a
ফাইল ছবি
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় জমজমাট হয়ে উঠেছে চোরাচালান বাণিজ্য। আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে সোর্স পরিচয়ধারী চোরাচালানীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সরকারের লক্ষলক্ষ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে ভারত থেকে অবাধে কয়লা, পাথর, মদ, গাঁজা, ইয়াবা, কাঠ, চাল ও অস্ত্র পাচাঁর করছে। তারপরও সোর্সদেরকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে- প্রতিদিনির মতো আজ বৃহস্পতিবার (১৫ জুলাই) সকালে জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ডলুরা সীমান্তের ধোপাজান-চলতি নদী দিয়ে ভারত থেকে নৌকা বোঝাই করে পাথর ও মাদকদ্রব্য পাচাঁর করে চোরাচালানীরা। এই খবর পেয়ে দুপুরে বিজিবি অভিযান চালিয়ে ৫ ঘনফুট পাথরসহ ১টি বারকি নৌকা জব্দ করে।
এর আগে মাছিমপুর সীমান্ত থেকে ১০ বোতল ও চিনাকান্দি সীমান্ত থেকে ১১ বোতল ভারতীয় মদ পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে। কিন্তু চোরাকারবারীদেরকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
অন্যদিকে ভোরে ৫টায় তাহিরপুর উপজেলার চারাগাঁও সীমান্তের বাঁশতলা তেতুলগাঁও, লালঘাট ও বালিয়াঘাট সীমান্তের লাকমা এলাকা দিয়ে সোর্স শফিকুল ইসলাম ভৈবর, রমজান মিয়া, খোকন মিয়া, শহিদুল্লাহ, বাবুল মিয়া ও ইয়াবা কালাম পৃথক ভাবে ভারত থেকে প্রায় ৫০ মে.টন কয়লা ও মাদকদ্রব্য পাচাঁর করে। পরে ৩টি স্টিলের ইঞ্জিনের নৌকা বোঝাই করে প্রায় ১৮ মে.টন কয়লাসহ মদ, গাঁজা ও ইয়াবাসহ বরশির চিপ পাচার করে ওপেন নিয়ে যায়। আর বাকি মালামাল সীমান্তের বিভিন্ন বাড়িঘরের ভিতর ও তার আশেপাশে পানিতে লুকিয়ে রাখে।
পাচারকৃত প্রতি নৌকা (৬ মে.টন) কয়লা জন্য ৫ হাজার টাকা চাঁদা নেয় বিজিবির সোর্স পরিচয়ধারী শফিকুল ইসলাম ভৈরব, রমজান মিয়া ও ইয়াবা কালাম। সোর্সরা দপটের সাথে প্রতিদিন এভাবেই ওপেন কয়লা ও মাদকদ্রব্য পাচার করে। কিন্তু বিজিবি এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেয় না বলে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ ২৮ ব্যাটালিয়নের বিজিবি অধিনায়ক তসলিম এহসান সাংবাদিকদের বলেন- জব্দকৃত মদ ও পাথরসহ নৌকা শুল্ক কার্যালয়ে জমা করার প্রক্রিয়া চলছে। সীমান্ত চোরাচালান প্রতিরোধের জন্য আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ছবি: মুক্তসংবাদ প্রতিদিন
মো: সাইফুল আলম সরকার, ঢাকা: ব্যবসায়িক স্বার্থগোষ্ঠীর অনৈতিক চাহিদা পূরণ করতে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার বিদ্যমান ত্রুটিপূর্ণ সংশোধন প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ড্যাপ ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার যে কোন সংশোধন নাগরিক, পেশাজীবি, কমিউনিটি ও সামাজিক সংগঠনসমূহকে যথাযথ সম্পৃক্ত করবার মাধ্যমে এবং তাদের মতামতের সাপেক্ষে সার্বিক জনকল্যাণ ও শহরের বাসযোগ্যতাকে মাথায় রেখে করতে হবে। নাগরিকদের উপেক্ষা করে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থে ড্যাপ ও ইমারত বিধিমালা সংশোধন করলে এর দায়ভার নিতে হবে সরকারকে।
আজ ১৮ মার্চ, ২০২৫ (মঙ্গলবার), সকাল ১১ টায় জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকার আবদুস সালাম হল এ অনুষ্ঠিত গোষ্ঠীস্বার্থে বারবার ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার পরিবর্তনঃ জনস্বার্থ, ও বাসযোগ্যতার বিপন্নতা এবং নাগরিকের করণীয় শীর্ষক ‘সংবাদ সম্মেলন’ এ তুলে ধরা হয়।
বিগত সময়ে গোষ্ঠীস্বার্থে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পরিকল্পনায় যে সকল পরিবর্তন করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক সঠিক তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করবার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ড্যাপে এলাকাভিত্তিক নাগরিক সুবিধাদি যথা স্কুল, হাসপাতাল, পার্ক, খেলার মাঠ প্রভৃতির যে প্রস্তাবনা দেয়া আছে, সেগুলোর বাস্তবায়নের রাজউক, সিটি কর্পোরেশনসহ সরকারী সংস্থাসমূহকে অতি দ্রুত এলাকাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান এর সঞ্চালনায় ‘সংবাদ সম্মেলন’ এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান এর পর দেশের সংবিধানসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সংস্কার হলেও সমগ্র দেশের টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের নগরায়ন, নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন, ইমারত, নির্মাণ ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালার যৌক্তিক কোন সংস্কার হয়নি। বিপরীতে ড্যাপ নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল সবসময়ই অপপ্রচারণা চালিয়েছে। ড্যাপ অচিরেই সংশোধন করা হবে, এই বার্তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিয়ে ভবন নির্মানে আগ্রহী ভবন মালিকদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ইমারত নকশা ও নির্মাণ সংশ্লিষ্ট অনেক পেশাজীবি নতুন ড্যাপের প্রস্তাবনা অনুযায়ী ভবন নকশায় আগ্রহী না হয়ে ভবন মালিকদের ভিন্ন বার্তা দেবার চেষ্টা করেছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়ন এর সাথে সাথেই বারংবার স্বার্থান্বেষী মহলের বাধার কারণে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হতে পারছে না।
গত দুটি বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়ন এর পরপরই রিভিউ কমিটি গড়ে ড্যাপ বাস্তবায়নের মূল শক্তিটাই নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। সরকার উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী মহলের কাছে সামগ্রিক জনস্বার্থ, শহরের বাসযোগ্যতাকে ছাড় দিয়েছে। অনুরূপভাবে বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা ২০০৪ এর সংশোধন করা হয় ২০১৫ সালে, যাতে আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপে জনস্বার্থ উপেক্ষা করে নাগরিক সুবিধাদির মানদণ্ড অনেক কমিয়ে ফেলা হয়েছে, ফলে কমেছে পার্ক, খেলার মাঠ, বিদ্যালয় প্রভৃতি নাগরিক সুবিধাদি। শহরের পরিবেশ-প্রতিবেশ ও বাসযোগ্যতা বিপন্ন করতে এ ধরনের ষড়যন্ত্র এখনো চলছে।
তিনি আরো বলেন , ২০০৮ সালের ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় আবাসিক ভবনের জন্য মোটা দাগে রাস্তার প্রশস্থতা ও প্লটের আয়তনের উপর ভিত্তি করে সর্বনিম্ন ‘এফএআর’ মান ৩.১৫ ও সর্বোচ্চ ৬.৫ দেয়া হয়েছিল। বর্তমান বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় আবাসিক এ৩ (ফ্ল্যাট বা এপার্টমেন্ট) শ্রেণীর জন্য এই মান সর্বোচ্চ ৪.২৫ নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা মে’২০২৪ সালে খসড়া ইমারত বিধিমালায় অনুসরণ করা হয়েছিল। অথচ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে রাজউক কর্তৃক প্রণীত ইমারত বিধিমালার খসড়াতে প্লটভিত্তিক আবাসিক এ৩ ক্যাটাগরির ফার মান ৫.৫ করা হয়েছে, যা প্রায় অবাসযোগ্য ঢাকা শহরের উপর চাপ মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেবে। অথচ বৈশ্বিকভাবেই ছোট আয়তনের প্লটভিত্তিক আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে ফার মান সাধারণত ১ থেকে ২.৫ এর মধ্যেই হয়ে থাকে। ড্যাপে অনেকে এলাকার ফার ও জনঘনত্ব কয়েকগূণ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে রাজউক। অথচ সেসব এলাকার নাগরিক সুবিধাদি একই থাকছে। গোষ্ঠীস্বার্থে বিধিমালার ফার মান পরিবর্তন শহরের জন্য বাসযোগ্যতার জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। নগর পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নগর এলাকার ধরন, মান ও অবস্থান অনুযায়ী পরিকল্পনার কৌশল, জনঘনত্ব, ফার মান, উচ্চতা সীমা প্রভৃতি ভিন্ন হয়ে থাকে।
২০২৪ সালের শুরুতে প্রস্তুতকৃত খসড়া ইমারত বিধিমালায় আবাসিক এলাকার ফার মান বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার সাথে সংগতি রেখে কেন্দ্রীয় ঢাকা, বহিঃস্থ নগর ও অন্যান্য নগর এলাকার জন্য পৃথক ফার মান দেয়া হয়েছিল। এটা অত্যন্ত বিস্ময়কর যে বর্তমান ইমারত বিধিমালা প্রস্তাবনায় এই এলাকাভিত্তিক প্রস্তাবনা বাদ দেয়া হয়েছে। ভবনের সেটব্যাক দূরত্ব যথাযথ করে ভবনের ভেতর প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচলের বিষয়টিও উপেক্ষিত বিধিমালার প্রস্তাবনায়।