a
ফাইল ছবি
নিউজ ডেস্কঃ রাজনৈতিক খেলা দেশের জাতীয় রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি শেষ পর্যন্ত সংবিধান দ্বারা নির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। রাজনৈতিক খেলা সংবিধানে অনুমোদিত এবং দেশের সব প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি জাতীয় নির্বাচনে চূড়ান্ত খেলার অংশগ্রহণ করে। চূড়ান্ত খেলা দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় এবং যারা সংসদে অধিক সিট পায় তারা সরকার গঠন করে। এটি বিশ্বের প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি সাধারণ প্রথা, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতও রয়েছে।
রাজনৈতিক খেলার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস রয়েছে এবং এটি প্রথম শুরু হয় ইংল্যান্ডে ১৬৮৯ সালের বিল অব রাইটসের পর। সেখানে উইগ পার্টি এবং টোরি পার্টি রাজনৈতিক খেলা শুরু করেছিল, এবং পরবর্তীতে তারা যথাক্রমে কনজারভেটিভ পার্টি এবং লেবার পার্টি নামে পরিচিত হয়। যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক খেলা দীর্ঘদিন ধরে দ্বিদলীয় রাজনীতি হিসেবে চলে আসছে, যা এখন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপে পরিণত হয়েছে।
ভারতে ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যায়ে ১৯৩৫ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে দ্বিদলীয় রাজনৈতিক খেলা শুরু হয় এবং এর চূড়ান্ত ফলস্বরূপ ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দেশভাগ ঘটে। পাকিস্তানের সূচনা থেকে রাজনৈতিক খেলা সুষ্ঠু ও ন্যায্যভাবে অনুষ্ঠিত হয়নি এবং এর চূড়ান্ত পরিণতি ছিল পাকিস্তানের ভাঙন এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম। পাকিস্তানে রাজনৈতিক খেলা পুরো বিশ বছর ধরে ন্যায্যতার অভাবে চলে এবং ভারত বাংলাদেশ দলের পাশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জন্য খেলা জিততে সাহায্য করে।
বাংলাদেশের শুরু পাকিস্তানের মতোই ছিল এবং খুব শীঘ্রই ১৯৭৫ সালের শুরুতে বাকশাল ঘোষণার মাধ্যমে রাজনৈতিক খেলায় সুষ্ঠুতা শেষ হয়ে যায়। আমাদের জন্য এটি খুব দুঃখজনক যে আমাদের দেশে একদলীয় রাজনীতি প্রবর্তিত হয়।
এটি শুধুমাত্র জিয়াউর রহমানই ছিলেন যিনি দেশে বহু দলীয় রাজনীতি চালু করেছিলেন যাতে সুষ্ঠু রাজনৈতিক খেলা হতে পারে, তবে এটি দীর্ঘস্থায়ী ছিল না এবং এরশাদ শাসনামলে সুষ্ঠু রাজনৈতিক খেলা বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের সাথে পরিবর্তন আসে এবং সুষ্ঠু রাজনৈতিক খেলার সুযোগ আসে, এবং বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো দ্বি-দলীয় রাজনীতি শুরু হয়। এটি ভালভাবে চলছিল এবং দেশে একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল। তবে এরশাদ পতনের পর পরই যে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল, তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মঈন-ফকর সরকার দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে এবং একটি মনগড়া নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনতে পেরেছিল, যার ফলে সুষ্ঠু রাজনীতি ধ্বংস হয় এবং একদলীয় রাজনৈতিক খেলা আবার ফিরে আসে, যা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের মাধ্যমে একদলীয় রাজনীতি পতন পর্যন্ত চলে।
দেশের পুরো জাতি সুষ্ঠু রাজনৈতিক খেলার প্রত্যাশায় ছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের ভাল সংকেত দিচ্ছে না। এটি মনে হচ্ছে নতুন চ্যালেঞ্জগুলি আমাদের সামনে রয়েছে যা শুধু সাম্প্রতিক বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত ঐক্যকেই নয়, দেশের রাজনীতিকে স্থিতিশীলতা থেকেও বিপথে চালিত করতে পারে।
এমন সম্ভাবনা রয়েছে যে, কিছু বিদেশী শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় তথাকথিত "কিং পার্টি" উঠতে পারে এবং ছাত্রদের নেতৃত্বে একটি নতুন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসবে, দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের সহযোগিতায়।
এটি দেশের জন্য এবং জাতির জন্য ভালো সংকেত নয়, এবং দেশ আবার এক কঠিন সংকটে পড়বে, যা খুব শীঘ্রই সমাধান হবে না।
এখন জাতীয় ঐক্য অত্যন্ত প্রয়োজন এবং বিএনপি যে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে তা আমাদের এই সংকট থেকে উত্তরণে সাহায্য করতে পারে, ইনশাআল্লাহ।
লেখকঃ সম্পাদক, মিলিটারি হিস্ট্রি জার্নাল
ছবি সংগৃহীত
কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের নাগরিক সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার কিছু সময় পর গণঅধিকার পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি ফারুক হাসানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ হামলায় জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান।
শনিবার রাতে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এমন অভিযোগ করেন।
খোমেনী ইহসান তার পোস্টে বলেন, ‘জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের সমাবেশে হামলার নেপথ্যে জাতীয় নাগরিক কমিটির সারজিস আলম জড়িত। হামলাকারীরা এক সময় যুবদল করলেও বর্তমানে সারজিসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সারজিস আমাদের নাগরিক সমাবেশ বানচালে জড়িত থাকার অডিও ক্লিপস আমি এক ছাত্র উপদেষ্টার কাছে পাঠিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘সারজিস কোটা বিরোধী আন্দোলনের সময় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে জড়িত ছিল এবং আন্দোলনকে থামিয়ে দিতে বারবার ষড়যন্ত্র করেও আমাদের হস্তক্ষেপে ব্যর্থ হয়েছিল। সারজিস ৫ আগস্টের পর বিপ্লবী সাজলেও আমরা তার বিরোধিতা অব্যাহত রাখি।সে সচিবালয়সহ বহু জায়গায় নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত ছিল। এনিয়ে আমরা সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সরকারের কাছে আপত্তি জানাই। পরবর্তীতে ছাত্রদের একজনের কারণে তার বিষয়ে ছাড় দেই।’
জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের এই নেতা বলেন, ‘সারজিস হয়তো ভাবছে তার নরমালাইজেশন হয়ে যাওয়ায় সে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে গেছে। না ভাই এমনটি মনে করো না। আমরা সমর্থন প্রত্যাহার করলে তোমরা কয়দিন টিকতে পারবে তা গুণে দেখ। আমরা ছাত্রদের ব্যর্থ দেখতে চাই না বলে তোমাদের সঙ্গে বিরোধিতায় যেতে চাই না। কিন্তু এর মানে এও নয় যে, দলগত ছাড় সবার কপালে জুটবে।’
আরেকটি স্ট্যাটাসে খোমেনী বলেন, আমি সরকারের কাছে যে অডিও ক্লিপিংস জমা দিয়েছি তাতে স্পষ্ট শোনা যায়, সারজিস আলম বলছে- ‘জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের সমাবেশে কোনো শহিদ পরিবার যোগ দিলে ভালো হবে না’।
প্রসঙ্গত, শনিবার বিকালে জুলাই হত্যাকাণ্ডসহ বিগত ১৫ বছরের একাধিক হত্যাকাণ্ডের বিচার, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে বিপ্লবী সরকার গঠনসহ একাধিক দাবিতে নাগরিক সমাবেশের আয়োজন করে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ। অনুষ্ঠানে ফারুক হাসানকে বিশেষ অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
ফারুক হাসান তার বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারব্যবস্থার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সংবিধান ছুড়ে দিয়ে আমরা বিপ্লবী সরকার করেছি। আমরা অন্তর্বর্তী সরকার চাইনি। এই বিপ্লব না হওয়ার পেছনে ৫ আগস্ট যারা সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেছে, তাদের হাত আছে।
পৃথক আরেক পোস্টে খোমেনী ইহসান বলেন, ‘ফারুক হাসানের ওপর হামলাকারীদের সঙ্গে সারজিসের ছবি, জাতীয় নাগরিক কমিটির মিটিংয়ে হামলাকারীদের উপস্থিতির ছবিও ফেসবুকে আছে। তাই তাদের ছবি ও পরিচয় সবার কাছেই স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর হামলার নেপথ্য নায়ক সারজিসকে বাদ দিয়ে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদকে দোষারোপ করার নোংরা প্রচারণা টিকবে না। আমাদের কর্মসূচিতে হামলা হওয়ার পর উল্টা আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের নোংরামি করা সব তরুণ নেতাই জব্দ হবে ইনশাআল্লাহ।’
ফারুক হাসানকে নিয়ে আরেকটি পোস্ট জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের এই নেতা বলেন, সে আমাদের পছন্দের মানুষ ও সজ্জন। তার ওপর আমাদের কারো হামলা করার প্রশ্নই আসে না। বরং আমাদের ওপর হামলা করতে এসে ফারুককে হামলা করেছে। খেয়াল করলে দেখবেন, হামলাকারীরা ফারুককে মেরেছে বর্তমান সরকার ভেঙে বিপ্লবী সরকার গঠনের কথা বলায়। আমাদের আজকের রূপরেখার মূল প্রস্তাব কিন্তু বর্তমান সরকার ভেঙে বিপ্লবী সরকার গঠনের বিষয়েই ছিল। তাই হামলাকারীর ফারুকের মুখে বিপ্লবী সরকারের কথা শুনেই তার ওপর ঝাপিয়ে পড়েছে।
একই পোস্টে সারজিসের প্রসঙ্গ টেনে খোমেনী বলেন, আমরা শহিদ পরিবারদের কাছে সারজিসদের মুখোশটা খুলে দিতে পেরেছি। খেয়াল করলে দেখবেন যে সব শহিদ মিডিয়ার ফোকাসে নাই, যাদের পরিবার গরিব অসহায়, তারাই আমাদের সমাবেশে এসেছিলেন। এই মানুষগুলো দিনের পর দিন ঘুরে সারজিসদের দেখা পেত না। এখন তারা আরেকটি প্লাটফর্ম পাওয়ায় শহিদদের নিয়ে ওদের ব্যবসা ধরে টান পড়েছে। শহিদরা আজ জাতীয় বিপ্লবী পরিষদে আসছে, কাল বিএনপিতে যাবে। শহিদরা অন্য জায়গায় সমাদৃত হলে সারজিসদের মনোপলি শেষ। সূত্র: যুগান্তর
