a
ছবি সংগৃহীত
সংকট জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এটি ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে সমান গুরুত্বপূর্ণ। সংকট সমাধানের জন্য তার মূলসূত্র জানা অপরিহার্য। যদি সংকটের প্রকৃত কারণ বোঝা না যায়, তাহলে ব্যক্তিগত বা জাতীয়—কোনো ক্ষেত্রেই কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকেই নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে ভুগছে।
আমাদের জাতীয় সংকটের শেকড় মূলত রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতায় নিহিত। দেশভাগের আগের সময়টিতে আমাদের ভাগ্য ভালো ছিল যে কিছু উজ্জ্বল মুসলিম নেতা পেয়েছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দেশভাগের পর সঠিক নেতৃত্বের অভাব দেখা দেয়।
পাকিস্তান শুরু থেকেই তীব্র নেতৃত্ব সংকটে পড়েছিল। প্রথমত, প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুর পর দেশটি গভীর সংকটে পড়ে। এরপর লিয়াকত আলী খানের হত্যার মাধ্যমে পাকিস্তান নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। পাকিস্তানের সেই দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে খাজা নাজিমুদ্দিন নেতৃত্বে এলেও তার মৃত্যুর পর সংকট আরও গভীর হয়। চৌধুরী মোহাম্মদ আলী (বগুড়া) এবং পরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হয়, যা ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের পতনের মাধ্যমে শেষ হয়।
পূর্ব পাকিস্তান থেকে তিনজন প্রধানমন্ত্রী আসলেও আমাদের জনগণ তখনো রাজনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছিল। যদিও পাকিস্তান তখন 'উন্নয়নের দশক' পার করছিল, কিন্তু একইসঙ্গে গণতান্ত্রিক চর্চা ধ্বংস হয়েছিল, যা জাতীয় ঐক্যের ব্যর্থতার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দুর্বল নেতৃত্ব ও সামরিক শাসনের সুযোগ নিয়ে ভারত তার পূর্ব পাকিস্তানি এজেন্টদের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ছিল ভারতীয় রাজনৈতিক সংযোগের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ, যা স্বাধীনতার পর শেখ মুজিব নিজেই স্বীকার করেছিলেন।
নিঃসন্দেহে, বাংলাদেশের জন্ম ভারতীয় কৌশলগত রাজনীতির ফল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভারত পূর্ব পাকিস্তানে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা শুরু করেছিল। যদিও আমরা একাত্তরে স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতীয় রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছি। এখন ভারত ১৯৭১ সালের বিজয়কে তার নিজের জয় হিসেবে তুলে ধরতে চায়।
ভারত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে শুরু থেকেই নিজের উপর নির্ভরশীল করার চেষ্টা করেছে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে ভারতের উপনিবেশে পরিণত করা এবং আমাদের নেতৃত্ব তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলো—বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দুর্বল করা। ভারত এতে সফল হয়েছে, আমাদের নেতৃত্বকে কার্যত শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে।
আমাদের দুর্ভাগ্য যে, দূরদর্শী ও যোগ্য নেতৃত্ব এখনো আমরা পাইনি, ব্যতিক্রম শুধু জিয়াউর রহমান। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ভারতের আধিপত্যবাদী রাজনীতি বুঝতে পেরেছিলেন এবং একটি টেকসই রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক জাতীয় রাজনীতির অবসান ঘটে।
১৯৮১ সালের মে মাসে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর থেকে আমরা নেতৃত্ব সংকটে ভুগছি। গত চার দশকে সমাজের জন্য যোগ্য নেতাদের তৈরি করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি, এমনকি বিএনপিও তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।