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং বায়ুমন্ডল অধ্যায়ন কেন্দ্র এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, জলাবদ্ধতা, যানজট ও বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে ঢাকা অমানবিক শহরে পরিণত হয়েছে। শুধুমাত্র ব্যবসায়িক চিন্তা-ভাবনার জন্য ঢাকা বর্তমানে এমন একটি অবস্থায় এসেছে দাঁড়িয়ে যে, সম্প্রতি একটি জরিপে দেখা গিয়েছে যে বিশ্বের ১৪৭ টি বসবাসযোগ্য নগরীর ভিতরে ঢাকার অবস্থান ১৪৩ যা মূলত ঢাকার অবসবাসযোগ্যতাকেই চিহ্নিত করে। বাংলাদেশে যেকোন প্রকল্প বা স্থাপনা বাস্তবায়নের সময় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয় না। এছাড়াও যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে ঢাকা শহরের সবুজ এলাকা ও জলাশয় মারাত্মকভাবে কমে গিয়েছে। গাছ ও বনভূমি ধবংস বন্ধ করা সহ পুরো ঢাকা শহরের যথাযথ পরিকল্পনার জন্যে সরকারের কাছে তিনি আহবান জানান।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, যে কোন শহরের টেকসই পরিকল্পনা এবং সামগ্রিক জনস্বার্থ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় বিধিবিধান সম্বলিত ইমারত নির্মাণ বিধিমালা প্রণয়ন এবং সেটির কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত প্রয়োজন। ঢাকার ইমারত বিধিমালা যেন প্রণয়ন হচ্ছে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সুরক্ষা করতে। শহরের ডাক্তার হচ্ছে পরিকল্পনাবিদ অথচ রাজঊক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ড্যাপ সংশোধনের ব্যাপারে পরিকল্পনাবিদদের মতামতকে একদমই অগ্রাহ্য করছে। ফলে সামনে ঢাকার নাগরিকদের জন্য আরও বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
সেন্টার ফর হাউজিং এন্ড বিল্ডিং রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী মো: আবু সাদেক বলেন, আবাসন ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেবার জন্য এত বছর পরেও পূর্বাচল এলাকায় গ্যাস, পানি ও অন্যান্য পরিসেবা ও নাগরিক সুবিধাদি গড়ে উঠেনি। স্বাধীনতার পর এই প্রথম পেশাজীবি সংগঠন ও সাধারণ নাগরিকদের মতামতকে উপেক্ষা করে নীতিমালা সংশোধন করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক। গুটিকয়েক স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর মুনাফা বাড়ানোর জন্য এই পরিবর্তন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি রাজঊক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে ড্যাপ সংশোধনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট নাগরিক ও পেশাজীবি মহলের মতামত গ্রহণ করে পরিকল্পিত শহর গড়ে তোলার আহবান জানান।
বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. শায়ের গফুর বলেন যে, নগর নাগরিকদের হাত থেকে বেহাত হয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়িদের পণ্য হয়ে গিয়েছে শহর। ব্যবসায়িরা রাজনৈতিক ভাবে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করতে বিল্ডিং এর উচ্চতা, ফার বাড়িয়ে নিচ্ছে। ফলে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। কোন প্রকার পরিকল্পনা ছাড়াই প্রধান সড়কের পাশে নতুন শপিং মল তৈরী করার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে প্রকট যানজট। সুতরাং লক্ষ্য রাখতে হবে, একটা শহরের মধ্যে যেন সবকিছু কেন্দ্রভুত না হয়। যথার্থ পরিকল্পনা ও বিকেন্দ্রীকরণ কৌশল নিতে পারলে ঢাকার জনসংখ্যা কমানোও সম্ভব।
বিআইপি সাবেক সহ-সভাপতি ফজলে রেজা সুমন বলেন, ড্যাপ ও ইমারত বিধিমালার সাথে সম্পৃক্ত সব অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে ড্যাপ ও ইমারত বিধিমালা সংশোধন করতে হবে। বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে বিধিমালা সংশোধন করা যাবে না। তিনি আরও বলেন, যারা অতীতে পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় সম্মুখ সারিতে ছিল, আজ তারাই ড্যাপ ও বিধিমালা সংশোধন করে ঢাকার বাসযোগ্যতা নষ্ট করবার চক্রান্ত করছে, যা কাম্য নয়। ঢাকার বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে যেন কোন আইন ও পরিকল্পনার সংশোধনী না করা হয়, উপদেষ্টাদের প্রতি আহবান জানান তিনি।
জুরাইন এলাকার নাগরিক অধিকারকর্মী মিজানুর রহমান বলেন যে, ঢাকা শহরে শিশুদের খেলার কোন জায়গা নেই, চারপাশের পরিবেশও ভালো না। ফলে শিশুরা গৃহবন্দি হয়ে থাকে। তাদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) টাস্ট এর পরিচালক গাউস পিয়ারী বলেন, মানুষের শহরকে কিভাবে বাসযোগ্য রাখা যায় তা আমাদেরকে ভাবতে হবে। যাদের মাঝে দেশপ্রেম নেই, তারা দেশের বাসযোগ্যতা চায় না।