ছবি: মুক্তসংবাদ প্রতিদিন
সাইফুল আলম , ঢাকা: বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাত অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। তবে বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল এবং যে পরিমাণ বরাদ্দ হয়, তারও একটা বড় অংশ প্রকৃতপক্ষে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায় না। সেক্ষেত্রে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেয়, এমন কর্মসূচি যেমন- বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা ইত্যাদি কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দিয়ে যেগুলো দারিদ্র্য বিমোচনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, এমন কর্মসূচিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা থেকে বাদ দিতে হবে।
আজ ২৬ জুন ২০২৫, বৃহস্পতিবার, ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’ নেটওয়ার্কের আয়োজনে ‘বৈষম্য নিরসনে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও জাতীয় বাজেট’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব বলেন। এতে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ এর সাধারণ সম্পাদক ও ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী’র সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ সাইদুর রহমান খান। এছাড়া সম্মানীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের সমন্বয়কারী ও ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক কানিজ ফাতেমা’র সঞ্চালনায় আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) এর গবেষণা পরিচালক ড. এস এম জুলফিকার আলী। এছাড়াও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, যুব ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী, সংশ্লিষ্ট অংশীজন এতে অংশগ্রহণ করেন।
মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে মহসিন আলী বলেন, আজকের এই পর্যালোচনার সাথে আমরা একমত। গত ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সকলের আশা-আকাক্সক্ষার যে সরকার গঠিত হয়েছে এখন দেখার বিষয় তারা কিভাবে সামাজিক সুরক্ষায় কাজ করবে। ২০১৫ সালে সামাজিক সুরক্ষায় এনএসএসএস চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে একটা ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তবে বাস্তবে এ প্রক্রিয়ায় সুবিধাভোগী নির্বাচন এখনও ধোঁয়াশাই রয়ে গেছে। সামাজিক সুরক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করা। ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশর্’ থেকেও আমরা খাদ্য অধিকার এবং খাদ্য নিরাপত্তা আইনের কথা জোরালোভাবে বলে আসছি। আমরা হতাশ নই। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে খাদ্য অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমাদের জায়গা থেকে আমরা কাজ করে যাবো। সুনির্দিষ্টভাবে সরকারি সেবা খাত প্রক্রিয়ায় যুবদের সম্পৃক্ত করে সামাজিক সুরক্ষার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে দেশের সার্বিক উন্নয়নে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোঃ সাইদুর রহমান খান বলেন, আমাদের বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী, বেদে জনগোষ্ঠীসহ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর ডাটাবেজ রয়েছে। সেখানে প্রায় ৩৬ লক্ষ প্রতিবন্ধী রয়েছেন। সামাজিক সুরক্ষায় ২০১৩ সালের নীতিমালা রয়েছে সেগুলো দিয়ে আমরা আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছি। বিভিন্ন ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান নগদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, বিভিন্ন দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে যারা জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। আমরা দুদকের মাধ্যমে মামলা দিয়ে এই দায়িত্ব থেকে তাদের অব্যাহতি দিয়েছি। বর্তমানে ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে অভিযোগের মাত্রা কমে এসেছে। একই ব্যক্তি যাতে দুই জায়গায় ভাতা নিতে না পারেন, দ্বৈততা পরিহারে আমরা কাজ করছি। সম্মানীয় অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কি, কাকে দিবো, কিভাবে দিবো সেগুলো নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। প্রয়োজনে সামাজিক উদ্যোগকে কাজে লাগাতে হবে, রাষ্ট্রের উপর চাপ কমাতে হবে।