বর্তমানে আমাদের জাতীয় জীবন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রকৃত পেশাদার নেতৃত্বের অভাব সর্বস্তরে দৃশ্যমান। গত সরকার কৌশলে সমাজের সব স্তর থেকে নেতৃত্ব বিকাশের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগকে দিয়ে একটি পারিবারিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যা শেখ হাসিনা অত্যন্ত সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছেন জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর নতুন পরিবেশে আমরা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। প্রথমত, এই বিপ্লবের কিছু অংশগ্রহণকারী বিপ্লবের চেতনাকে অগ্রাহ্য করছে। বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন এবং নবগঠিত এনসিপি (NCP) গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়গুলোর—বিশেষ করে নির্বাচন ও সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্যে আসতে পারছে না।
তারা জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে দলীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যা জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে যাচ্ছে। অথচ জুলাই বিপ্লবে ছাত্ররা অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে, যা ইতিহাস কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে।
তবে নেতৃত্বের জন্য শুধু আবেগ নয়, অভিজ্ঞতাও জরুরি। অল্পবয়সী ছাত্ররা এখনো রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যথেষ্ট পরিপক্ব নয়। তাদের ধাপে ধাপে রাজনীতি, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। আমরা তাদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ছেড়ে দিতে পারি না, কারণ এটি কোনো পরীক্ষার বিষয় নয়। তাদের ধৈর্য ধরতে হবে এবং প্রকৃত নেতা হয়ে উঠতে হবে।
আমাদের সমাজের নেতৃত্ব সংকট দূর করতে হলে সুপরিকল্পিত নেতৃত্ব তৈরির কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু শেখ হাসিনা তার ভারতীয় প্রভুদের সহায়তায় ইচ্ছাকৃতভাবে এই প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করেছেন।
জনপ্রশাসনের কোনো খাতই তিনি অক্ষত রাখেননি। যদি নেতৃত্ব বিকাশের জন্য জরুরি সংস্কার না করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব ধরে রাখতে পারবে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে, যা তাদের স্থানীয় দোসরদের সহায়তায় ভারত অত্যন্ত সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে।
যোগ্য ও মেধাবী মানুষ ছাড়া আমাদের পক্ষে এই বিশাল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে টিকে থাকা অসম্ভব। ভারতের সমাজে মেধাবী ও দক্ষ মানুষের অভাব নেই। শুধু আবেগ ও বড় বড় কথা বলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
আমরা এখনো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নিতে পারিনি, অথচ নেতৃত্ব সংকট এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের হাতে সময় খুবই কম। এখনই যদি নেতৃত্ব গঠনের ওপর গুরুত্ব না দিই, তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ সংকটে পড়বে।
লেখক: ড. শেখ আকরাম আলী
কলাম লেখক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক, মুক্তসংবাদ প্রতিদিন
ছবি: মুক্তসংবাদ প্রতিদিন
মুন্না শেখ, জবি প্রতিনিধি: তিন দফা দাবি নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘লং মার্চ টু যমুনা’ কর্মসূচিতে বাধা দেয় পুলিশ । আগত শিক্ষার্থীদের উপর অমানবিক লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল-সাউন্ড গ্রেনেড ও গরম পানি নিক্ষেপ করে পুলিশ। । এ ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকসহ আহত হয়েছেন শতাধিক। আহতদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন
রয়েছে । প্রতিবাদে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা রাজধানীর কাকরাইল মসজিদ এলাকায় সড়কের সামনে বসে পড়েন।
