a
ছবি সংগৃহীত
সংকট জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এটি ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে সমান গুরুত্বপূর্ণ। সংকট সমাধানের জন্য তার মূলসূত্র জানা অপরিহার্য। যদি সংকটের প্রকৃত কারণ বোঝা না যায়, তাহলে ব্যক্তিগত বা জাতীয়—কোনো ক্ষেত্রেই কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকেই নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে ভুগছে।
আমাদের জাতীয় সংকটের শেকড় মূলত রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতায় নিহিত। দেশভাগের আগের সময়টিতে আমাদের ভাগ্য ভালো ছিল যে কিছু উজ্জ্বল মুসলিম নেতা পেয়েছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দেশভাগের পর সঠিক নেতৃত্বের অভাব দেখা দেয়।
পাকিস্তান শুরু থেকেই তীব্র নেতৃত্ব সংকটে পড়েছিল। প্রথমত, প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুর পর দেশটি গভীর সংকটে পড়ে। এরপর লিয়াকত আলী খানের হত্যার মাধ্যমে পাকিস্তান নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। পাকিস্তানের সেই দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে খাজা নাজিমুদ্দিন নেতৃত্বে এলেও তার মৃত্যুর পর সংকট আরও গভীর হয়। চৌধুরী মোহাম্মদ আলী (বগুড়া) এবং পরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হয়, যা ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের পতনের মাধ্যমে শেষ হয়।
পূর্ব পাকিস্তান থেকে তিনজন প্রধানমন্ত্রী আসলেও আমাদের জনগণ তখনো রাজনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছিল। যদিও পাকিস্তান তখন 'উন্নয়নের দশক' পার করছিল, কিন্তু একইসঙ্গে গণতান্ত্রিক চর্চা ধ্বংস হয়েছিল, যা জাতীয় ঐক্যের ব্যর্থতার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দুর্বল নেতৃত্ব ও সামরিক শাসনের সুযোগ নিয়ে ভারত তার পূর্ব পাকিস্তানি এজেন্টদের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ছিল ভারতীয় রাজনৈতিক সংযোগের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ, যা স্বাধীনতার পর শেখ মুজিব নিজেই স্বীকার করেছিলেন।
নিঃসন্দেহে, বাংলাদেশের জন্ম ভারতীয় কৌশলগত রাজনীতির ফল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভারত পূর্ব পাকিস্তানে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা শুরু করেছিল। যদিও আমরা একাত্তরে স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতীয় রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছি। এখন ভারত ১৯৭১ সালের বিজয়কে তার নিজের জয় হিসেবে তুলে ধরতে চায়।
ভারত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে শুরু থেকেই নিজের উপর নির্ভরশীল করার চেষ্টা করেছে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে ভারতের উপনিবেশে পরিণত করা এবং আমাদের নেতৃত্ব তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলো—বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দুর্বল করা। ভারত এতে সফল হয়েছে, আমাদের নেতৃত্বকে কার্যত শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে।
আমাদের দুর্ভাগ্য যে, দূরদর্শী ও যোগ্য নেতৃত্ব এখনো আমরা পাইনি, ব্যতিক্রম শুধু জিয়াউর রহমান। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ভারতের আধিপত্যবাদী রাজনীতি বুঝতে পেরেছিলেন এবং একটি টেকসই রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক জাতীয় রাজনীতির অবসান ঘটে।
১৯৮১ সালের মে মাসে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর থেকে আমরা নেতৃত্ব সংকটে ভুগছি। গত চার দশকে সমাজের জন্য যোগ্য নেতাদের তৈরি করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি, এমনকি বিএনপিও তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।
বর্তমানে আমাদের জাতীয় জীবন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রকৃত পেশাদার নেতৃত্বের অভাব সর্বস্তরে দৃশ্যমান। গত সরকার কৌশলে সমাজের সব স্তর থেকে নেতৃত্ব বিকাশের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগকে দিয়ে একটি পারিবারিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যা শেখ হাসিনা অত্যন্ত সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছেন জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর নতুন পরিবেশে আমরা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। প্রথমত, এই বিপ্লবের কিছু অংশগ্রহণকারী বিপ্লবের চেতনাকে অগ্রাহ্য করছে। বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন এবং নবগঠিত এনসিপি (NCP) গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়গুলোর—বিশেষ করে নির্বাচন ও সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্যে আসতে পারছে না।