উল্লেখ্য, সমাজে যারা বাস করে বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ যারা আয় করতে পারছে না তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবার থেকে আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। দরিদ্ররা যদি স্বউদ্যোগে এগিয়ে আসেতাদের উন্নয়নে তবেই সামগ্রিকভাবেই রাষ্ট্রের চাপ কমার সাথে সাথে সামাজিক উন্নয়ন তথা দেশের উন্নয়ন সম্ভব হবে। ড. সেলিম রায়হান বলেন, যে প্রত্যাশা নিয়ে এবারের বাজেটের দিকে সবাই তাকিয়েছিল, একটি উদাহরণ তৈরির সুযোগ ছিল, সে সুযোগ এ সরকার হারিয়েছে। এটি একটি গতানুগতিক বাজেটই হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর মাধ্যমে নতুন করে দরিদ্র হওয়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কোনো বরাদ্দ নাই। দারিদ্র্য দূরীকরণের টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারিনি আমরা। দুর্বৃত্তায়নের ধারাকে বাধাগ্রস্তকরার উল্লেখযোগ্য দিকনির্দেশনাও নেই এ বাজেটে।
মুক্ত আলোচনায় বক্তারা সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা, পর্যবেক্ষণের বিষয়ে আলোকপাত করেন। প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. এস এম জুলফিকার আলী বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সঠিক ব্যক্তি যাতে উপকারভোগী হিসেবে নির্বাচিত হতে পারেন, সে জন্য ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি (ডিএসআর)’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভাতা ও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। চলমান বিভিন্ন কর্মসূচির সুবিধাভোগী ও ভাতার পরিমাণ ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বয়স্ক ভাতার সুবিধাভোগী ৬০ লাখ ১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৬১ লাখ করা হচ্ছে। বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার জন বাড়িয়ে করা হচ্ছে ২৯ লাখ। একইভাবে প্রতিবন্ধী ভাতা ও প্রতিবন্ধী শিক্ষা বৃত্তির সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৯৭ হাজার, অনগ্রসর জনগোষ্ঠী খাতে সুবিধাভোগী ৯৪ হাজার, প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের সুবিধাভোগী ২ লাখ এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী ১ লাখ ১৬ হাজার বাড়ানো হচ্ছে। জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্রে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ভাতার পরিমাণ মূল্যস্ফীতির সাথে নিয়মিত সমন্বয়ের ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করা হয়। খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ এর পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল মাসিক ভাতার পরিমাণ দারিদ্র্যসীমার আয়ের চেয়ে কম হওয়া যাবে না। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে এর কোন প্রতিফলন নেই। বর্তমানে এটি জাতীয়নদারিদ্র্যসীমার আয়ের মাত্র ১৫ শতাংশ।
এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর সংখ্যা ১৪০টি থেকে কমিয়ে ৯৫টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে, বরাদ্দ গত বছরের ১ লক্ষ ৩৬ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে হয়েছে ১ লক্ষ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে নগর অঞ্চলের দরিদ্র ও অতিদরিদ জনগোষ্ঠী সবসময় উপেক্ষিত থেকে যান। আমরা দেখছি নগরে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক দরিদ্রমানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাবদ বরাদ্দের পরিমাণ সামাজিক নিরাপত্তার জন্য মোট বরাদ্দের ১ শতাংশ। সামাজিক নিরাপত্তা খাতের সাথে সম্পর্কিত নয় এমন কর্মসূচী থেকে কেবল সঞ্চয়পত্রের সুদ ছাড়া বাকিগুলো বরাবরের মতো এবারের বাজেটেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে দেখানো হয়েছে। সরকারি কর্মচারিদের পেনশন বাবদ ৩৫ হাজার ২৮২ কোটি, কৃষি ভর্তুকী বাবদ ১৭ হাজার কোটি, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বাবদ ৪ হাজার ৮০০ কোটি এবং পাঠ্যবই বিতরণ বাবদ ২ হাজার ১৯২ কোটি টাকা বাদ দিলে সমাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ দাড়ায় ৫৭ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির মাত্র শুন্য দশমিক ৯২ শতাংশ। এই হার বিশ্বের অনেক নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ তো বটেই এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে গড় বরাদ্দের মাত্র চার ভাগের একভাগ।
