a
ছবি সংগৃহীত
আইনের শাসন যে কোনো সমাজে টেকসই শান্তি ও উন্নতির জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ। আইন সবকিছুর ঊর্ধ্বে এবং আইনের শাসনের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশে আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। সুশাসন ও সৎ বিচারব্যবস্থা ছাড়া আইনের শাসন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি একটি পূর্বশর্ত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ব্রিটিশ শাসনকাল ছাড়া উপমহাদেশের ইতিহাসে আমরা কখনো প্রকৃত অর্থে আইনের শাসনের অভিজ্ঞতা পাইনি।
আজকের বিশ্বে আইনের শাসনকে সমাজ শাসনের একটি কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিখ্যাত ব্রিটিশ আইনজ্ঞ এ. ভি. ডাইসি ‘আইনের শাসন’-এর প্রবক্তা। তিনি সমাজে শৃঙ্খলা ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আইনের গুরুত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। আইনের শাসনের তিনটি মূলনীতি হলো—
১. আইনকে স্বেচ্ছাচারীভাবে ব্যবহার করা যাবে না।
২. প্রতিটি নাগরিক আইনের চোখে সমান।
৩. নাগরিকদের অধিকার সংবিধানে নিশ্চিত থাকতে হবে।
কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, তার সামাজিক অবস্থান বা ক্ষমতা যাই হোক না কেন। "আপনি যত উচ্চ পদেই থাকুন না কেন, আইন আপনার ঊর্ধ্বে"—এই নীতিই আইনের শাসনের মূল আদর্শ।
স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও চ্যালেঞ্জসমূহ:
একটি স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ কাজ। যেহেতু পুরো বিষয়টি জটিল, তাই তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সুফল আসবে না। এ কাজে যথাযথ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের যুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিতেও কুণ্ঠাবোধ করা উচিত নয়, কারণ দক্ষ ও পেশাদার ব্যক্তিদের ছাড়া বিচারব্যবস্থার সংস্কার সম্ভব নয়।
একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থা গঠনে নতুন বিচারকদের নির্বাচন, নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এটি একদিনের মধ্যে সম্ভব নয়, তবে দেরি না করে অবিলম্বে কাজ শুরু করা উচিত।
বর্তমান বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা:
বর্তমান বিচারব্যবস্থা সমাজে প্রকৃত অর্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম নয়। এটি একটি ফ্যাসিবাদী সরকারকে সুবিধা দিতে গঠিত হয়েছে, জনগণের কল্যাণে নয়। তাই পুরো বিচারব্যবস্থা পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। যদিও বিচারকগণ বিচারব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি, তবে আইনজীবীদের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিচারব্যবস্থা শুধু বিচারকদের নিয়ে গঠিত নয়, আইনজীবীরাও এর অংশ। আইনজীবীদের মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা ও উৎসাহ সৃষ্টি করতে হবে।
আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার পুরোপুরি নির্ভর করে বিচারক ও আইনজীবীদের সততা ও পেশাদারিত্বের ওপর। যদি এই দুই সম্প্রদায়ের কোনো একটি দুর্নীতিগ্রস্ত হয় বা পেশাগতভাবে অযোগ্য হয়, তাহলে সমাজে আইনের শাসন কার্যকর করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তদন্ত ও অপরাধ বিচার ব্যবস্থায় সংস্কার:
অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অপরাধ তদন্ত কর্মকর্তাদের অবশ্যই সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল হতে হবে। অপরাধ দমন ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।