তারা জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে দলীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যা জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে যাচ্ছে। অথচ জুলাই বিপ্লবে ছাত্ররা অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে, যা ইতিহাস কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে।
তবে নেতৃত্বের জন্য শুধু আবেগ নয়, অভিজ্ঞতাও জরুরি। অল্পবয়সী ছাত্ররা এখনো রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যথেষ্ট পরিপক্ব নয়। তাদের ধাপে ধাপে রাজনীতি, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। আমরা তাদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ছেড়ে দিতে পারি না, কারণ এটি কোনো পরীক্ষার বিষয় নয়। তাদের ধৈর্য ধরতে হবে এবং প্রকৃত নেতা হয়ে উঠতে হবে।
আমাদের সমাজের নেতৃত্ব সংকট দূর করতে হলে সুপরিকল্পিত নেতৃত্ব তৈরির কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু শেখ হাসিনা তার ভারতীয় প্রভুদের সহায়তায় ইচ্ছাকৃতভাবে এই প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করেছেন।
জনপ্রশাসনের কোনো খাতই তিনি অক্ষত রাখেননি। যদি নেতৃত্ব বিকাশের জন্য জরুরি সংস্কার না করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব ধরে রাখতে পারবে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে, যা তাদের স্থানীয় দোসরদের সহায়তায় ভারত অত্যন্ত সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে।
যোগ্য ও মেধাবী মানুষ ছাড়া আমাদের পক্ষে এই বিশাল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে টিকে থাকা অসম্ভব। ভারতের সমাজে মেধাবী ও দক্ষ মানুষের অভাব নেই। শুধু আবেগ ও বড় বড় কথা বলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
আমরা এখনো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নিতে পারিনি, অথচ নেতৃত্ব সংকট এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের হাতে সময় খুবই কম। এখনই যদি নেতৃত্ব গঠনের ওপর গুরুত্ব না দিই, তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ সংকটে পড়বে।
লেখক: ড. শেখ আকরাম আলী
কলাম লেখক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক, মুক্তসংবাদ প্রতিদিন
ছবি সংগৃহীত
আইনের শাসন যে কোনো সমাজে টেকসই শান্তি ও উন্নতির জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ। আইন সবকিছুর ঊর্ধ্বে এবং আইনের শাসনের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশে আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। সুশাসন ও সৎ বিচারব্যবস্থা ছাড়া আইনের শাসন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি একটি পূর্বশর্ত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ব্রিটিশ শাসনকাল ছাড়া উপমহাদেশের ইতিহাসে আমরা কখনো প্রকৃত অর্থে আইনের শাসনের অভিজ্ঞতা পাইনি।
আজকের বিশ্বে আইনের শাসনকে সমাজ শাসনের একটি কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিখ্যাত ব্রিটিশ আইনজ্ঞ এ. ভি. ডাইসি ‘আইনের শাসন’-এর প্রবক্তা। তিনি সমাজে শৃঙ্খলা ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আইনের গুরুত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। আইনের শাসনের তিনটি মূলনীতি হলো—
১. আইনকে স্বেচ্ছাচারীভাবে ব্যবহার করা যাবে না।
২. প্রতিটি নাগরিক আইনের চোখে সমান।
৩. নাগরিকদের অধিকার সংবিধানে নিশ্চিত থাকতে হবে।
কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, তার সামাজিক অবস্থান বা ক্ষমতা যাই হোক না কেন। "আপনি যত উচ্চ পদেই থাকুন না কেন, আইন আপনার ঊর্ধ্বে"—এই নীতিই আইনের শাসনের মূল আদর্শ।
স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও চ্যালেঞ্জসমূহ:
একটি স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ কাজ। যেহেতু পুরো বিষয়টি জটিল, তাই তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সুফল আসবে না। এ কাজে যথাযথ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের যুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিতেও কুণ্ঠাবোধ করা উচিত নয়, কারণ দক্ষ ও পেশাদার ব্যক্তিদের ছাড়া বিচারব্যবস্থার সংস্কার সম্ভব নয়।
একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থা গঠনে নতুন বিচারকদের নির্বাচন, নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এটি একদিনের মধ্যে সম্ভব নয়, তবে দেরি না করে অবিলম্বে কাজ শুরু করা উচিত।
বর্তমান বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা:
বর্তমান বিচারব্যবস্থা সমাজে প্রকৃত অর্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম নয়। এটি একটি ফ্যাসিবাদী সরকারকে সুবিধা দিতে গঠিত হয়েছে, জনগণের কল্যাণে নয়। তাই পুরো বিচারব্যবস্থা পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। যদিও বিচারকগণ বিচারব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি, তবে আইনজীবীদের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিচারব্যবস্থা শুধু বিচারকদের নিয়ে গঠিত নয়, আইনজীবীরাও এর অংশ। আইনজীবীদের মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা ও উৎসাহ সৃষ্টি করতে হবে।
আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার পুরোপুরি নির্ভর করে বিচারক ও আইনজীবীদের সততা ও পেশাদারিত্বের ওপর। যদি এই দুই সম্প্রদায়ের কোনো একটি দুর্নীতিগ্রস্ত হয় বা পেশাগতভাবে অযোগ্য হয়, তাহলে সমাজে আইনের শাসন কার্যকর করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তদন্ত ও অপরাধ বিচার ব্যবস্থায় সংস্কার:
অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অপরাধ তদন্ত কর্মকর্তাদের অবশ্যই সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল হতে হবে। অপরাধ দমন ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।
এ ছাড়াও, সমাজের দায়িত্বও কম নয়। জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কীভাবে সাধারণ মানুষ এই সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সহযোগিতা করতে পারে, তা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। নৈতিক শিক্ষার উন্নয়ন জনগণের চারিত্রিক পরিবর্তন আনতে পারে, যা এই লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থনৈতিক সংস্কার ও সামাজিক উন্নয়ন:
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গরিব জনগণের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। অন্যথায় কোনো সংস্কারই টেকসই ফল আনবে না। বেশিরভাগ অপরাধ দারিদ্র্যের কারণে সংঘটিত হয়, তাই মানুষের জীবনমান উন্নয়নে জরুরি অর্থনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক যাকাত ব্যবস্থা গরিব মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কার্যকর উপায় হতে পারে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা:
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম যদি সঠিকভাবে কাজ করে, তাহলে বিচারব্যবস্থা সংস্কার সহজ হবে। তারা একদিকে সমাজকে সচেতন করতে পারে, অন্যদিকে বিচারব্যবস্থার পর্যবেক্ষক হিসেবেও কাজ করতে পারে।
আইনের শাসনকে একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। সুশাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অপরিহার্য, তবে শুধু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যথেষ্ট নয়। সমগ্র সমাজকে এই আন্দোলনে অংশ নিতে হবে, তবেই টেকসই শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
লেখক: অধ্যাপক কর্ণেল আকরাম
সম্পাদক, মিলিটারি হিস্টোরি জার্নাল
ঢাকা জেলায় যে পরিমাণ টাকা আছে, সারা দেশ মিলিয়েও তা নেই। আবার ঋণ ও আমানতের পরিমাণের দিক দিয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে বরিশাল। রংপুরের মানুষেরা ব্যাংকে যতটুকু আমানত রেখেছে, তার চেয়ে তাদের ঋণ বেশি। এ হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোর ঋণ ও আমানতের অঞ্চলভিত্তিক একটি চিত্র তুলে ধরে। দেখা যায়, দারিদ্র্যপ্রবণ বিভাগ রংপুরে মানুষের মাথাপিছু আমানত সবচেয়ে কম। মাথাপিছু আমানত বেশি ঢাকায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানত ছিল প্রায় ১০ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। পাঁচ বছর আগে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে আমানতের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা। বাজারে ব্যাংকের দেওয়া ঋণের পরিমাণ ৮ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা, যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি।
