a
ফাইল ছবি
জামালপুর জেলার অধিনে পৌরসভা সমুহে গতকাল সোমবার সকাল ৬টা থেকে আগামী ৩০ জুন রাত ১২টা পর্যন্ত লক ডাউন ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জামালপুর জেলা প্রশাসন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয় জামালপুর জেলাধীন পৌরসভা এলাকায় করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতি উচ্চ ঝুকিসম্পন্ন বিবেচনা করে এই লকডাউন ঘোষনা করা হয়। জেলা প্রশাসক মুর্শেদা জামান স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে ১০ বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়।
১। কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তির বাসস্থান লকডাউনের আওতাভুক্ত থাকবে। উক্ত সময়ে আক্রান্ত ব্যক্তি ও পরিবারের সকলকে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনপূর্বক সার্বক্ষণিক গৃহে অবস্থান করতে হবে। কোনোক্রমেই বাড়ির বাইরে অবস্থান করা যাবে না।
২। সকল পর্যটনস্থল, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার ও বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ থাকবে।
৩। জনসমাবেশ হয় এ ধরণের সামাজিক (বিবাহোত্তর অনুষ্ঠান, জন্মদিন, পিকনিক, পার্টি ইত্যাদি) রাজনৈতিক, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে।
৪। সকাল ৬:০০ টা হতে সন্ধ্যা ৬:০০ টা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকানপাট, শপিংমল খোলা রাখা যাবে। তবে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধ করে দেয়াসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ঔষধের দোকানসমূহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে ২৪ ঘন্টা খোলা থাকবে।
৫। জরুরি পরিসেবা (যেমন বিদ্যুৎ, গ্যাস, কৃষিপণ্য পরিবহন, পশুখাদ্য ইত্যাদি) ও জরুরি প্রয়োজন (যেমন ঔষধ ক্রয়, চিকিৎসা সেবা, মৃতদেহ দাফন/সৎকার ইত্যাদি) ব্যতীত কেউ সন্ধ্যা ৭:০০ টা হতে সকাল ৬:০০ টা পর্যন্ত বাড়ির বাইরে অবস্থান করতে পারবেন না।
৬। হোটেল, রেস্তোরা, খাবারের দোকানসমূহ শুধু পার্সেল, টেকওয়ে, অনলাইন অর্ডার বা হোম ডেলিভারী সেবা প্রদান করতে পারবে। কোন অবস্থাতেই উক্ত স্থানসমূহে বসে খাবার গ্রহণ করা যাবে না।
৭। বাস, মাইক্রোবাস ইত্যাদি গণপরিবহনসমূহ নির্ধারিত আসন সংখ্যার অর্ধেক নিয়ে চলাচল করতে পারবে। তবে যাত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে মাস্ক পরিধানসহ স্বাস্থ্যদিধি মেনে চলতে হবে।
৮। সিএনজি অটোরিক্সা, ইঞ্জিনচালিত রিকশা, অন্যান্য রিকশাসমূহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে শুধু ০২জন যাত্রী বহন করতে পারবে। সিএনজি ও অটোরিক্সাসমূহ কোনোক্রমেই সামনের সিটে যাত্রী বহন করতে পারবে না।
৯। কাঁচা বাজার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সকাল ৬:০০ টা থেকে সন্ধ্যা ৬:০০ টা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে।
১০। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসহ সরকার কর্তৃক জারিকৃত অন্যান্য নির্দেশনাসমূহ এ বিধিনিষেধের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।
প্রশাসন থেকে বলা হচ্ছে জনস্বার্থে জারিকৃত এই আদেশে অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ফাইল ছবি । লকডাউনে আইন অমান্যকারীদের লঘু শাস্তি
গতকাল বৃহস্পতিবার (১ জুলাই) ভোর ৬টা থেকে সারাদেশে সরকার ঘোষিত ৭ দিনের কঠোর লকডাউন শুরু হয়েছে। সরকারি বিধিনিষেধ এবং মানুষের স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে মাঠে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, র্যাব, আনসার এবং সেনা সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।
কঠোর লকডাউনের প্রথম দিনে সরকারি নির্দেশনা অমান্যকারীদের গ্রেফতার করা হয় ৫৫০ জনকে। সাজা দেওয়া হয়েছে ৮ ব্যক্তিকে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ৪ লাখ ৯২ হাজার ৫০৭ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ২৭৪টি গাড়িকে মামলা দেওয়া হয়েছে। আটক করা হয়েছে ৬টি গাড়ি। রেকারিং করা হয়েছে মোট ৭৭টি গাড়ি। ট্রাফিক বিভাগ কর্তৃক জরিমানা করা হয়েছে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০ টাকা।