এ ছাড়াও, সমাজের দায়িত্বও কম নয়। জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কীভাবে সাধারণ মানুষ এই সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সহযোগিতা করতে পারে, তা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। নৈতিক শিক্ষার উন্নয়ন জনগণের চারিত্রিক পরিবর্তন আনতে পারে, যা এই লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থনৈতিক সংস্কার ও সামাজিক উন্নয়ন:
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গরিব জনগণের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। অন্যথায় কোনো সংস্কারই টেকসই ফল আনবে না। বেশিরভাগ অপরাধ দারিদ্র্যের কারণে সংঘটিত হয়, তাই মানুষের জীবনমান উন্নয়নে জরুরি অর্থনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক যাকাত ব্যবস্থা গরিব মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কার্যকর উপায় হতে পারে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা:
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম যদি সঠিকভাবে কাজ করে, তাহলে বিচারব্যবস্থা সংস্কার সহজ হবে। তারা একদিকে সমাজকে সচেতন করতে পারে, অন্যদিকে বিচারব্যবস্থার পর্যবেক্ষক হিসেবেও কাজ করতে পারে।
আইনের শাসনকে একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। সুশাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অপরিহার্য, তবে শুধু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যথেষ্ট নয়। সমগ্র সমাজকে এই আন্দোলনে অংশ নিতে হবে, তবেই টেকসই শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
লেখক: অধ্যাপক কর্ণেল আকরাম
সম্পাদক, মিলিটারি হিস্টোরি জার্নাল
ফাইল ছবি । গোলাম মাওলা রনি
শিরোনামের প্রবাদবাক্যটি কে রচনা করেছিলেন আমার জানা নেই। তবে আমাদের দেশের হাটে-ঘাটে-মাঠে তো বটেই এমনকি অন্দরমহলের একান্ত আলোচনাতেও প্রবাদটি এত বেশি আলোচিত হয় যার কারণে এটি এখন আবু বঙ্গালা অথবা মুঞ্জালাদের দেশে যেন সর্বাধিক উচ্চারিত বেদবাক্যে পরিণত হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ায় যে পরাজিত হয় সে কাঙাল প্রজারূপে নিজেকে রাজার আসন থেকে নামিয়ে নিয়ে আসে স্বেচ্ছায় এবং সব দায়-দায়িত্ব বিজয়ীর ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে রাজা বানিয়ে অভিসম্পাত করতে গিয়ে বলে ওঠে, রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট, প্রজা কষ্ট পায়! স্বামী-স্ত্রী ছাড়া অন্যান্য সম্পর্ক বা শ্রেণীপেশার লোকজন যখন স্বার্থের সঙ্ঘাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় তখন হাজারো ঐতিহ্যবাহী গালিগালাজের পাশাপাশি ভদ্র ভাষায় যে অভিসম্পাত দেয়া হয় সেগুলোর মধ্যে আজকের শিরোনামের প্রবাদ বাক্যটিই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়।
রাজা কে- অথবা প্রজা কে কিংবা রাজার কোন দোষে প্রজা কষ্ট পায় তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে দুটো শব্দের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন। প্রথম শব্দটি হলো- আবু বঙ্গালা। মধ্যযুগের বিখ্যাত ঐতিহাসিক মিনহাজ উস সিরাজ তার তুযুকে ফিরোজশাহী গ্রন্থে আবু বঙ্গালা শব্দটি ব্যবহার করেছেন। দিল্লির সম্রাট ফিরোজ শাহ তুখলক যখন বাংলায় এসেছিলেন বিদ্রোহ দমনের জন্য, তখন তার সাথে মিনহাজ উস সিরাজও ছিলেন। তখনকার দিনে যারা বাঙালিদের নেতৃত্ব দিতেন তাদের আবু বঙ্গালা অর্থাৎ বাঙালিদের পিতা বলা হতো। মিনহাজ উস সিরাজের মতে- তখন বাংলা প্রদেশে শত শত আবু বঙ্গালা ছিল যারা মূলত গোত্রপতি এবং জায়গিরদার বা সরকারের পক্ষে খাজনা আদায়কারীরূপে আখ্যায়িত হতেন। তারা যোদ্ধা ছিলেন এবং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নির্ধারিত সংখ্যক সৈন্য পুষতেন।