কোন বিভাগে কত
বিভাগ হিসেবে আমানত ও ঋণ ঢাকায় বেশি। ঢাকা বিভাগের ব্যাংকের শাখাগুলোতে মোট আমানত এসেছে ৬ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট আমানতের প্রায় ৬১ শতাংশ।
এর পরে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। সেখানে আমানতের পরিমাণ ২ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট আমানতের প্রায় ২২ শতাংশ। আমানতের দিক দিয়ে এর পরের অবস্থানে রয়েছে খুলনা। ওই বিভাগে আমানতের পরিমাণ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
এ ছাড়া সিলেটে ৪২ হাজার কোটি, রাজশাহীতে ৪০ হাজার কোটি, রংপুরে ২০ হাজার কোটি, বরিশালে সাড়ে ১৯ হাজার কোটি ও ময়মনসিংহে ১৫ হাজার কোটি টাকার আমানত রয়েছে।
আরো পড়ুন: হার্ট অ্যাটাক করে হাসপাতালে ভর্তি সৌরভ গাঙ্গুলি
ঋণ বিতরণের দিক দিয়েও ঢাকা স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে। এই বিভাগে দেশের ব্যাংক-ব্যবস্থার মোট ঋণের ৬৭ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে। পরিমাণের দিক থেকে তা ৫ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকা।
চট্টগ্রামে ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ১৯ শতাংশ। ঋণ বিতরণে এর পরে রয়েছে খুলনা, পরিমাণ প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা।
এ ছাড়া রাজশাহীতে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি, রংপুরে ২০ হাজার কোটি, ময়মনসিংহে ১২ হাজার কোটি, সিলেটে ১০ হাজার কোটি ও বরিশালে ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
মাথাপিছু আমানতে পিছিয়ে রংপুর
বিভাগের আকার ও জনসংখ্যার কারণে পরিমাণগত দিক বিবেচনায় সঠিক চিত্র না-ও পাওয়া যেতে পারে। মাথাপিছু হিসাবই আসল চিত্র দেয়। সেদিক দিয়েও এগিয়ে ঢাকা। এই বিভাগে মানুষের মাথাপিছু আমানতের পরিমাণ দেড় লাখ টাকার মতো।
চট্টগ্রামে এর পরিমাণ ৭০ হাজার টাকা। এ ছাড়া সিলেটে মাথাপিছু আমানত ৩৭ হাজার, খুলনায় ২৪ হাজার, বরিশালে ২১ হাজার, রাজশাহীতে ১৯ হাজার, ময়মনসিংহে ১১ হাজার ও রংপুরে ১১ হাজার টাকার কিছু কম।
মাথাপিছু ঋণও ঢাকায় বেশি। এই বিভাগে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৩৯ হাজার টাকার মতো। চট্টগ্রামে মাথাপিছু ঋণ ৪৯ হাজার টাকা। এ ছাড়া খুলনায় ১৯ হাজার, রাজশাহীতে ১৫ হাজার, রংপুরে ১১ হাজার, ময়মনসিংহে ১০ হাজার, বরিশালে ৯ হাজার ৭০০ ও সিলেটে ৯ হাজার টাকার মাথাপিছু ঋণ রয়েছে।
ব্যবসা-বাণিজ্য ঢাকাকেন্দ্রিক
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন জেলায় কলকারখানা ও ব্যবসা করলেও ঋণ নিয়েছেন রাজধানীর ব্যাংকের শাখাগুলো থেকেই। বেশির ভাগ চাকরিজীবী ঢাকায় অবস্থান করায় আমানতও এখানেই বেশি জমা পড়ছে।
এ জন্যই ঢাকায় বড় বড় করপোরেট শাখা খুলেছে ব্যাংকগুলো। আর এলাকার চেয়ে ঢাকার শাখাগুলোতে মিলছে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা।
এদিকে চট্টগ্রাম বিভাগে বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও আমানত ও ঋণ সেভাবে নেই। গত পাঁচ বছরে ঋণও সেভাবে বাড়েনি। চট্টগ্রাম বিভাগের ২ লাখ ২৭ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা আমানতের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলার আমানতই ১ লাখ ৫১ হাজার ৬১০ কোটি টাকা।
আর বিভাগের ১ লাখ ৬০ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ১ লাখ ৩৭ হাজার ২২০ কোটি টাকা ঋণই চট্টগ্রাম জেলায়। ২০১৩ সালে শুধু চট্টগ্রাম জেলায় আমানত ও ঋণ ছিল যথাক্রমে ৭৭ হাজার ৯৫৩ কোটি ও ৭৪ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা।
চট্টগ্রামে কর্মরত ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, বড় ব্যবসায়ীদের বড় অংশই ঢাকার প্রধান শাখা বা করপোরেট শাখার সঙ্গে লেনদেন করে। তাই ঋণও ওই শাখায়।
আর চট্টগ্রামের সব শাখার ঋণ দেওয়ার সীমাও বেশি নয়। চট্টগ্রামে যা ঋণ রয়েছে, তার বড় অংশই আবার খাতুনগঞ্জ, আগ্রাবাদ শাখায়।