উল্লেখ্য যে, প্রথমে গুলিস্তান মাজার গেটে বাধার সম্মুখীন হন আন্দলনকারীরা। বাধা অতিক্রম করে মৎস্য ভবনের দিকে যেতে থাকলে দ্বিতীয় দফায় ওখানে আবার পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। এবারও তারা বাধা উপেক্ষা করে যমুনা অভিমুখে এগিয়ে যেতে থাকেন। পরবর্তীতে কাকরাইল সংলগ্ন এলাকায় পৌছালে টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, গরম পানি নিক্ষেপ করতে শুরু করে। এতে জবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দিন, সহকারী প্রক্টর নোইম সিদ্দিকি ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক নাসির উদ্দিন, জবি ছাত্রদলের সদস্য সচিব সামছুল আরেফিন,
সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহাতাব হোসেন লিমন, জবি প্রেসক্লাবের সভাপতি সুবর্ণ আসসাইফ সহ শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।
গুরুতর আহত হন জার্নালিজম বিভাগের শিক্ষার্থী ওমর ফারুক জিলন, তাকে কয়েকজন পুলিশ ঘেরাও করে মারতে মারতে রাস্তায় ফেলে দেয় এবং তার বুকের উপর পাড়া দেয়। তারপর থেকেই সে অজ্ঞান হয়ে যায়। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি। পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী সাদমানের বাম কানের পর্দা ফেটে রক্তক্ষরণ হয় ।
এ সময় বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও আহত হন। তাদের মধ্যে রয়েছেন- বাসসের সাংবাদিক নাজিদ, ঢাকা ট্রিবিউন এর জবি প্রতিনিধি সোহান, দৈনিক সংবাদের জবি প্রতিনিধি মেহেদী, ডেইলি ক্যাম্পাসের সাংবাদিক আরিফ, স্বদেশ প্রতিদিনের জবি প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম সহ অনেকে।
দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা উপস্থিত শিক্ষক - শিক্ষার্থীদের।
জবিয়ানদের তিন দফা দাবি হলো-
১. আবাসনব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭০% শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন বৃত্তি ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে কার্যকর করতে হবে
২. জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ বাজেট কাটছাঁট না করেই অনুমোদন করতে হবে
৩. জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ পরবর্তী একনেক সভায় অনুমোদন করে অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
ফাইল ছবি: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
দেশের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের ভবিষ্যত জীবনের কথা বিবেচনা করে বহুল আলোচিত সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বৃহস্পতিবার (১৭ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বজনীন পেনশনের চারটি কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। কর্মসূচিগুলো হচ্ছে প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা।
অর্থ বিভাগের সূত্রানুযায়ী, আজ থেকেই ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী যে কেউ পেনশন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। ৫০ বছরের বেশি বয়সীরাও বিশেষ বিবেচনায় পেনশনভুক্ত হতে পারবেন। তবে এর জন্য তাকে টানা ১০ বছর চাঁদা পরিশোধ করতে হবে। এরপর তিনি যে বয়সে উপনীত হবেন, সেই বয়স থেকে পেনশন শুরু হবে।
বাকিদের ক্ষেত্রে পেনশন দেওয়া শুরু হবে ৬০ বছর বয়সের পর। এরপর তিনি যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন মাসে মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের পেনশন পাবেন। তবে চাঁদাদাতা মারা গেলে তার নমিনি বা উত্তরাধিকারী পেনশন পাবেন চাঁদাদাতার ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত। অর্থাৎ কোনো চাঁদাদাতা যদি ৬০ বছর বয়সে মারা যান, তাহলে তার ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত অর্থাৎ ১৫ বছর তার নমিনি পেনশন সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের জারি করা সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা অনুযায়ী এ নিয়মই অনুসরণ করা হবে বলে জানিয়েছেন বিধিমালা প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা। বিধিমালায় আজীবন পেনশনের ব্যাপারে অবশ্য স্পষ্ট কিছু বলা নেই।