আবু বঙ্গালারা জায়গীর লাভ করতেন দিল্লির সম্রাটের কাছ থেকে। সুতরাং সম্রাটের প্রয়োজনে তারা তাদের পোষ্য সৈন্যসহ সম্রাটের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ বিজর্সন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। এমনকি সম্রাট যদি তার নিযুক্ত প্রাদেশিক গভর্নরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেন সে ক্ষেত্রে নিয়ম মোতাবেক আবু বঙ্গালারা সম্রাটের বাহিনীর সঙ্গে একীভূত হয়ে যুদ্ধ করতেন এবং এটাই শত শত বছর ধরে চলে আসছিল সারা ভারতবর্ষে। তবে ভারতের অন্যান্য অংশের জায়গিরদাররা যেভাবে দিল্লির প্রয়োজনে বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্ব পালন করতেন তা কিন্তু প্রায়ই বাংলায় এসে উল্টো রূপ ধারণ করত। অর্থাৎ আবু বঙ্গালারা সুযোগ পেলেই কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করত এবং কোনো প্রাদেশিক গভর্নর যদি বিদ্রোহ করত তবে তারা নিয়োগকর্তার অবদান ভুলে বিদ্রোহীর পক্ষ অবলম্বন করত।
আবু বঙ্গালাদের উল্লেখিত চরিত্রের কারণে দিল্লির নিযুক্ত গভর্নররা এ দেশে এসেই স্বাধীন ও সার্বভৌম শাসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন এবং প্রায়ই বিদ্রোহ করে বসতেন। দিল্লির সুলতানি আমল থেকে শুরু করে মোঘল পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত ছিল। ফলে বাংলার ঘন ঘন বিদ্রোহ নিয়ে দিল্লিকে তটস্থ থাকতে হতো। মিনহাজ উস সিরাজ যে সময়ের কথা বলছেন সেটা সম্ভবত ১৩৫৩ সাল ছিল। মিনহাজের মতে দিল্লির কেন্দ্রীয় বাহিনী যখন যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলো তখন আবু বঙ্গালারা তাদের সৈন্য সামন্তসহ ফিরোজ শাহ তুঘলকের পক্ষ ত্যাগ করে গভর্নর ইলিয়াস শাহের পক্ষ নিলো। ইলিয়াস বারবার চেষ্টা করছিলেন আত্মসমর্পণ করার জন্য। কিন্তু আবু বঙ্গালারা তাকে যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করতে থাকল। ফলে একটি অসম যুদ্ধে ইলিয়াস শাহের পরাজয় ঘটল এবং হাজার হাজার বঙ্গালা সৈন্য মারা পড়ল।
আবু বঙ্গালাদের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে এবার মুঞ্জালা শব্দ নিয়ে কিছু বলি। এটি একটি চৈনিক শব্দ। চীন দেশে অন্তত হাজার খানেক জনপ্রিয় চীনা ভাষা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে মান্ডারিন এবং ক্যান্টনিজ ভাষায় সংখ্যাগরিষ্ঠ চীনা কথা বলে। এই দুটি ভাষার বাইরে গুয়ানিজ এবং সাংহায়ানিজ ভাষাও অত্যন্ত জনপ্রিয়। গুয়াংসু প্রদেশের বেশির ভাগ লোকের কথ্য ভাষার নাম গুয়ানিজ। অন্য দিকে বৃহত্তম সাংহাই এলাকার লোকজন সাংহায়ানিজ ভাষায় কথা বলে। আজকের নিবন্ধে আমি যে মুঞ্জালা শব্দের কথা বলছি তা মূলত সাংহাই অঞ্চলের শব্দ। এই এলাকার অধিবাসীরা বাংলাদেশের লোকজনকে মুঞ্জালা বলে ডাকে। আপনি যদি কখনো ওই এলাকায় যান তবে তারা আপনাকে বাংলাদেশীর পরিবর্তে মুঞ্জালা বলে সম্বোধন করবে। সাংহাই বিমানবন্দরে বাংলাদেশী পাসপোর্ট দেখামাত্র ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তারা ফিসফাস করে মুঞ্জালা মুঞ্জালা বলে আরো কিসব কথাবার্তা তাদের সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করে এবং পাসপোর্টটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার পরখ করতে থাকে।