বাসযোগ্যতা, প্রাণ-প্রকৃতি নষ্ট করে, এমন কোন পরিকল্পনা আমরা চাই না। তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক সৈয়দা রত্না বলেন, জুলাই আন্দোলন যে বৈষম্যের জন্য হয়েছে, সেই বৈষম্য এখনও চলছে,যা পান্থকুঞ্জ পার্কে দৃশ্যমান। ঢাকার মাঠ হবে উন্মুক্ত, কোন মাঠকেই ব্যবসায়িক কাজের জন্য বন্ধ করা যাবে না।
১৯নং ওয়ার্ড কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন, করাইল এর সভাপতি সেলিনা আক্তার বলেন, বর্তমান সরকার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অংশ। অথচ আগামী ১৯ ই অনুষ্ঠিতব্য মার্চ উপদেষ্টা পরিষদের পরিকল্পনা মিটিংয়ে করাইলে বসবাসরত প্রায় ২.৫ লাখ নিম্ন আয়ের মানুষের বাসস্থানসহ মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে কোন পরিকল্পনা নেই। তিনি আরো উল্লেখ করেন ভারত,শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের মত দেশে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারিভাবে আবাসন ব্যবস্থা ও অনুদানের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশে বেশ কিছু এনজিও সংস্থা কাজ করলেও সরকারের পক্ষ হতে উল্লেখযোগ্য কোন উদ্যোগ নেই। এছাড়া করাইল বস্তিতে পানযোগ্য পানির অপ্রতুলতা এবং দুইটি পাম্পের পানি নিয়ে ব্যবসায়ীদের অবৈধ ব্যবসার কথা তুলে ধরে এর প্রতিকারের দাবি জানান তিনি। নিম্নআয়ের মানুষকে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভূক্ত করে সকলের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণের আহবান জানান তিনি।
এছাড়াও সংবাদ সম্মেলন উপস্থিত ছিলেন বিআইপির সহ সভাপতি-১ পরিকল্পনাবিদ সৈয়দ শাহরিয়ার আমিন, বিআইপির বোর্ড সদস্য পরিকল্পনাবিদ মোঃ মোসলেহ উদ্দীন হাসান, পরিকল্পনাবিদ উসওয়াতুন মাহেরা খুশি, পরিকল্পনাবিদ মোঃ ফাহিম আবেদীন এবং পরিকল্পনাবিদ নাহিদ আরিফীন সহ নাগরিক ও পেশাজীবিগগণ।
সংবাদ সম্মেলনের যৌথ আয়োজনে যুক্ত থাকা বিভিন্ন নাগরিক, পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠনসমূহ হচ্ছে - বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি), সেন্টার ফর এ্যাটমসফেরিক পলিউশন স্টাডিজ (ক্যাপস), ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্ট, বাংলাদেশ আরবান ফোরাম, সেন্টার ফর হাউজিং এন্ড বিল্ডিং রিসার্চ, ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি), ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), সেন্টার ফর ল' এন্ড পলিসি এফেয়ার্স, বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইনডিজেনাস নলেজ, ইনস্টিটিউট ফর ওয়েলবিং বাংলাদেশ, ধ্রুবতারা ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, উইমেন এন্ড ডিজএ্যাবিলিটিজ ফাউন্ডেশন, ইনস্টিটিউট অব ফরেস্টার বাংলাদেশ, বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন, তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলন, ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন এবং ১৯ নং ওয়ার্ড কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন, করাইল।
ছবি সংগৃহীত
২০১০ সালে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি ‘স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর’ বাংলাদেশকে বিনিয়োগের ‘উপযোগী’ হিসেবে ‘রেটিং’ দেওয়া শুরু করে। যেহেতু প্রথমবার রেটিং পায় বাংলাদেশ, মিডিয়ার আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
এরপর ২০১২ সালে বহুজাতিক বিনিয়োগ কোম্পানি গোল্ডম্যান স্যাকস তার ‘নেক্সট ইলেভেন’ তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকায় বাংলাদেশকে বলা হলো ‘বিশ্বের উঠতি অর্থনীতির একটি’। এর পরপরই বিশ্বের শীর্ষ ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক জেপি মরগ্যানের ‘ফ্রন্টিয়ার ফাইভে’র তালিকায়ও জায়গা পায় বাংলাদেশ। এরপর ২০১৭ সালে আরেকটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান প্রাইসওয়াটারহাউসকুপার্স ঘোষণা দিল, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৮তম বড় অর্থনীতি হবে। আর সেটাও হবে নাকি অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডসের মতো শক্তিশালী অর্থনীতিকে পেছনে ফেলে!