কারা এই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন
অর্থ বিভাগের বিধিমালা অনুযায়ী, ১৮ বছরের বা তদূর্ধ্ব বয়স থেকে ৫০ বছর বয়সী জাতীয় পরিচয়পত্রধারী সব বাংলাদেশি নাগরিক এতে অংশ নিতে পারবেন। ৫০ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সের নাগরিকগণও স্কিমে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে স্কিমে অংশ নেওয়ার তারিখ থেকে ১০ বছর চাঁদা প্রদান শেষে তিনি যে বয়সে উপনীত হবেন সেই বয়স থেকে আজীবন পেনশন প্রাপ্য হবেন। প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকগণ যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, তারা পাসপোর্টের ভিত্তিতে নিবন্ধন করতে পারবেন। তবে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণ করে এর অনুলিপি কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় থাকা ব্যক্তিগণ তাদের জন্য প্রযোজ্য স্কিমে অংশ নিতে পারবে। তবে শর্ত থাকে যে, স্কিমে অংশগ্রহণ করার আগে সংশ্লিষ্ট সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা সমর্পণ করতে হবে। দেশে ও প্রবাসে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নির্ধারিত ফরম অনলাইনে পূরণ করে আবেদন করা যাবে। এর বিপরীতে একটি ইউনিক আইডি নম্বর প্রদান করা হবে। মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যাংকিং বা ডেবিট, ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে চাঁদা পরিশোধ করা যাবে।
চার ধরনের স্কিম:
‘প্রবাস’ কর্মসূচিটি শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য। তারা বৈদেশিক মুদ্রায় চাঁদা দেবেন, তবে মেয়াদ পূর্তিতে তারা দেশীয় মুদ্রায় পেনশন পাবেন।
‘প্রগতি’ কর্মসূচিটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবীদের জন্য। এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের ৫০ শতাংশ চাঁদা চাকরিজীবীরা নিজে ও মালিকপক্ষ ৫০ শতাংশ হারে বহন করবে। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্মসূচি বা স্কিমে অংশ নিতে না চাইলে ঐ প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা নিজ উদ্যোগে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন।
‘সুরক্ষা’ কর্মসূচিটি হচ্ছে রিকশাচালক, কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতিসহ স্বকর্মে নিয়োজিত নাগরিকদের জন্য। আর ‘সমতা’ কর্মসূচিটি হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য, যাদের বার্ষিক আয় ৬০ হাজার টাকার কম।
সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী সংস্থা হচ্ছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। আপাতত অর্থ বিভাগের আওতাধীন সংস্থা হবে এটি। এ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে গত মাসে নিয়োগ পেয়েছেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কবিরুল ইজদানী খান।
নমিনি না উত্তরাধিকারী: বিধিমালায় বলা হয়েছে, মারা গেলে অর্থ কে পাবেন, সেজন্য চাঁদাদাতা এক বা একাধিক নমিনি মনোনয়ন করতে পারবেন। যে কোনো সময় একজন বা সব নমিনিই পরিবর্তন করে নতুন নমিনি মনোনয়নের সুযোগ থাকবে। চাঁদাদাতা বা পেনশনধারী মারা গেলে এবং তার মৃত্যুর পর নমিনি মনোনয়ন কার্যকর থাকলে পেনশনের অর্থ নমিনি পাবেন। তবে নমিনি নাবালক হলে পেনশনধারীর মৃত্যুর পর নমিনি সাবালক না হওয়া পর্যন্ত নমিনির পক্ষে অর্থ তুলতে পারবেন চাঁদাদাতার মনোনয়ন বা নিয়োগ দেওয়া যে কোনো ব্যক্তি। তিনিই হবেন নাবালক নমিনির আইনসম্মত অভিভাবক। নমিনি সাবালক না হওয়া পর্যন্ত ঐ ব্যক্তি নাবালক নমিনির প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য হবেন।