ব্যবসায়িক কাজে আমাকে একটা সময় খুব ঘন ঘন চীন যেতে হতো। আমি সাধারণত ঢাকা থেকে সরাসরি হংকং যেতামÑ তারপর সেখানকার কাজ সেরে সোজা সাংহাই যেতাম। তারপর অভ্যন্তরীণ রুট ব্যবহার করে চীনের অন্যান্য শহর-বন্দরে যেতাম। এর বাইরে সিঙ্গাপুর-ব্যাংকক অথবা কুয়ালালামপুরে কাজ থাকলে সেখান থেকেও সরাসরি সাংহাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যেতাম এবং প্রত্যেকবারই লক্ষ্য করতাম যে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা আমার পাসপোর্টটি হাতে নিয়ে ১০-১২ মিনিট ধরে নাড়াচাড়া করত এবং একটু পরপর আমার দিকে তাকাত। এরপর মাইক্রোফোনে চীনা ভাষায় যেন কিসব বলত যার মধ্যে শুনতে শুনতে আমি মুঞ্জালা শব্দটি মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। আমি আমার স্বাভাবিক কমনসেন্স দ্বারা অনুধাবন করতাম যে, আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তারা আমার গতিবিধি এবং মতিগতি বুঝার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, ডেস্কে বসা কর্মকর্তাটি আমার পাসপোর্টের পাতা উল্টাতে উল্টাতে আমার ভ্রমণবৃত্তান্ত হয়তো তার কর্তৃপক্ষকে জানাত।
আমাকে কোনো দিন অন্য কোনো চীনা বিমানবন্দরে জিজ্ঞাসাবাদ তো দূরের কথা এমনকি কোনো প্রশ্নও তারা করেনি। কেবল সাংহাই বিমানবন্দরে উল্লিখিত উপায়ে কালক্ষেপণ করাত। এ অবস্থায় আমার মনে প্রশ্ন জাগল ওরা কেন বাঙালিদের দেখলে মুঞ্জালা মুঞ্জালা বলছে এবং বেশির ভাগ বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীকে হয়রানি করছে। এ অবস্থায় সাংহাইতে আমাদের কোম্পানির এজেন্ট রিচার্ডকে বিষয়টি বললাম। কিন্তু সে কোনো সদুত্তর দিতে পারল না। এরপর আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম মুঞ্জলা শব্দের অর্থ কি। সে আমার কথা শুনে কিছুটা বিব্রত হলো এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করল প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমি যখন নাছোড়বান্দার মতো তাকে চেপে ধরলাম তখন সে জানাল যে মুঞ্জালা অর্থ বোকা বা নির্বোধ মানুষের দেশ। এ ঘটনার পর আমি আর কোনো দিন সাংহাই বিমানবন্দর দিয়ে ইন করিনি। আবু বঙ্গালা এবং মুঞ্জালা নিয়ে বহু মজার কাহিনী এবং অনেক ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি দেয়া যাবে। কিন্তু আমি ওদিকে না গিয়ে আজকের শিরোনাম প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু করতে চাই। আবু বঙ্গালাদের কারণে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে অসংখ্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বিগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে যার ফলে সাধারণ জনগণের দুঃখ দুর্দশা বা কষ্টের কোনো সীমা পরিসীমা ছিল না। অধিকন্তু আমাদের দেশকাল সমাজে আবু বঙ্গালা প্রবৃত্তির নেতা পাতিনেতা চামচা ও সুবিধাভোগীদের আধিক্য এবং তাদের প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে যুগ যুগ ধরে আমজনতা নির্যাতিত নিপীড়িত ও বঞ্চিত হয়ে আসছে। ফলে আমাদের গড়পড়তা সাধারণ বুদ্ধি বা কমনসেন্স কমতে কমতে রীতিমতো তলানিতে ঠেকেছে। তা ছাড়া আমাদের সেন্স বা মানসিক সুস্থতার সূচকও অন্যান্য দেশের তুলনায় নিম্নগামী। আমরা যদি আমাদের সেনসিবিলিটি বা অনুভব শক্তি অর্থাৎ মানুষের সুকুমার মনোবৃত্তি আবেগ এবং সংবেদনশীলতাকে মূল্যায়ন করার ক্ষমতার কথা বিবেচনা করি তবে জাতিগতভাবে লজ্জিত হতে হবে।