গার্মেন্টসের আয়, প্রবাসী আয়, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, একের পর এক চমক লাগানো মেগা প্রকল্প হচ্ছে, মিডিয়া উচ্ছ্বসিত, অর্থনীতিবিদেরাও খুশি।
অথচ কেউ জিজ্ঞেস করে না ‘নেক্সট ইলেভেন’, ‘ফ্রন্টিয়ার ফাইভ’ এগুলো কী জিনিস? এগুলো আসলে কার কাজে আসবে? ২৮তম বৃহৎ অর্থনীতির মানে কী? অর্থনীতি ‘২৮তম’ হলে গরিব মানুষেরা ঠিক কী সুবিধা পায়? মোটা চালের দাম কমে? আশুলিয়ায় ঘরভাড়া কমে? বাচ্চার দুধের খরচ দেয় সরকার? আর এই রেটিং এজেন্সিগুলো আসলে কারা? একেকটি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পেছনে তাদের ভূমিকা কী? ভালো রেটিংয়ের সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনমান বৃদ্ধির আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে?
রেটিং দেওয়া হয় মূলত বিনিয়োগকারীদের জন্য। বিদেশি ব্যাংক, বিদেশি কোম্পানি, বিপুল পরিমাণ অলস পুঁজি নিয়ে বসে আছে। তাদের দরকার নতুন দেশ, নতুন মার্কেট। বিদেশি বিনিয়োগকারী তো দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়। স্থানীয় মানুষের স্বার্থ রক্ষা হলো কি না, সেটা দেখা তার দায়িত্ব নয়। রেটিং ভালো মানে ব্যবসার ঝুঁকি কম। মানে সুদে–আসলে টাকা ফেরত আসবে। এজেন্সিগুলোর ‘রেটিং’ দেখেই ব্যাংক ঋণ দেয়, কোম্পানি বিনিয়োগ করে।
কিন্তু ভালো ‘রেটিং’ পেলেই কি উন্নয়ন হয়ে গেল? জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ইস্যুগুলোকে আড়ালে রেখে বিদেশিদের রেটিং বা ব্র্যান্ডিং নিয়ে মাতামাতি শেষ পর্যন্ত কী ফল দিল? বেশি বেশি বিদেশি ঋণ নিয়ে ২০২৩ সালে এসে বাংলাদেশের অবস্থাটা কী দাঁড়াল? অতিরিক্ত ঋণনির্ভর মেগা প্রকল্পগুলোয় অর্থনীতির অবস্থা ভালো হয়েছে, না খারাপ হয়েছে? রূপপুর, মাতারবাড়ী, পায়রা বা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র কি জনগণের ‘টার্মস’ মেনে হয়েছে? এখন ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে জনগণকে পিষ্ট করা কেন?
প্রশ্নবিদ্ধ ঋণ, ক্ষতিকর প্রকল্প
একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ মেগা প্রকল্পের অনুমোদন হয়েছে, প্রতিটা মেগা প্রকল্পই একেকটা ঋণের ফাঁদ, অথচ আমাদের অর্থনীতিবিদেরা সরকারি লোকদের মতোই বলে গেছেন, আমাদের ঋণ-জিডিপির অনুপাত অন্যান্য দেশের তুলনায় কম, তাই চিন্তা নেই। অথচ একের পর এক মেগা প্রকল্পের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত–বিধ্বস্ত প্রবাসী শ্রমিকের ঘাড়েই যে চড়তে হবে, সেই সতর্কবার্তা কি ছিল? মেগা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যে বেশির ভাগই অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর, সেই বিশ্লেষণ কি ছিল?