এ ব্যাপারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার ইফতেখায়রুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, যৌক্তিক কারণ ছাড়া যারাই বের হবে তাদেরকেই মামলার মুখোমুখি হতে হবে।
গ্রেফতারকৃতদের বাইরে যারা আটক হয়েছেন তারা যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারলে তাদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে। আর যদি যৌক্তিক কারণ দেখাতে না পারে সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যতদিন লকডাউন চলবে ততদিন পুলিশের এ তৎপরতা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।
ছবি সংগৃহীত
কর্ণেল(অব.) আকরাম, সামরিক বিশ্লেষকঃ সৈন্যবৃত্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা, যা অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রতিটি দেশের জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হয়েছে। অনেক গবেষক মনে করেন, এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম পেশা। আধুনিক সেনাবাহিনীর উৎপত্তি প্রুশিয়ায়, যেখানে পেশাদার সামরিক বাহিনী মূলত পেশাদার অফিসার বাহিনীর উপর নির্ভরশীল ছিল। ইউরোপের পূর্ব ও পশ্চিম অংশ, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, জার্মানি এবং ইতালি আধুনিক পেশাদার সেনাবাহিনীর বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আধুনিক সামরিক বাহিনীর ব্যাপক প্রসার ঘটে। শীতল যুদ্ধের যুগে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়, যা সামরিক বাহিনীকে আরও উন্নত ও পেশাদার করে তোলে।
ইসলামিক রাষ্ট্র মদিনার সূচনালগ্ন থেকেই সামরিক বাহিনীর বিকাশ লক্ষ্য করা যায়, যা খলিফা উমর (রা.)-এর শাসনামলে পেশাদার রূপ লাভ করে। এই সময়ে ইসলামি বাহিনী প্রথমবারের মতো একটি সুসংগঠিত ও পেশাদার রূপ নেয়, যা যে কোনো যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রস্তুত ছিল। পরে অটোমান সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনী পেশাদারিত্বের জন্য প্রসিদ্ধ হয়। জনিসারিদের (Janissary) ইউরোপের মানুষ এক সময় আতঙ্ক হিসেবে দেখত, কারণ সেখানে শুধুমাত্র অফিসার থাকত, সাধারণ সৈনিক নয়।
ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্যের *মানসবদারি ব্যবস্থা* একটি ব্যতিক্রমধর্মী সামরিক কাঠামো ছিল। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে নবাবের বাহিনীও মানসবদারি কাঠামোর মতোই সংগঠিত ছিল।
ভারতে আধুনিক সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব ব্রিটিশদের। প্রথমে তারা *বাংলা আর্মি* গঠন করে, এরপর *বোম্বে আর্মি* এবং *মাদ্রাজ আর্মি* গড়ে ওঠে। তবে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা তিনটি বাহিনী বিলুপ্ত করে নতুন *ভারতীয় সেনাবাহিনী* গঠন করে।
প্রথমদিকে শুধুমাত্র ব্রিটিশরা ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসার হতে পারত। স্থানীয় ভারতীয়দের সর্বোচ্চ পদ ছিল *সুবেদার মেজর*। কোম্পানির অফিসারদের পাশাপাশি ব্রিটিশ অফিসাররা সেনাবাহিনী পরিচালনা করত। ব্রিটিশ শাসনামলে এই অফিসাররা নবাবদের মতো বিলাসী জীবনযাপন করত।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ভারতীয়দের সেনাবাহিনীতে সীমিত আকারে অফিসার হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আরও বেশি সংখ্যক ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসার হতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সূচনা:
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর ভারতীয় সেনাবাহিনী দুটি ভাগে বিভক্ত হয়—ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী। পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) সেনা অফিসারের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত নগণ্য। পূর্ববাংলার মানুষের সামরিক ঐতিহ্য বা পটভূমি তেমন ছিল না। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সূচনাকালে বাঙালি অফিসারের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা কয়েকজন, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তান, বিশেষ করে পাঞ্জাব থেকে বহু সংখ্যক মুসলিম অফিসার অন্তর্ভুক্ত হয়। ব্রিটিশ আমলে প্রথম ভিক্টোরিয়া ক্রসজয়ী ছিলেন একজন পাঞ্জাবি মুসলিম।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যবিত্ত মুসলিমদের জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অফিসার হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও সেনাবাহিনী গঠন:
১৯৭১ সালে একদল তরুণ অফিসার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি (PMA) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেজর জিয়া, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর জলিল, ক্যাপ্টেন ওলি আহমদ, ক্যাপ্টেন হাফিজসহ আরও অনেকে। অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ওসমানীর নেতৃত্বে এই অফিসাররা নতুন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ভিত্তি স্থাপন করেন।
২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং সামরিক দিক থেকে নেতৃত্ব দেন। এটি ছিল এক পেশাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একদল তরুণ অফিসারের চ্যালেঞ্জ, যা শেষ পর্যন্ত সফল হয়।
যুদ্ধের সময় কিছু তরুণ বেসামরিক নাগরিক ওয়ার কমিশন পায়, আর অন্যরা মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিকাশ ও সংকট:
স্বাধীনতার পর, নবগঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রথম দিকে অবহেলিত ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার সেনাবাহিনীর পরিবর্তে জাতীয় রক্ষী বাহিনী (JRB) নামে একটি আধাসামরিক বাহিনী গঠন করে, যা সরাসরি ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ছিল।
১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের পতন এবং জিয়াউর রহমানের উত্থান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাস পরিবর্তন করে। সেনাবাহিনী বিভিন্ন পটভূমির অফিসারদের দ্বারা গঠিত হলেও জিয়াউর রহমানের দক্ষ নেতৃত্বে এটি একটি পেশাদার বাহিনীতে পরিণত হয়। এই পরিবর্তনের পেছনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে ফেরত আসা বাঙালি অফিসারদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিভিন্ন পটভূমির অফিসারদের নিয়ে একটি পেশাদার সেনাবাহিনী গঠন করা চ্যালেঞ্জিং ছিল, কিন্তু দক্ষ অফিসারদের মাধ্যমে এটি সম্ভব হয়। এটি ছিল প্রকৃত সামরিক দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের প্রতিফলন। ইতিহাস একদিন এই অফিসারদের অবদান ও আত্মত্যাগকে যথাযথ সম্মান দেবে।
সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব সংকট:
প্রত্যাবর্তিত অফিসারদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পেশাদার রয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যখন বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (BMA) থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অফিসাররা নেতৃত্বে আসে, তখন সংকটের সূত্রপাত হয়।
প্রথম BMA কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে জেনারেল মইনুদ্দিন সেনাপ্রধান হন, কিন্তু তিনি জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আসতে সহায়তা করেন। এর ফলে দেশে এক নব্য ফ্যাসিবাদী শাসনের জন্ম হয়।
এই ফ্যাসিবাদী সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালনকারী জেনারেলরা জাতির প্রতি দায় এড়াতে পারেন না। জনগণ এখন তাদের বিশ্বাস করতে নারাজ। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে, আজ আমাদের অনেক অফিসারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে।
নেতৃত্ব ও সততার অভাব:
আমি দীর্ঘদিন বিএমএ-তে নেতৃত্ব তৈরির কাজে যুক্ত ছিলাম। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমাদের সেনাবাহিনীর প্রধান সমস্যা হলো *সততার অভাব*। আমরা ক্যাডেটদের মধ্যে ব্যক্তিগত সততা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি, যার ফলে তারা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও আর্থিক দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে।
আমাদের উচিত সততার প্রশ্নটিকে গুরুত্ব সহকারে দেখা, যদি সত্যিই আমরা এমন অফিসার চাই, যারা জাতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে। আমার মতামত কারও মনে কষ্ট দিলে আমি দুঃখিত, কিন্তু বাস্তব সত্য এটাই।