আমরা যদি আমাদের সেন্স অব হিউমার বিশ্লেষণ করি তবে দেখতে পাব যে, এই অসাধারণ মানবিক গুণটি স্থূল হতে হতে রীতিমতো গর্ভবতী গর্দভ বা গন্ডারের পেটের মতো হয়ে গেছে। আমাদের সেনটিমেন্ট বা হৃদয়ানুভূতি কবে যে সেন্সলেস অর্থাৎ নির্বোধ, মূঢ় বা অর্থহীন হয়ে পড়েছে তা বোঝার জন্য মুঞ্জালা শব্দের অর্থ এবং ব্যাখ্যা সংবলিত চৈনিক টিকা গ্রহণের বিকল্প নেই। উল্লিখিত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যদি রাজা এবং প্রজার সমীকরণ করতে চাই তবে দেখতে পাবো যে, আবু বঙ্গালা প্রকৃতির নেতৃত্ব থাকলে প্রজাদের দুর্ভোগ যেমন বাড়ে তেমনি প্রজারা এক সময় মানবিক গুণাবলি হারিয়ে মুঞ্জালার বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। এমন অবস্থায় প্রজাদের ওপর প্রকৃতিগতভাবেই নিকৃষ্ট রাজা চেপে বসে। আর নিকৃষ্ট রাজার অদ্ভুত সব পাগলামো এবং নির্বুদ্ধিতা কিভাবে প্রজাদের জীবনকে জাহান্নামে রূপান্তর করে ফেলে তার কিছু পরোক্ষ উদাহরণ আমরা মিনহাজ উস সিরাজের তুযুকে ফিরোজশাহীতে এবং ইবনে বতুতার ভ্রমণ বৃত্তান্তে পেয়ে যাবো।
ইতিহাসের পাঠকরা নিশ্চয়ই জানেন যে, আমাদের রাজনীতি অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থায় যখন মারাত্মক কোনো অসঙ্গতি অনিয়ম এবং আজব তামসার ঘটনা ঘটে তখন আমরা সাধারণত সেটিকে তুঘলকি কাণ্ড বলে থাকি। সর্বভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েক হাজার বছরের রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি যদি বিচার বিশ্লেষণ করা হয়, তবে সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক এবং পরে ফিরোজ শাহ তুঘলকের জমানায় যেসব পরস্পরবিরোধী কর্মকাণ্ড ঘটেছে তার সাথে অন্য কোনো রাজা বাদশাহদের রাজত্বকালের তুলনা চলে না। এই দুই তুঘলকি শাসকের কারণে রাজধানী দিল্লি দুইবার বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে। মুহাম্মদ বিন তুঘলক দিল্লি থেকে রাজধানী দেবগিরিতে স্থানান্তর করতে গিয়ে ভারতের অর্থনীতির সর্বনাশ ঘটিয়েছেন এবং প্রচণ্ড রক্তপাত নিষ্ঠুরতা ও অহেতুক যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে লাখ লাখ লোকের প্রাণ সংহার করেছেন। তিনি রাজনীতি সিংহাসন এবং রাজপ্রাসাদকে এতটাই ভয়ঙ্কর বানিয়ে ফেলেছিলেন যে, তার মৃত্যুর পর কেউ সুলতান হতে চায়নি এবং পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই একমাত্র বিরল ঘটনা যে ভারতবর্ষের মতো বৃহত্তম সাম্রাজ্যের সম্রাটের মৃত্যুর পর কেউ সিংহাসনে বসতে চায়নি- ফলে পুরো তিন দিন সিংহাসন খালি ছিল।
উল্লিখিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সাম্রাজ্যের আমির-ওমরাহ, আলেম-ওলামা এবং উজির-নাজিররা একরকম জোর করে সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের চাচাতো ভাই ফিরোজ শাহ তুঘলককে সিংহাসনে বসান ১৩৫১ সালের ২৩ শে মার্চ। তিনি প্রায় ৩৭ বছর রাজত্ব করেন। কিন্তু আশা আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছার বিপরীতে পাওয়া বিশাল সাম্রাজ্যটিকে তিনি আল্লাহর মাল দরিয়ায় ঢাল এইরূপ মনোভাব নিয়ে পরিচালনা করতে থাকেন। তিনি বাংলা ও উড়িষ্যা ছাড়া অন্য কোনো অঞ্চলে যুদ্ধাভিযান চালাননি। ফলে দিল্লি শাসিত অঞ্চলের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যায়। তিনি যুদ্ধ বিগ্রহে জড়াতেন না। কাউকে ক্ষেপাতেন না। উল্টো আলেম ওলামা সেনাপতি কোতোয়ালদের তোয়াজ তদবির করতেন। তিনি অনেক ভালো ভালো কাজ করেছেন কিন্তু রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি কুশাসন ও অবিচার অনাচারের জন্য সর্বকালের ইতিহাস ভঙ্গ করেছেন। তার আমলে যে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি হতো অমনটি মানবজাতির ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্র কোনো কালে ঘটেনি। কথিত আছে সুলতান নিজে তার কর্মচারীদের কাছ থেকে কাজ আদায়ের জন্য গোপনে ঘুষ দিতেন।
সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের কারণে কেবল দিল্লির সিংহাসন নয় পুরো ভারতবর্ষের রাজনীতি ধ্বংস হয়ে যায়। বাংলার আবু বঙ্গালারা দলে দলে তাদের সাঙ্গোপাঙ্গ মুঞ্জালাদের নিয়ে দিল্লিতে আসর জমাতে থাকেন। এভাবেই ৩৭টি বছর পার হয়। সুলতানের মৃত্যুর পর তার দুর্বল উত্তরাধিকারীরা গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং ১০ বছরের গৃহযুদ্ধে তুঘলকি রাজ্যের প্রজাদের জীবনে যে নরক যন্ত্রণা চলছিল তাতে ঘি ঢেলে দেয়ার জন্য বিশ্ববিখ্যাত বিজেতা তৈমুর লং দিল্লি আক্রমণ করেন এবং দিল্লিকে নরককুণ্ড বানিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিরানভূমিতে পরিণত করেন।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য/সূত্র: নয়া দিগন্ত
ফাইল ফটো: হাজী সেলিম
ঢাকা-৮ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিমকে বিচারিক আদালতের ১৩ বছরের সাজার আদেশের মেয়াদ কমিয়ে ১০ বছরের সাজা বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে তাকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত।
সাজার বিরুদ্ধে হাজী সেলিমের আপিল আবেদন খারিজ করে মঙ্গলবার বিচারপতি মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের কপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে হাজী সেলিমকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে। রায়ে তথ্য গোপন দায়ে দেওয়া তিন বছরের সাজা বাতিল করেছেন আদালত। আদালতে দুদকের পক্ষে শুনানি করেন- আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান। তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
হাইকোর্টে হাজী সেলিমের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল তামান্না ফেরদৌস।
এর আগে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য ৯ মার্চ দিন নির্ধারণ করেন হাইকোর্ট। ওই দিন এ মামলার যাবতীয় নথি (এলসিআর) তলব করেছিলেন আদালত।
ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৭ এর বিচারককে ওই নথি পাঠাতে নির্দেশও দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। দুদকের আবেদনের শুনানি নিয়ে ২০২০ সালের ১১ নভেম্বর হাইকোর্ট এ আদেশ দেন।
২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে হাজী সেলিমের বিরুদ্ধে লালবাগ থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ওই মামলায় ২০০৮ সালের ২৭ এপ্রিল তাকে ১৩ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন বিচারিক আদালত।
এরপর ২০০৯ সালের ২৫ অক্টোবর হাজী সেলিম ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন। পরে ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি হাইকোর্ট এক রায়ে তার সাজা বাতিল করেন।
পরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে দুদক। ওই আপিলের শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি হাইকোর্টের রায় বাতিল করে আবারও হাইকোর্টকে হাজী সেলিমের আপিলের শুনানি করতে নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ। ওই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটির শুনানির জন্য উদ্যোগী হয় দুদক।