কোনো স্কিমের চাঁদাদাতা মাসিক পেনশন পাওয়ার উপযুক্ত হওয়ার আগেই মারা গেলে তার নমিনি বা নমিনিরা অথবা নমিনির অবর্তমানে উত্তরাধিকারী বা উত্তরাধিকারীরা মুনাফাসহ জমা করা অর্থ ফেরত পাবেন। নমিনির অবর্তমানে উত্তরাধিকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের সনদ বিবেচনায় নেবে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি অর্থসচিব বরাবর আপিল করার সুযোগ পাবেন। আপিল কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেটাই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
মানসিক ভারসাম্যহীন হলে কী হবে:
বিধিমালায় বলা হয়েছে, পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে কোনো চাঁদাদাতা যদি চাঁদা দেওয়ার জন্য অসমর্থ হয়ে পড়েন, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ ঐ ব্যক্তির নমিনি বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীর ওপর কর্মসূচির স্বত্ব ন্যস্ত করতে পারবে। তারা কর্মসূচিটি চালিয়ে নিতে পারবেন এবং মেয়াদ শেষে পেনশন ভোগ করতে পারবেন। চাঁদাদাতা নিখোঁজ হয়ে গেলে নমিনি বা উত্তরাধিকারী থানায় সাধারণ ডায়েরি করে পেনশন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন এবং কর্মসূচি চালিয়ে নিতে পারবেন। নিখোঁজ হওয়ার সাত বছর পার হওয়ার মধ্যে চাঁদাদাতা ফিরে না এলে তার কর্মসূচিটি স্থগিত করা হবে।
বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, চাঁদাদাতা শারীরিক ও মানসিকভাবে অসমর্থ হয়ে গেলে এবং অসমর্থের কারণে কর্মহীন ও উপার্জনে অক্ষম হয়ে পড়লে চাঁদাদাতাকে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন করতে হবে। তখন তাকে অসচ্ছল চাঁদাদাতা হিসেবে ঘোষণা দেবে পেনশন কর্তৃপক্ষ। চাঁদাদাতার অসচ্ছলতা নির্ণয়ে মেডিক্যাল বোর্ড গঠিত হবে এবং অসচ্ছল হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর এক বছর পর্যন্ত চাঁদা না দিলেও পেনশন হিসাব স্থগিত হবে না।
চাঁদার হার: চার ধরনের পেনশন কর্মসূচির মধ্যে প্রবাস কর্মসূচিতে ১৮ বছর বয়সী একজন প্রবাসী যদি মাসে ১০ হাজার টাকা করে জমা দেন, তবে ৪২ বছর পর তিনি মাসে পাবেন ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫৫ টাকা করে। আবার ১৮ বছর বয়সী বেসরকারি কোনো চাকরিজীবী যদি মাসে ৫ হাজার টাকা করে জমা দেন, তাহলে তিনি ৪২ বছর পর মাসে পাবেন ১ লাখ ৭২ হাজার ৩২৭ টাকা করে। সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায়ও ১৮ বছর বয়সীরা কেউ যদি ৫ হাজার টাকা করে মাসে জমা দিয়ে পেনশনে যুক্ত হন, তাহলে ৪২ বছর শেষে তিনিও মাসে ১ লাখ ৭২ হাজার ৩২৭ টাকা করে পাবেন।
সুরক্ষা স্কিমে ১, ২, ৩ ও ৫ হাজার টাকা করে মাসিক চাঁদা দেওয়া যাবে। আর প্রগতি স্কিমে ২, ৩ ও ৫ হাজার টাকা চাঁদা দেওয়া যাবে। প্রবাসী স্কিমে ৫, সাড়ে ৭ ও ১০ হাজার টাকার স্কিম গ্রহণ করা যাবে। ১০ হাজার টাকা চাঁদা পরিশোধে ১০ বছর পর পেনশন পাওয়া যাবে ১৫ হাজার ৩০২ টাকা। আর ৫ হাজার মাসিক চাঁদায় ১০ বছর পর পেনশন পাওয়া যাবে ৭ হাজার ৬৫১ টাকা।
তবে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নির্ধারিত সমতা পেনশন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের মাসিক চাঁদার অর্ধেক দেবে সরকার। সমতা কর্মসূচিতে একজন অংশগ্রহণকারীকে মাসে দিতে হবে ৫০০ টাকা, এর বিপরীতে সরকার দেবে আরও ৫০০ টাকা। এভাবে কেউ যদি ৪২ বছর ১ হাজার টাকা করে জমা দেন, তাহলে মেয়াদ শেষে তিনি মাসে পেনশন পাবেন ৩৪ হাজার ৪৬৫ টাকা করে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চাঁদা দিতে না পারলে পরের এক মাসের মধ্যে জরিমানা ছাড়া চাঁদা দেওয়া যাবে। এক মাস পার হলে পরের প্রতিদিনের জন্য ১ শতাংশ হারে জরিমানা দিয়ে হিসাব সচল করা যাবে। মাসের নাম উল্লেখ করে অগ্রিম চাঁদা দেওয়ারও সুযোগ রাখা হয়েছে। চাঁদা মাসিক, ত্রৈমাসিক বা বার্ষিক ভিত্তিতে দেওয়ারও সুযোগ থাকবে। চাঁদাদাতা নিজের ও পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা, গৃহনির্মাণ, গৃহ মেরামত এবং সন্তানের বিয়ের ব্যয় মেটাতে তার জমা করা অর্থের ৫০ শতাংশ ঋণ নিতে পারবেন, যা শোধ করতে হবে ২৪ কিস্তিতে। সূত্র: ইত্তেফাক