৫১ হাজার কোটি টাকার মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮৪ শতাংশই জাইকার ঋণ। ২১ হাজার কোটি টাকার মেট্রোরেলের ৭৫ শতাংশই জাইকার ঋণ। ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার রূপপুর প্রকল্পের ৮০ শতাংশই রাশিয়ার ঋণ! ২০১৫ সালেও আমাদের নিট বিদেশি ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ছিল মাত্র ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এখন হয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। মাত্র ৮ বছরের মাথায় বিদেশি ঋণ বেড়েছে ২০ গুণ! এই বছর থেকেই বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ ২১ শতাংশ বাড়বে। ২০২৬ সাল থেকে শুধু রূপপুর কেন্দ্রটির জন্যই রাশিয়াকে পরিশোধ করতে হবে বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা! অভ্যন্তরীণ ঋণ না হয় টাকা ছাপিয়ে শোধ করল, বিদেশি ঋণ কি ডলার ছাপিয়ে শোধ করবে?
কিন্তু এই সুদগুলো তো হঠাৎ আকাশ থেকে পড়েনি। ‘রেটিং ভালো’, ‘দেশ রোল মডেল হয়ে গেছে’—এসব দেশি–বিদেশি প্রচারণার পিঠে চড়েই তো দায়িত্বহীনভাবে দেশের জন্য ক্ষতিকর এসব প্রকল্পে লাগাতার ঋণ নেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধের পর ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত, এমনকি শ্রীলঙ্কায়ও মূল্যস্ফীতি কমে এসেছে, তেলের দামও কমেছে, শুধু আমাদের এই একটা দেশ, যেখানে গরিবের বাঁচা-মরার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি জরুরি পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। সাধারণ মানুষের মাছ, মাংস, ডিম খাওয়া বন্ধ হয়েছে, নতুন করে গরিব হয়েছে কয়েক কোটি মানুষ। ঋণের টাকায় বিলাসবহুল রোল মডেল তৈরি হয়েছিল, চীন, ভিয়েতনামকে ছাড়িয়ে বিশ্বের শীর্ষ বড়লোক বৃদ্ধির দেশে পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এখন কয়েক প্রজন্ম ধরে এই রোল মডেলের কিস্তিটা শোধ করবে কে? কম খাওয়া প্রবাসী শ্রমিক আর লোডশেডিংয়ে বিধ্বস্ত জনপদ?
‘ক্ষতিকর’ প্রকল্প বলা হচ্ছে কেন? কারণ, ঋণের টাকায় তৈরি প্রতিটা মেগা বিদ্যুৎ প্রকল্পই বিদেশি জ্বালানির ওপর শতভাগ নির্ভরশীল। শুধু রামপাল, পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতেই আগামী কয়েক দশক ধরে ১ কোটি টনেরও বেশি কয়লা আমদানি করতে হবে প্রতিবছর! ২০২৭ সাল নাগাদ বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি কয়লা আর এলএনজি আমদানি করতে হবে (দেখুন, ৫ বিলিয়ন ডলারই কষ্টসাধ্য, ২০ বিলিয়ন ডলারের সংস্থান হবে কি, বণিক বার্তা, ২০২৩)। অর্থাৎ এটা তো শুধু এক দফায় ঋণ করে ঘি খাওয়া না, বরং ঋণের টাকায় ঘি খাওয়ার রীতিমতো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত!
অথচ প্রতিটি আমদানিনির্ভর প্রকল্পের বিকল্প ছিল। সস্তা ও পরিবেশবান্ধব বিকল্পই ছিল। ভারত এক দশকে আমাদের চেয়ে দুই শ গুণ বেশি সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ তৈরি করেছে। এদিকে অন্তত তিনটি আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান (ইউএসজিএস, এনপিডি ও র্যাম্বল) বিভিন্ন সমীক্ষায় জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনাবিষ্কৃত গ্যাসের মজুত ৩২ টিসিএফের ওপর (প্রায় ৩০ বছরের মজুত।)
পেট্রোবাংলা (২০২২) বলছে, ‘আমাদের মোট চাহিদার ৭৩ শতাংশ গ্যাস আসে দেশি গ্যাসক্ষেত্র থেকে, খরচ পড়ে মাত্র পাঁচ হাজার কোটি টাকা, আর সেখানে বাকি ২৭ শতাংশ গ্যাস (এলএনজি) বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, খরচ পড়ে ৪৪ হাজার কোটি টাকা! তার মানে দেশি গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ রেখে, সৌর-বায়ুবিদ্যুৎকে অবহেলা করে, ঋণের টাকায় কি সব বিদেশি কয়লা, বিদেশি এলএনজিনির্ভর প্রকল্প বানাচ্ছি আমরা!