অথচ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মান অনুযায়ী, একটা দেশের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত জিডিপির ৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৫ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য হার বেড়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ হবে, যার অর্থ আরও প্রায় ৩০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকবে। তবে বাজেট পর্যালোচনায় আমরা দেখতে পাই, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কিছু সংস্কারকাজে হাত দিয়েছে সরকার। যেসব কর্মসূচির মাধ্যমে এত বছর গোঁজামিল দেওয়া হচ্ছিল, সেগুলোর কিছু এবার বাদ পড়েছে। আবার কিছু কর্মসূচি রয়েও গেছে। যেমন পেনশন কোনোভাবেই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নয়।
জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্রে (এনএসএসএস) উপকারভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ, দ্বৈততা দূর, অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতের সুপারিশ ছিল। এগুলো বাস্তবায়ন করলেও এ খাতের সমস্যার অনেকটাই সমাধান হয়ে যেতো। ১৯৯০-এর পর থেকে বিগত কয়েক দশকে দরিদ্রপরিবারের সংখ্যা কমেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনেক সমস্যা আবার আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে। অনেকক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভ্রান্তনীতি, সুশাসনের অভাব আর লাগামহীন দুর্নীতির সঙ্গে মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশের অনেক পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। আগের ধারাবাহিকতাতেই বাজেটে কর আহরণের কাঠামো পরোক্ষ কর নির্ভর রাখা হলো, এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীতে জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির বদলে উল্টো কমানো হলো। অথচ এসব খাতে জনমুখী সংস্কারের জন্য সংবিধান সংস্কার কিংবা রাজনৈতিক ঐকমত্যে পৌঁছানোর মতো কোন জটিলতা ছিল না। সরকারের সদিচ্ছাই বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখতে পারতো।
সামগ্রিক পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে ১০টি কর্মসূচিতে উপকারভোগী বৃদ্ধি ছাড়া নগর দরিদ্র এবং নানান বাস্তবতায় হওয়া নতুন দরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে তেমন কোন বরাদ্দ নেই। তাছাড়াও কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সমস্যা তো থেকেই যাচ্ছে। উক্ত মতবিনিময় সভায় খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ থেকে যেসকল সুপারিশসমূহ উঠে এসেছে তা হলো: সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে আরো যাচাই-বাছাই করে যেগুলো এর অন্তুর্ভুক্ত হওয়া উচিত নয় সেগুলোকে বাদ দিয়ে একটিকে অধিকতর দরিদ্র এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীবান্ধব করা প্রয়োজন, যাতে আমরা বুঝতে পারি প্রকৃতপক্ষে দরিদ্র এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা প্রদানের জন্য কী কী কর্মসূচি নেয়া হলো এবং সেগুলো বাবদ মোট কত অর্থ বরাদ্দ দেয়া হলো; ক্স শহরে বসবাসরত দরিদ্র এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসূচি গ্রহণ এবং তা বাবদ বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন, যাতে শহুরে দরিদ্র এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী এর দ্বারা সমভাবে উপকৃত হয়, উপকারভোগী জনগোষ্ঠী নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখনও যাথাযথ ঞধৎমবঃরহম অঢ়ঢ়ৎড়ধপয ঠিক করা সম্ভব হয়নি। এটি সত্যিই দু:খজনক। তাই অতি দ্রত একটি যাথাযথ পদ্ধতি ঠিক করা এবং তার ভিত্তিতে সঠিক উপকারভোগী জনগোষ্ঠী নির্ধারণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে বৈষম্য নিরসনে এটি অত্যন্ত জরুরি; সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি বিশেষভাবে প্রয়োজন। এই খাতে একইসাথে প্রতি উপকারভোগীর জন্য প্রদেয় বরাদ্দ এমনভাবে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন যাতে তা দারিদ্র্যসীমার আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
বর্তমান বাজেটে পেনশন বাবদ প্রদত্ত অর্থ বাদ দিলে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ১০.৩১ শতাংশে দাঁড়ায়, যা জিডিপি’র অনুপাতে ১ শতাংশেরও কম; সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয় তার প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা; সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ এবং তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিয়মিত এবং কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এ প্রক্রিয়ায় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান করা।