিধা পেয়েছে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে। পাশাপাশি এটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দায়িত্বও পালন করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি চালুর ২৬ বছরের মধ্যে ব্রিটিশদের কবল থেকে উপমহাদেশ মুক্ত হয়। সৃষ্টি হয় পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি রাষ্ট্র। সেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র ২৪ বছরের মধ্যে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। পাকিস্তান সৃষ্টির পরের বছর থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয় স্বতন্ত্র জাতিসত্তা সৃষ্টির আন্দোলনে নিবেদিত হয়। এক কথায় বলতে গেলে, দেশ স্বাধীন এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ গঠন ও পরিচালনায় যারা ভূমিকা রেখেছেন তাদের ৫০ বছর ধরে তৈরি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালে শিক্ষাক্ষেত্রে গৃহীত পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির প্রতিবাদ, বাঙালির মুক্তির সনদখ্যাত ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি আদায়, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সরাসরি ভূমিকা ছিল।
বঙ্গবন্ধুর শাহাদতবরণের পর আশির দশকে জেনারেল জিয়াউর রহমান ও পরে এরশাদবিরোধী আন্দোলন সূচিত হয় এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। গণতান্ত্রিক সরকারগুলোকে সঠিকপথে রাখতে ছোটখাটো আন্দোলন আর একাডেমিক সমালোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। সর্বশেষ ২০০৭ সালে গণতন্ত্র মুক্তির আন্দোলনের অগ্নিস্ফুলিঙ্গও বিচ্ছুরিত হয় এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এসব কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষায় অবদানের পাশাপাশি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা নিয়েও সমান আলোচনা হয়ে থাকে।
ইতিহাসের পাতার দিকে তাকালে দেখা যায়, বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ১৯০৫ সালে পূর্ববাংলা ও আসামকে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ গঠন করেছিল ব্রিটিশরাজ। হিন্দু জমিদারসহ প্রভাবশালীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পরে সেই বঙ্গভঙ্গ রদ করতে হয়েছিল। তবে বঙ্গভঙ্গ বাতিলের রাজকীয় ক্ষতিপূরণ হিসাবে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। ইতিহাসে আরও দেখা যায়, প্রভাবশালীরা তখন এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বাধা দিয়েছিল।
কিন্তু ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ, ধনবাড়ীর নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হকসহ তৎকালীন মুসলিম নেতারা ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে এ নিয়ে দেনদরবার করেন। এ লক্ষ্যে তখনকার ভাইস রয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে বিশিষ্ট নেতারা ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি সাক্ষাৎ করেন। এর তিন দিন পর ২ ফেব্রুয়ারি ভাইস রয়ের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা আকারে প্রকাশ পায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ওই বছরই ২৭ মে নাথান কমিশন গঠন করা হয়।
এ অবস্থায় প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কার্যক্রম থমকে যায়। যুদ্ধ শেষে ফের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তাগিদ দেন এ অঞ্চলের মুসলিম নেতারা। এ অবস্থায় ১৯১৭ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশ সরকার ‘স্যাডলার কমিশন’ গঠন করে। দুই বছর পর ১৯১৯ সালের মার্চে স্যাডলার কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ পায়। এরপর ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ দি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট নামে ভারতীয় আইনসভায় পাশ হয়। সেই আইন অনুযায়ী ১৯২১ সালের ১ জুলাই ছাত্রছাত্রীদের জন্য দ্বারোন্মোচন হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের।
ঢাকায় ওই সময়ের সবচেয়ে অভিজাত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকা ছিল রমনা। ওই এলাকায় প্রায় ৬০০ একর জমির ওপর পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছিল এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাকালে তিনটি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ ছিল। একটি পরিপূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। আবাসিক হলগুলো হচ্ছে- সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা হল-যা এখন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল ও জগন্নাথ হল। প্রথম শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন বিভাগে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৮৭৭ জন এবং শিক্ষক সংখ্যা ছিল মাত্র ৬০ জন।
আর শতবর্ষ পরে আজকে এই বিশ্ববিদ্যালয় মহীরুহে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে অনুষদ ১৩টি, বিভাগ ৮৪টি, ইনস্টিটিউট ১৩টি, গবেষণা ব্যুরো ও কেন্দ্র ৬১টি। আবাসিক হল ১৯ এবং হোস্টেল ৪টি। আর শিক্ষার্থী ৪৬ হাজার ১৫০ জন ও শিক্ষক ২০০৮ জন। কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন ৪ হাজার ৪৫৫ জন। এমফিল গবেষক ১১৬১ ও ও পিএইচডি গবেষক আছেন ১০৪৩ জন। এখন পর্যন্ত এমফিল ডিগ্রি পেয়েছেন ১৭০৮ ও ও পিএইচডি ১৫৮৮ জন পেয়েছেন।
সম্প্রতি ডিবিএ (ডক্টর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) ডিগ্রিও প্রদান করা হচ্ছে। ৬০০ একরে ক্যাম্পাস যাত্রা করলেও বর্তমানে এর পরিধি ২৭৫ দশমিক ৮৩ একর। সম্প্রতি সরকার পূর্বাচলে ৫১.৯৯ একর জমি এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বরাদ্দ দিয়েছে। কৃতী শিক্ষার্থীদের মেডেল, বৃত্তি ও সম্মাননা দিতে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে ট্রাস্ট ফান্ড আছে ৩৪৭টি।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুরু থেকেই দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে। কখনো আর্থিকভাবে আবার কখনো সামরিক-সরকারি অভিযানের মুখে পড়েছে। সবমিলে দমনে মরিয়া ছিল সরকারগুলো। যে কারণে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সময়ে আর্থিক সংকটে পড়েছে। বর্তমানেও অপ্রতুল বাজেটের বিপরীতে সক্ষমতার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তিসহ নানান সংকট নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
পাশাপাশি একাডেমিক দিক থেকেও পিছিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা আবাসন সংকট নিয়েই দিন কাটাচ্ছে। মান্ধাতা আমলের শ্রেণিকক্ষে চলছে ক্লাস। গবেষণাগারেরও তথৈবচ অবস্থা। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের সেবাও আধুনিক নয়। উপরন্তু আবাসিক হলে ও ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে শিক্ষার্থীরা শারীরিক-মানসিক সংকটে পড়ছে। ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে চলছে ভাটা। শিক্ষকদের একটি অংশের নিয়মিত ক্লাস না নেওয়া এবং একাডেমিক কার্যক্রমের পরিবর্তে রাজনৈতিক ও ভিন্নদিকে মনোনিবেশ বেশি থাকার অভিযোগও আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিককালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান দুটি চাপ মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছে। এগুলো হচ্ছে, শিক্ষার্থী ভর্তি ও বাজেটের অপ্রতুলতা। আমাদের বাজেটের অপ্রতুলতার কারণ হচ্ছে, আমাদের জাতীয় বাজেটই শিক্ষাবান্ধব নয়। তিনি বলেন, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পরিমাণ সুবিধা আছে, তার সদ্ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের নিজেদের গড়ে তুলতে হবে।
আজকের কর্মসূচি : আজকের প্রতীকী কর্মসূচির মধ্যে আছে-সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের সামনে জাতীয় পতাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন। অনুষ্ঠানটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইপি টেলিভিশনে সম্প্রচার এবং ওয়েবসাইট ও ফেসবুক লাইভে সম্প্রচার করা হবে। বিকাল ৪টায় প্রশাসনিক ভবনে অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে আলোচনা সভা হবে। এতে ভাষাসৈনিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সংযুক্ত হয়ে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। সভাপতিত্ব করবেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। সূত্র: যুগান্তর