শুধু তা–ই নয়, ঋণের টাকায় বানানো হয়েছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ মুহূর্তে অলস বসে আছে ৯ হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা (অর্থাৎ ঋণ নিয়ে যা বানিয়েছি, তার অর্ধেক অলস বসে থাকে।) এগুলোকে আবার বসিয়ে বসিয়ে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দিতে হয়। এই টাকার বিপুল অংশ আবার পাচার হয়ে যায়। এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে প্রতিটি প্রকল্পের উদ্ভট খরচ।
কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা (২০১৮) বলছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মূলধনি ব্যয় বৈশ্বিক গড়ের চেয়েও অনেক বেশি (বৈশ্বিক গড় প্রতি কিলোওয়াটে ৫৫০ ডলার, বাংলাদেশের গড় খরচ ১ হাজার ডলার।) গবেষণা সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস’ বলছে, বাংলাদেশের মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র (দেখুন, ‘মাতারবাড়ী কোল প্ল্যান্ট ইন বাংলাদেশ কস্টস এইট টু টেন টাইমস মোর দ্যান কম্পেয়ারেবল প্ল্যান্টস ইন চায়না’ ২০২২।) এদিকে বিশ্বব্যাংক (২০১৭) বলছে, এডিবির ঋণে তৈরি বাংলাদেশের ঢাকা-মাওয়া রুটটি পৃথিবীর মধ্যেই সর্বোচ্চ খরচের রাস্তা।
কৌশিক বসুদের ‘বুমিং’ বাংলাদেশ ও অর্থনীতিবিদদের দায়
২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু নিউইয়র্ক টাইমস–এ কলাম লিখলেন: হোয়াই ইজ বাংলাদেশ বুমিং? বসু বাংলাদেশের ‘বুম’–এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন গার্মেন্টস খাতের বিকাশকে। গার্মেন্টস খাত বিকশিত হয়েছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু এই ‘বিকাশ’ কি টেকসই? গার্মেন্টসের কর্মসংস্থান কি দারিদ্র্য দূর করে? অক্সফাম (২০১৯) দেখিয়েছিল, পোশাকশ্রমিকদের ৯১ শতাংশই পর্যাপ্ত পরিমাণ খেতে পায় না। ৮৭ শতাংশই ঋণগ্রস্ত। (দেখুন, মেইড ইন পোভার্টি, অক্সফাম, ২০১৯)
এই যে অটোমেশন গ্রাস করছে পোশাক খাতকে, গাজীপুর, আশুলিয়া, টঙ্গীতে নিয়মিত হাজারে হাজারে ছাঁটাই হচ্ছে, এই যে লাগাতার অর্থনৈতিক মন্দায় পশ্চিমের মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, এই যে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে, পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলো কম মজুরিতে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি করছে, এভাবে শুধু একটি-দুটি খাতকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভটি গড়ে ওঠার বিপদগুলো নিয়ে বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদেরা কি সতর্ক করেন?
গার্মেন্টস আয়ের সীমাবদ্ধতা হলো, আয় করা ডলারের প্রায় অর্ধেক চলে যায় কাঁচামাল আমদানিতে। পাঁচ বছর ধরে গার্মেন্টস আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ চলে গেছে শুধু সুতা আর ফেব্রিক আমদানি করতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, গার্মেন্টস মালিকদের টাকা পাচার (দুদকের অভিযোগ, ‘ওভার-ইনভয়েসিংয়ের’ মাধ্যমে বছরে ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার করে শুধু বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মালিকরাই। দেখুন, দ্য নিউ এজ, ৩০ জানুয়ারি, ২০২১)। অর্থাৎ পোশাকশিল্প হচ্ছে সেই খাত যেখানে ডলার ঢোকে, আবার ডলার বেরিয়েও যায়।
খেয়াল করে দেখুন, বিদেশি কাঁচামাল, বিদেশি বাজার এবং বিদেশি কোম্পানির অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল শিল্পটি বিশ্বব্যাংক ও তার সমচিন্তার অর্থনীতিবিদদের একচেটিয়া মনোযোগ পেয়েছে সব সময়। অথচ সম্পূর্ণ দেশীয় কাঁচামালে তৈরি, দেশের ভেতরে দুর্দান্ত ‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’ তৈরি করা পরিবেশবান্ধব পাটশিল্প আর চিনিশিল্প নিয়ে তাদের বৈরী অবস্থান অবাক করার মতো। প্রশ্ন ওঠে, মূলধারার অর্থনীতিবিদেরা উচ্চ ঝুঁকির বিদেশি ঋণ, বিদেশি কোম্পানি, বিদেশি ‘অর্ডার’ ও বিদেশি বিনিয়োগকেই উন্নয়নের একমাত্র পথ হিসেবে দেখাতে চান কেন? স্থানীয় শিল্প, পরিবেশবান্ধব শিল্প, গ্রামীণ অর্থনীতি, বা স্থানীয়ভাবে তৈরি হওয়া লাখো কর্মসংস্থান নিয়ে আগ্রহ দেখান না কেন? পোশাকশিল্পের শ্রমিক ও প্রবাসী শ্রমিকের আয় নিয়ে গবেষণা করেন, কিন্তু ‘ম্যাক্রো’ অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে গিয়ে শ্রমিক যে আজীবন দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরোতে পারে না, তা নিয়ে চুপ থাকেন কেন?
এই যে অর্থনীতিবিদেরা অতিরিক্ত ঋণের ঝুঁকি নিয়ে আগের থেকে সতর্ক করেন না, এই যে রেটিং এজেন্সিগুলোর অতি উৎসাহী রেটিং–এর ওপর ভিত্তি করে ঋণের পাহাড় তৈরি হয়, এগুলো কি সব বিচ্ছিন্ন ঘটনা? নাকি মূলধারার অর্থনীতিবিদেরা ঋণভিত্তিক মেগা প্রকল্প এবং প্রচুর পরিমাণে ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনৈতিক লেনদেনকেই ‘বাড়ন্ত অর্থনীতি’ হিসেবে দেখান? নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান কিন্তু ২০০৮–এর বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে দায়ী করেছিলেন মূলধারার অর্থনীতিবিদদেরই। ফোর্বস ম্যাগাজিন দেখিয়েছিল, বিশ্বের সেরা অর্থনীতিবিদেরা ২০০৮-এর অর্থনৈতিক ধসের কিছুদিন আগেও আমেরিকার অর্থনীতির ফুলেফেঁপে ওঠা নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছিলেন (দেখুন, হাউ ইকোনমিস্টস কন্ট্রিবিউটেড টু দ্য ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইসিস, ২০১২)
আরেক নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ অর্থনৈতিক ধসের জন্য মূলত রেটিং এজেন্সিগুলোকেই দায়ী করেছিলেন। আমেরিকার ফিন্যান্সিয়াল ইনকোয়ারি কমিশন ২০০৮–এর বিপর্যয়ের কারণ তদন্ত করতে গিয়ে বলেছিল, এজেন্সিগুলো কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে ঋণ দেওয়াকে উৎসাহিত না করলে এই বিপর্যয় ঘটতই না। ক্রুগম্যান ২০০৯ সালে নিউইয়র্ক টাইমস–এ লিখেছিলেন তাঁর বহুল আলোচিত কলাম—হাউ ডিড দ্য ইকোনমিস্টস গেট ইট সো রং? তাঁর ভাষায়, অর্থনীতির ফাঁপা বেলুনকেই ‘উন্নয়ন’ হিসেবে দেখানো অর্থনীতিবিদদের একটি পুরোনো সমস্যা।
আমাদের এখানে দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্য নয়, শিক্ষা নয়, স্থানীয় শিল্পায়ন নয়, মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান নয়, স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ অর্থনীতি নয়, বৈষম্য দূরীকরণ নয়, বরং ঋণের টাকায় ফুলেফেঁপে ওঠা অর্থনীতির বেলুনটাকে নিয়েই এত দিন মাতামাতি করেছে সরকার। মেগা প্রকল্পে জিডিপি বেড়েছে, ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে মালিকের মুনাফা বেড়েছে, কিন্তু কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ মাত্র শুরু হয়েছে, এখনই ডলারে কুলাচ্ছে না। অভ্যন্তরীণ ঋণ শোধ করতে মধ্যবিত্তের গলায় পাড়া দিয়ে ট্যাক্স–ভ্যাটের আওতা বাড়ানো হচ্ছে।
যুদ্ধের পর ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত, এমনকি শ্রীলঙ্কায়ও মূল্যস্ফীতি কমে এসেছে, তেলের দামও কমেছে, শুধু আমাদের এই একটা দেশ, যেখানে গরিবের বাঁচা-মরার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি জরুরি পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। সাধারণ মানুষের মাছ, মাংস, ডিম খাওয়া বন্ধ হয়েছে, নতুন করে গরিব হয়েছে কয়েক কোটি মানুষ। ঋণের টাকায় বিলাসবহুল রোল মডেল তৈরি হয়েছিল, চীন, ভিয়েতনামকে ছাড়িয়ে বিশ্বের শীর্ষ বড়লোক বৃদ্ধির দেশে পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এখন কয়েক প্রজন্ম ধরে এই রোল মডেলের কিস্তিটা শোধ করবে কে? কম খাওয়া প্রবাসী শ্রমিক আর লোডশেডিংয়ে বিধ্বস্ত জনপদ? সূত্র: প্রথম আলো
● মাহা মির্জা, লেখক ও গবেষক